অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে কেন?

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

ডিজিটাল দুনিয়ায় তথ্য খোঁজার ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর সার্চ টুলের কারণে অনেক ব্যবহারকারী এখন আর সরাসরি ওয়েবসাইটে ঢুকছেন না। এতে করে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিজনেস সফটওয়্যার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হাবস্পট-এর অভিজ্ঞতাই তার একটি উদাহরণ। গত এক বছরে তাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট কমেছে প্রায় ১৪ কোটি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা কিপ বডনার বলছেন, আগে মানুষ তথ্য খুঁজতে সার্চ ইঞ্জিনে গিয়ে একের পর এক লিংক ঘাঁটতেন। এখন এআই টুলই তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। ফলে ব্যবহারকারীরা আর ওয়েবসাইটে ক্লিক করছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্চ ইঞ্জিনগুলোও এখন তাদের ফলাফলে এআই-ভিত্তিক সারাংশ যুক্ত করছে। এতে ব্যবহারকারী সরাসরি উত্তর পেয়ে যান, আলাদা করে কোনো সাইটে প্রবেশের প্রয়োজন হয় না। এর ফলে ক্লিক-থ্রু রেট ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। ‘আনসার ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ (এইও) বা ‘জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ (জিইও) নামে পরিচিত এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো এআই টুলের উত্তরে নিজেদের তথ্য তুলে ধরা। এটি মূলত প্রচলিত সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও)-এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এআই সার্চের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রশ্নের ধরনে পরিবর্তন। আগে যেখানে ব্যবহারকারীরা ৪-৬টি শব্দ দিয়ে সার্চ করতেন এখন এআই-তে তারা ৪০-৬০ শব্দের বিস্তারিত প্রশ্ন করছেন। ফলে কনটেন্টকেও সেই অনুযায়ী সাজাতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে হাবস্পট তাদের কনটেন্ট কাঠামো বদলে ফেলেছে। দীর্ঘ নিবন্ধের পরিবর্তে ছোট ছোট তথ্যভিত্তিক অংশ তৈরি করা হচ্ছে। যাতে এআই সহজে সেগুলো তুলে নিতে পারে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মোট ভিজিটরের ৭ থেকে ১২ শতাংশ আসছে সরাসরি এআই প্ল্যাটফর্ম থেকে।

শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, অন্যান্য ব্যবসাও নতুন এই বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। উদাহরণ হিসেবে স্পাইস কিচেন নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটে মসলা বাণিজ্যের ইতিহাস নিয়ে বিশেষ কনটেন্ট তৈরি করছে। এর মাধ্যমে তারা এআই সার্চে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বাড়াতে চায়।

ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু পণ্য বিক্রির পেজ নয় বরং তথ্যভিত্তিক গাইড ও গবেষণাধর্মী কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। এতে করে ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এআই যুগে কনটেন্ট হতে হবে সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং তথ্যসমৃদ্ধ। পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে প্রয়োজন মানসম্মত রেফারেন্স, লেখকের পরিচিতি এবং নির্ভরযোগ্য লিংক।

সব মিলিয়ে, এআই-নির্ভর সার্চ প্রযুক্তি অনলাইন ব্যবসার ধরণ আমূল বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নতুন বাস্তবতায় দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শুধু এআইর কারণে নয়, এ ছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে :

অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে নিজেদের কারণেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে—বিশেষ করে বাংলাদেশে। প্রতিযোগিতা, গ্রাহকের আস্থা সংকট, লজিস্টিক সমস্যা এবং নীতিমালার অনিশ্চয়তা এই খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে।

প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

১. গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুত পণ্য সময়মতো সরবরাহ করতে পারে না।
প্রতারণা ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের কারণে গ্রাহকের আস্থা কমে যাচ্ছে।
*ফলাফল : দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

২. লজিস্টিক ও ডেলিভারি সমস্যা
গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় ডেলিভারি নেটওয়ার্ক দুর্বল।
কুরিয়ার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা ও উচ্চ খরচ ব্যবসার প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করছে।

৩. প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ উন্নয়নে দক্ষতার অভাব।
নিরাপদ পেমেন্ট গেটওয়ে ও সহজ চেকআউট প্রক্রিয়া না থাকায় গ্রাহকরা বিরক্ত হন।

৪. নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ
ই-কমার্স খাতে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন।
কর ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয়।

 ৫. প্রতিযোগিতা ও বাজার চাপ
বড় প্ল্যাটফর্ম যেমন Daraz বা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসগুলো ছোট ব্যবসাকে চাপে ফেলে।
মূল্য প্রতিযোগিতা ও ডিসকাউন্ট যুদ্ধ টেকসই লাভজনকতা কমিয়ে দেয়।

তুলনামূলক চ্যালেঞ্জ

চ্যালেঞ্জ : শহরাঞ্চল বনাম গ্রামাঞ্চল
গ্রাহকের আস্থা : প্রতারণার ঘটনা বেশি, আস্থা তুলনামূলক বেশি, তবে সচেতনতা কম।
লজিস্টিক : ডেলিভারি দ্রুত, খরচ বেশি, ডেলিভারি ধীর, নেটওয়ার্ক দুর্বল।
প্রযুক্তি : ওয়েবসাইট ও অ্যাপ উন্নত, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা।
প্রতিযোগিতা : বড় প্ল্যাটফর্মের চাপ, স্থানীয় পণ্যের সীমিত বাজার।
নীতিমালা : কর ও শুল্ক জটিলতা, নীতিমালা প্রয়োগ দুর্বল।

করণীয় ও সম্ভাব্য সমাধান
গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠন : স্বচ্ছ রিটার্ন নীতি ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা।
লজিস্টিক উন্নয়ন: স্থানীয় কুরিয়ার সার্ভিসে বিনিয়োগ ও গ্রামাঞ্চলে ডেলিভারি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ।
প্রযুক্তি দক্ষতা বৃদ্ধি: উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সহজ পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করা।
নীতিমালা সংস্কার: সরকারকে স্পষ্ট ই-কমার্স আইন ও কর কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বাজার বৈচিত্র্য:স্থানীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া।

বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে আস্থা সংকট, লজিস্টিক দুর্বলতা ও নীতিমালার অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে উদ্যোক্তা, সরকার এবং প্রযুক্তি খাতকে একসাথে কাজ করতে হবে।

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬,  ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

 

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy