

মিজানুর রহমান রানা :
বাংলাদেশে প্রতারণার ধরন দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। এক সময় যেখানে প্রতারণা সীমাবদ্ধ ছিল চেক জালিয়াতি, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন বা সরাসরি অর্থ চুরির মধ্যে, এখন তা রূপ নিয়েছে ভয়ভীতির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের এক ভয়ংকর কৌশলে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকচক্রও হয়ে উঠেছে আরও কৌশলী, আরও ভয়ংকর। তারা এখন মানুষের আবেগ, ভীতি এবং বিশ্বাসকে পুঁজি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি সমাজের নিরাপত্তা, বিশ্বাস এবং মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে।

এই আলোচনায় আমরা বিশ্লেষণ করব কীভাবে প্রতারকচক্র ভয়ভীতি ছড়িয়ে, পুলিশ বা প্রশাসনের পরিচয় ব্যবহার করে, প্রযুক্তির সহায়তায় এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি, আমরা দেখব কেন ভুক্তভোগীরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হন এবং কীভাবে এই প্রবণতা রোধ করা যেতে পারে।
ভয়ভীতির মাধ্যমে প্রতারণা: একটি নতুন ট্রেন্ড
রোকেয়া বেগমের ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে ভয়ভীতি ছড়িয়ে একজন সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে প্রতারণা করা হয়। “জেলখানা থেকে বলছি”—এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ছিল রোকেয়ার মনোজগতে আতঙ্ক ছড়াতে। এরপর কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর কণ্ঠস্বর, ডিবি অফিসে নেওয়ার গল্প, এবং টাকা পাঠানোর অনুরোধ—সব মিলিয়ে রোকেয়া সাড়ে তিন লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু স্বামীর দেখা পাননি।
এই ধরনের প্রতারণা শুধু রোকেয়ার ক্ষেত্রে নয়, আরও বহুজনের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এক ব্যক্তি তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে ভেবে তিন লাখের বেশি টাকা পাঠিয়ে দেন। একজন ব্যবসায়ী ছেলেকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে শুনে দশ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। প্রতারকরা এতটাই কৌশলী যে তারা ফোনে পুলিশের সাইরেনের শব্দও বাজিয়ে দেন, যেন পরিস্থিতি বাস্তব মনে হয়।
প্রতারণার এই ধরন ভয়ভীতির ওপর ভিত্তি করে। মানুষ যখন প্রিয়জনের বিপদে পড়ে, তখন তারা যুক্তিবোধ হারিয়ে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতারকরা এই মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অর্থ আদায় করে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার: হ্যাকিং ও ডিজিটাল ছলচাতুরি
প্রতারণার আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো প্রযুক্তির অপব্যবহার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিনের হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করে তার পরিচিতদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। প্রতারকরা পুলিশ পরিচয়ে ফোন করে একটি লিংকে ক্লিক করতে বলেন, এবং সেই লিংকেই লুকিয়ে থাকে হ্যাকিংয়ের ফাঁদ।
এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। প্রতারকরা এখন শুধু ভয়ভীতি নয়, প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে।
ভুয়া পরিচয় ও চাকরির প্রতিশ্রুতি
প্রতারণার আরও একটি ধরন হলো ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া। সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয়ে প্রতারক সোহেল রানা একজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। নিয়োগপত্রও দেন, কিন্তু পরে দেখা যায় সেটি ভুয়া।
এই ধরনের প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, আশা এবং আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। চাকরি পাওয়ার আশায় একজন ব্যক্তি তার সঞ্চিত অর্থ, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করা টাকা, এমনকি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পর্যন্ত বিসর্জন দেন। পরে যখন বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন, তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও ভুক্তভোগীর নীরবতা
প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অধিকাংশ মানুষ আইনগত ব্যবস্থা নিতে চান না। কেন? কারণ তারা মনে করেন, সন্তান বা প্রিয়জনকে উদ্ধার করতে টাকা দেওয়া জরুরি ছিল। পরে যখন বুঝতে পারেন তারা প্রতারিত হয়েছেন, তখন আইনের দ্বারস্থ হতে চান না ঝামেলার ভয়ে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “অপরাধীরা আশপাশের প্রতিবেশী অথবা জানাশোনা লোকজন। তারা টার্গেট করা ব্যক্তির রুটিন, সন্তান কোথায় যায়, কতক্ষণ থাকে—সব মনিটর করে।” এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, প্রতারকরা শুধু প্রযুক্তি নয়, সামাজিক সম্পর্ক এবং রুটিনকেও কাজে লাগায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
পুলিশ বলছে, প্রতারকরা মোবাইল সিম একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়। সিমগুলো ভুয়া নামে কেনা হয়, ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন। সিম কোম্পানিগুলোর আরও কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াও সহজ হওয়ায় প্রতারকরা সহজেই একাধিক নম্বর ব্যবহার করতে পারে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “হঠাৎ কেউ পুলিশ পরিচয়ে ফোন করে টাকা চাইলেই আতঙ্কিত না হয়ে যাচাই করুন। কল রেকর্ড করুন, নম্বর স্ক্রিনশট রাখুন।” এই পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে অনেকেই তা অনুসরণ করেন না।
সমাধানের পথ: সচেতনতা, প্রযুক্তি ও আইনি পদক্ষেপ
এই প্রতারণা রোধে তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে—
১. সচেতনতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে, কেউ পুলিশ পরিচয়ে ফোন করে টাকা চাইলে তা যাচাই করতে হবে। স্কুল, কলেজ, অফিসে সচেতনতা কর্মসূচি চালানো যেতে পারে।
২. প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা: হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইমেইল—সব জায়গায় দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
৩. আইনি পদক্ষেপ: প্রতারণার শিকার হলে অবশ্যই থানায় অভিযোগ করতে হবে। যত ছোট ঘটনাই হোক, আইনের আওতায় আনতে হবে। এতে প্রতারকদের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক তদন্ত সম্ভব হবে।
৪. সিম ও এমএফএস নিয়ন্ত্রণ: সিম বিক্রির সময় জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই, এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলার সময় কঠোর নিয়ম চালু করতে হবে।
৫. সাইবার ইউনিটের দক্ষতা বৃদ্ধি: পুলিশের সাইবার ইউনিটকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা দ্রুত প্রতারকদের শনাক্ত করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতারণার নতুন ধরন ভয়, প্রযুক্তি এবং বিশ্বাসের ফাঁদে মানুষকে ফেলছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও মনস্তত্ত্বের জন্য বড় হুমকি। এই প্রতারণা রোধে প্রয়োজন সচেতনতা, প্রযুক্তি, আইনি পদক্ষেপ এবং সামাজিক সংহতি। প্রতারকরা যতই কৌশলী হোক, যদি আমরা একসঙ্গে সচেতন হই, তাহলে এই ভয়ংকর প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।
বুধবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৫












