

রিপোর্ট: জিল্লুর রহমান, তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ
তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল ইসলাম। সোমবার সকাল ১১টায় তিনি প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে উপস্থিত হন এবং পরে ভূমি অফিসে বসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরিদর্শনকালে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাড়াশ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ জেড নাহিদ হাসান। দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সকল ইউপি সদস্য, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ইউনিয়ন পরিষদে প্রথমেই নজর দেন জেলা প্রশাসক
সকাল ১১টার দিকে জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল ইসলাম দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে পৌঁছান। কার্যালয়ে প্রবেশ করেই তিনি নাগরিক সেবা কর্নার, তথ্য ও সেবা কেন্দ্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্টার এবং গ্রাম আদালতের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শনকালে তিনি ইউপি সচিব ও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সেবা প্রদানের সময়সীমা, ফি এবং আবেদন নিষ্পত্তির হার সম্পর্কে জানতে চান। জন্ম নিবন্ধন সনদ, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ইত্যাদি দিতে যেন কোনো প্রকার হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া না হয় সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে তৃণমূলের মানুষের প্রথম আশ্রয়স্থল। এখান থেকে কেউ যেন খালি হাতে বা অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে না যায়। প্রতিটি সেবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দিতে হবে।”
গ্রাম আদালতের নথিপত্র দেখে জেলা প্রশাসক সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সামাজিক শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দেন। পরিষদের মাসিক সভার কার্যবিবরণী, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ও বাজেট বাস্তবায়নের কাগজপত্রও তিনি খতিয়ে দেখেন।
ভূমি অফিসে মতবিনিময়: ‘দালালমুক্ত সেবা চাই’
ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক সরাসরি চলে যান পাশের দেশীগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। সেখানে তিনি নামজারি, খাজনা রশিদ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং মিস কেসের রেজিস্টার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কাছে জেলা প্রশাসক জানতে চান- আবেদন পড়ার পর কতদিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তি হচ্ছে, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর কতজন দিচ্ছে এবং পেন্ডিং ফাইল কতগুলো। এ সময় তিনি সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গেও কথা বলেন।
মতবিনিময়কালে মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, “ভূমি অফিস নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক অভিযোগ থাকে। দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। অনলাইনে আবেদন করে ঘরে বসেই যেন মানুষ নামজারি ও খাজনার রশিদ পায়, সেটা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ফাইল ২৮ দিনের বেশি আটকে থাকতে পারবে না।” তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ‘সেবা গ্রহীতার মতামত বক্স’ রাখতে হবে এবং প্রতি সপ্তাহে তা খুলে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ জেড নাহিদ হাসান জানান, তাড়াশ উপজেলার সব ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ইতোমধ্যে ই-নামজারির আওতায় আনা হয়েছে। দেশীগ্রাম অফিসে গত তিন মাসে ৯২% আবেদন নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ফাইলগুলো দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও নুসরাত জাহানের বক্তব্য
পরিদর্শন শেষে তাড়াশ ইউএনও নুসরাত জাহান বলেন, “জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ইতোমধ্যে উপজেলার প্রতিটি দপ্তরে ‘সিটিজেন চার্টার’ টানিয়ে দিয়েছি। দেশীগ্রাম ইউনিয়নকে আমরা মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ভূমি ও ইউনিয়ন পরিষদের সেবা এক ছাদের নিচে এনে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর পরিকল্পনা আছে।”
চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের প্রতিশ্রুতি
দেশীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, “স্যারের পরিদর্শন আমাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। যেসব দুর্বলতা তিনি চিহ্নিত করেছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তা সমাধান করা হবে। আমরা প্রতি ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক করে ভূমি ও পরিষদের সেবা সম্পর্কে মানুষকে জানাব।” ইউপি সদস্যরা জানান, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় ও বয়স্ক-বিধবা ভাতার তালিকা হালনাগাদে আরও স্বচ্ছতা আনা হবে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
পরিদর্শনের খবর ছড়িয়ে পড়লে অফিস চত্বরে ভিড় করেন স্থানীয়রা। দেশীগ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “ডিসি স্যার নিজে এসে আমাদের কথা শুনেছেন, এটা বড় পাওয়া। নামজারি করতে আগে মাসের পর মাস ঘুরতে হতো। এখন শুনলাম ২৮ দিনে হবে। এটা হলে খুব ভালো হয়।” কলেজছাত্রী সুমি খাতুন বলেন, “জন্ম নিবন্ধন ঠিক করতে ইউনিয়ন পরিষদে ৩ দিন ঘুরেছি। স্যার বলে গেছেন এখন থেকে একদিনেই হবে। আমরা আশায় আছি।”
জেলা প্রশাসকের হুঁশিয়ারি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। স্মার্ট সেবা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। আজকের পরিদর্শন রুটিন কাজের অংশ। তবে সেবার মান খারাপ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও জানান, সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলার সব ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিস পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হবে। পাশাপাশি ‘গণশুনানি’ আয়োজন করে সরাসরি মানুষের অভিযোগ শুনবেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধান দেবেন।
দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ ও ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের আগামী এক মাসের মধ্যে সেবার মানোন্নয়ন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের এই আকস্মিক পরিদর্শনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তাড়াশের সাধারণ মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত হবে।
প্রকাশিত : বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.

















