

সিরাজগঞ্জ, তাড়াশ | জিল্লুর রহমান :
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা একসময় ছিল তালগাছ আর বাবুই পাখির অভয়ারণ্য। নিরিবিলি পল্লি এলাকার মেঠোপথ ধরে হাঁটলে রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ত সারি সারি উঁচু তালগাছ। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, পুকুরপাড়ে কিংবা ফসলের মাঠের আইলে ছিল তালগাছের সমাদর। আর সেই তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা। দূর থেকে দেখে মনে হতো যেন প্রকৃতি নিজ হাতে ঝুলিয়ে রেখেছে শত শিল্পকর্ম।

কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। তালগাছ কেটে ফেলা, নগরায়ণ, কৃষিজমির ধরন পরিবর্তন এবং পরিবেশগত নানা কারণে তাড়াশ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ। আর তালগাছের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অতি পরিচিত ও পরিশ্রমী পাখি বাবুই।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
সম্প্রতি সরেজমিনে তাড়াশ উপজেলার সরাপপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের বাড়ির একটি তালগাছে এখনো দুটি বাবুই পাখির বাসা ঝুলে আছে। বাসা দুটি দেখে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের মধ্যে কৌতূহল থাকলেও বয়স্করা বলছেন, “আগে তো প্রতিটি তালগাছেই ২০-৩০টা করে বাসা থাকত। এখন একটা গাছে দুইটা বাসা দেখাই ভাগ্যের ব্যাপার।”
গ্রামের প্রবীণ কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “আশির দশকেও আমাদের গ্রামে শত শত তালগাছ ছিল। বর্ষাকালে বাবুই পাখির কিচিরমিচিরে সকাল হতো। ধানক্ষেতের পোকা খেয়ে ফসল রক্ষা করত। এখন তালগাছও নাই, বাবুই পাখিও নাই।”
সাদ্দাম হোসেন জানান, “গাছটা আমার দাদার লাগানো। অনেকেই কেটে ফেলতে বলে, কিন্তু বাবুই পাখির বাসার জন্য কাটি না। এবার দুই জোড়া পাখি বাসা বেঁধেছে। ওদের দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।”
কেন হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি
বাবুই পাখি Ploceidae গোত্রের একটি তৃণভোজী পাখি। এর বৈজ্ঞানিক নাম *Ploceus philippinus*। এই পাখি তার নিখুঁত বুননশৈলীর জন্য বিখ্যাত। পুরুষ বাবুই পাখি তাল, নারিকেল, খেজুর বা সুপারি গাছের সরু পাতা দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বোনে। বাসাটি এমনভাবে তৈরি করে যাতে সহজে সাপ, বেজি বা অন্য শিকারি প্রাণী ঢুকতে না পারে। বাসার নিচের দিকে থাকে প্রবেশপথ।
তাড়াশ উপজেলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মর্জিনা ইসলাম বলেন, “বাবুই পাখি আমাদের দেশের অতি পরিচিত একটি আবাসিক পাখি। এরা সাধারণত উঁচু তালগাছকেই বাসা বানানোর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে। কারণ তালগাছের কাণ্ড মসৃণ ও উঁচু হওয়ায় শিকারি প্রাণীরা সহজে উঠতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “গত দুই দশকে তাড়াশসহ চলনবিল অঞ্চলে ব্যাপক হারে তালগাছ কাটা পড়েছে। ইটভাটার জ্বালানি, ঘরবাড়ি তৈরির কাঠ, রাস্তা সম্প্রসারণ এবং বজ্রপাতের ভয়ে মানুষ তালগাছ কেটে ফেলছে। অথচ বজ্রপাত নিরোধে তালগাছের ভূমিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত। তালগাছ না থাকলে বাবুই পাখি বাসা বাঁধার জায়গা পাবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।”
শুধু বাবুই নয়, হুমকিতে আরও প্রজাতি
প্রাণিবিদ্যা প্রভাষক মর্জিনা ইসলাম জানান, তালগাছ কমে যাওয়ায় শুধু বাবুই নয়, দেশের আরও অনেক প্রজাতির পাখি আবাসস্থল সংকটে পড়েছে। তালগাছের মাথায় বাসা বাঁধে শামুকখোল, বক, পানকৌড়ি। গাছের কোটরে থাকে পেঁচা, কাঠঠোকরা, টিয়া। তালের রসের জন্য আসে বাদুড়, মৌমাছি। একটা পূর্ণবয়স্ক তালগাছ একটি ছোটখাটো বাস্তুসংস্থান।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ২০০০ সালে উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার তালগাছ ছিল। ২০২৫ সালের এক জরিপে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪ হাজারের নিচে। অর্থাৎ ২৫ বছরে ৭৮% তালগাছ কমে গেছে।
পরিবেশ ও কৃষিতে তালগাছের গুরুত্ব
১. বজ্রপাত প্রতিরোধ: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মতে, উঁচু তালগাছ বজ্রপাতের সময় আর্থিংয়ের কাজ করে। চলনবিল অঞ্চলে যেখানে তালগাছ কম, সেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেশি।
২. ভূমিক্ষয় রোধ: তালগাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখে। নদী ও বিলপাড়ের ভাঙন ঠেকাতে তালগাছ কার্যকর।
৩. অর্থনৈতিক মূল্য: তালের রস, গুড়, তালমিছরি, তালপাতার পাখা, চাটাই— সবই গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে ৫-৭ হাজার টাকা আয় সম্ভব।
৪. জীববৈচিত্র্য রক্ষা: বাবুই পাখি ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক কীটনাশকের কাজ করে।
কী করা যেতে পারে
প্রভাষক মর্জিনা ইসলাম মনে করেন, “বাবুই পাখিকে ভালোবাসলে আমাদের বেশি বেশি করে তালগাছ লাগাতে হবে। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি।”
তিনি কয়েকটি সুপারিশ করেন:
1. সামাজিক বনায়নে তালগাছ: উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাস্তার পাশে, খাস জমিতে পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো।
2. নতুন বাড়ির সঙ্গে তালগাছ: বাড়ি করার সময় অন্তত দুটি তালগাছ লাগানোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
3. স্কুল পর্যায়ে সচেতনতা: শিক্ষার্থীদের দিয়ে তালবীজ রোপণ কর্মসূচি চালু করা। “একজন শিক্ষার্থী, একটি তালগাছ” স্লোগান বাস্তবায়ন।
4. বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র: হাওর-বিল এলাকায় ফাঁকা মাঠে তালগাছের সারি তৈরি করা, যাতে কৃষক বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে পারে।
5. বাবুই পাখি সংরক্ষণ কর্নার: তাড়াশ ডিগ্রি কলেজসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বাবুই পাখির জীবনচক্র নিয়ে ডিসপ্লে কর্নার তৈরি, যাতে নতুন প্রজন্ম পাখিটি সম্পর্কে জানতে পারে।
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে ‘সবুজ তাড়াশ’ কর্মসূচির আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ হাজার তালগাছের চারা রোপণ করেছি। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে মসজিদ, মন্দির ও হাটবাজারে প্রচারণা চালাচ্ছি।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের বিনামূল্যে তালবীজ ও চারা দেওয়া হচ্ছে। রাস্তার পাশে তালগাছ কাটার আগে উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কবি রজনীকান্ত সেন লিখেছিলেন, “বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।” সেই বাবুই পাখি আজ নিজেই আবাসন সংকটে। তালগাছ না থাকলে বাবুই থাকবে না, বাবুই না থাকলে গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে।
সাদ্দাম হোসেনের বাড়ির সেই দুটি বাসা যেন তাড়াশবাসীর কাছে শেষ স্মারক হয়ে না দাঁড়ায়। এখনই সময় তালগাছ লাগানোর, বাবুই ফেরানোর। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব।
প্রকাশিত : শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.














