

ক্ষুদীরাম দাস
গ্রামের নাম শান্তিপুর হলেও ঘটনাটি ছিল অশান্তির এক চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে গড়া এই জনপদে ইদানীং বিলাসিতা আর একাকিত্বের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। সেই আবর্তে পড়ে হারিয়ে যাওয়া এক নারীর গল্প এটি।

শান্তিপুরের ধলা মিয়ার ছেলে আরমান গত পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরবে আছেন। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে তিনি প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠান স্ত্রী সালমার কাছে। আরমানের স্বপ্ন ছিল একটাই—নিজে কষ্ট করলেও বাড়িতে যেন স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা কোনো অভাব না পায়। সেই লক্ষ্যেই তিনি বাড়িতে পাকা দালান তুলেছেন, সালমার হাতে তুলে দিয়েছেন দামী স্মার্টফোন আর গয়নাগাটি।
সালমা দেখতে সুন্দরী, আর হাতে কাঁচা টাকা আসায় তার রূপ যেন আরও ফেটে পড়ছিল। প্রথম দু-তিন বছর সে আরমানের অভাব বোধ করত, ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আরমানের কণ্ঠস্বর তার কাছে একঘেঁয়ে হয়ে উঠতে শুরু করে। আরমানের আলাপ জুড়ে থাকত শুধু কাজের কষ্ট, সঞ্চয় আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। অন্যদিকে সালমার বয়স আর একাকিত্ব তাকে অন্য এক জগতের নেশা ধরিয়ে দিল।
শান্তিপুর বাজারে একটি ছোট কিন্তু জমজমাট কসমেটিকসের দোকান ছিল মনিরের। মনির যুবক, অবিবাহিত এবং কথা বলতে বেশ পটু। সালমা মাঝেমধ্যেই মেকআপের সরঞ্জাম কিনতে বাজারে যেত। মনির শুরু থেকেই সালমার প্রতি একটু বেশি মনোযোগী ছিল।
“ভাবী, আপনার ত্বকে এই ক্রিমটা খুব মানাবে,” কিংবা “এই ঝুমকাটা পরলে আপনাকে একদম রাজকন্যার মতো লাগবে”—এসব কথা সালমার কানে মধুর মতো লাগত। আরমান কোনোদিন তাকে এভাবে প্রশংসা করেনি। ধীরে ধীরে সেই প্রশংসা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটবক্স পর্যন্ত গড়ায়। মনিরের কথার জালে সালমা নিজের একাকিত্ব ভুলে যেতে শুরু করে। আরমানের পাঠানো টাকায় সে মনিরের জন্য দামী উপহার কিনত, আর মনির তাকে দিত মিথ্যে ভালোবাসার প্রলেপ।
গ্রামের মানুষ শুরুতে কিছুই টের পায়নি। কিন্তু কথায় আছে, ‘ছাঁই চাপা আগুন বেশিক্ষণ ঢেকে রাখা যায় না’। সালমার চলাফেরায় একটা অদ্ভুত চপলতা চলে এল। সে কারণে-অকারণে বাজারে যেত, ফোনে সবসময় ব্যস্ত থাকত। এমনকি শাশুড়ি ডাকলে বিরক্ত হতো।
শাশুড়ি আমেনা বেগম মাঝে মাঝে খটকা খেতেন। একদিন গভীর রাতে তিনি দেখলেন সালমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কার সাথে যেন হাসাহাসি করছে। তিনি জিজ্ঞেস করলে সালমা সরাসরি উত্তর দিত, “আরমান ফোন দিয়েছে মা, নেটওয়ার্কের সমস্যা তাই বাইরে এসে কথা বলছি।” বৃদ্ধা মা ছেলের কথা ভেবে চুপ হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেই সময় আরমান ছিল কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত।
গ্রামের কিছু যুবক, বিশেষ করে আরমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কালামের মনে খটকা আগে থেকেই ছিল। সে বেশ কয়েকবার মনিরকে রাতের আঁধারে সালমার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেছে। কালাম শান্তিপুরের অন্য বড় ভাইদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, হাতেনাতে না ধরা পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেবে না।
ঘটনার দিন ছিল অমাবস্যার রাত। আকাশে চাঁদ নেই, পুরো গ্রাম ঘন অন্ধকারে ঢাকা। মনির আর সালমা পরিকল্পনা করেছিল যে, শাশুড়ি ঘুমিয়ে পড়লে মনির পেছনের আম বাগান দিয়ে ঘরে ঢুকবে। রাত তখন প্রায় একটা। নিঝুম গ্রামে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। মনির পা টিপে টিপে আরমানের ঘরে ঢুকে পড়ল।
কিন্তু তারা জানত না যে, কালাম আর তার তিন সঙ্গী তখন জানালার নিচে ওৎ পেতে বসে আছে।
ঘরে ঢুকে সালমা আর মনির যখন নিজেদের জগতে মত্ত, ঠিক তখনই কালাম সজোরে দরজায় ধাক্কা দেয়। আকস্মিক এই শব্দে সালমা আর মনির দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। তারা পালানোর চেষ্টা করার আগেই কালামের সঙ্গীরা টর্চের আলো জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে।
সে এক নারকীয় দৃশ্য। গ্রামবাসী ততক্ষণে সজাগ হয়ে গেছে। সালমার শাশুড়ি আমেনা বেগম আর্তনাদ করে উঠলেন, “এ কী করলি বউমা? আমার ছেলেটার জীবনটা কেন শেষ করে দিলি?”
গ্রামবাসী মনিরকে ধরে উঠোনে নিয়ে আসে। সালমা তখন লজ্জায় আর ভয়ে ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। গ্রামের মাতব্বররা খবর পেয়ে চলে এলেন। বিচার বসে সেই গভীর রাতেই। মনিরের ওপর শুরু হয় গণপিটুনি, আর সালমার ওপর বর্ষিত হয় ঘৃণা আর তিরস্কারের বৃষ্টি।
সকালে খবরটি সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসীদের মধ্যে এক আতঙ্কের ছায়া নামে। আরমানকে যখন ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়, ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আসেনি। শুধু শোনা গিয়েছিল এক দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার গোঙানি। নিজের জীবনের সবটুকু কামাই দিয়ে যে স্বপ্ন সে বুনেছিল, তা এক নিমিষেই ধুলোয় মিশে গেল।
সালমাকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মনিরকে পুলিশে সোপর্দ করা হয় চুরির অপরাধে নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয় ও পরকীয়ায় উস্কানি দেওয়ার দায়ে। কিন্তু এই ঘটনার ক্ষত রয়ে গেল সারাজীবনের জন্য।
প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, খ্রি.














