

তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ | ২৮ এপ্রিল ২০২৬
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার দেশিগ্রাম ইউনিয়নের বলদি পারাগ্রামে অভিযান চালিয়ে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী সম্রাট ও তার দুই সহযোগীকে আটক করেছে তাড়াশ থানা পুলিশ। রবিবার বিকেলে বলদি পারা গ্রামের একটি লিচু বাগান থেকে তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে স্বস্তি ফিরেছে।

যেভাবে অভিযান
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই বলদি পারা ও আশপাশের গ্রামগুলোতে মাদকের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ আসছিল। স্থানীয়দের দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাড়াশ থানার এসআই মেহেদী হাসান ও এসআই উত্তম কুমার একটি চৌকস টিম নিয়ে কৌশলে অভিযানের ছক কষেন।
রবিবার বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ জানতে পারে, বলদি পারা গ্রামের নির্জন লিচু বাগানে মাদকের একটি বড় চালান হাতবদল হবে। খবর পেয়েই সঙ্গীয় ফোর্সসহ এসআই মেহেদী হাসান ও এসআই উত্তম কুমার সাদা পোশাকে এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সম্রাট ও তার দুই সহযোগী লিচু বাগানে জড়ো হলে পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে তাদের আটক করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা মাদক কারবারের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ মাদক বিক্রির নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে উদ্ধারকৃত মাদকের সঠিক পরিমাণ এখনই জানায়নি পুলিশ।
আটককৃতদের পরিচয়
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক মূলহোতা সম্রাট তাড়াশ উপজেলার দেশিগ্রাম ইউনিয়নের বলদি পারা গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে সে এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলের কারবার চালিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে তাড়াশসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।
আটক অপর দুই সহযোগীও একই এলাকার বাসিন্দা। তারা মূলত সম্রাটের হয়ে খুচরা মাদক বিক্রি ও সরবরাহের কাজ করত। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রটির কারণে এলাকার উঠতি বয়সী তরুণরা মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছিল। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে তারা মাদক বিক্রি করত।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
এ ব্যাপারে তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা অত্যন্ত সফল একটি অভিযান পরিচালনা করেছি। কুখ্যাত মাদক কারবারি সম্রাটসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে থানায় আনা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন। যত দ্রুত সম্ভব এদেরকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে। তাড়াশকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
এলাকায় স্বস্তি
দীর্ঘদিন ধরে সম্রাট বাহিনীর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ ছিল বলদি পারা গ্রামের সাধারণ মানুষ। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, তরুণদের আড্ডা ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। পুলিশের এই অভিযানের পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
দেশিগ্রাম ইউনিয়নের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সম্রাটের ভয়ে আমরা কেউ মুখ খুলতে পারতাম না। সন্ধ্যার পর লিচু বাগানটা ওদের আখড়া হয়ে যেত। পুলিশ ওদের ধরায় আমরা খুব খুশি। এখন ছেলেমেয়েরা একটু শান্তিতে চলাফেরা করতে পারবে।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান, “পুলিশকে ধন্যবাদ। তবে শুধু সম্রাটকে ধরলেই হবে না, এর পেছনে যারা গডফাদার আছে, মাদকের বড় চালান যারা দেয়, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। আমরা চাই আমাদের ইউনিয়ন মাদকমুক্ত হোক।”
তাড়াশে মাদকের বিস্তার ও পুলিশের কঠোর অবস্থান
উল্লেখ্য, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা মাদক চোরাচালানের একটি রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চলনবিল অধ্যুষিত এই এলাকার নির্জন বিল ও বাগানগুলোকে মাদক কারবারিরা নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে। বিশেষ করে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের চালান এই পথে বিভিন্ন জেলায় পাচার হয়।
সম্প্রতি তাড়াশ থানা পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। গত তিন মাসে তাড়াশ থানায় ২৫টির বেশি মাদক মামলা হয়েছে এবং ৪০ জনের বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার, সিরাজগঞ্জ জেলার সকল থানাকে মাদক নির্মূলে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া
পুলিশ জানিয়েছে, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্যদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মাদকের উৎস এবং কোথায় কোথায় তারা সরবরাহ করত, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে।
সোমবার সকালে আটককৃতদের সিরাজগঞ্জ আদালতে পাঠানো হবে বলে থানা সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সচেতনতা জরুরি
শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয় বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এজন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজর রাখা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় সম্পৃক্ত করা জরুরি।
তাড়াশ থানা পুলিশের এই সফল অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এলাকাবাসী চায়, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক এবং তাড়াশ উপজেলা দ্রুত মাদকমুক্ত হোক।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.














