অক্সিজেনশূন্য পৃথিবী: প্রযুক্তির অন্ধ মোহ ও বিপন্ন প্রকৃতি

সম্রাট লিওন তালুকদার :

​আধুনিক সভ্যতার রথ আজ এক অদ্ভুত আত্মঘাতী প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। ‘উন্নয়ন’ ও ‘আধুনিকায়নের’ নামে আমরা প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছি বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদানগুলোকে। যেভাবে আধুনিক শহরায়ন ও তথাকথিত ‘গ্রামায়ণ’-এর নামে নির্বিচারে গাছপালা কেটে কৃত্রিম প্রযুক্তি দিয়ে সৌন্দর্য বর্ধনের প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যেই পৃথিবী এক ভয়াবহ অক্সিজেন সংকটের মুখোমুখি হতে পারে—এই আশঙ্কা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক কথা নয়, বরং আমাদের চারপাশের নির্মম বাস্তবতা।

​একটা সময় ছিল যখন শহর ও গ্রামের মধ্যে একটা সুষ্পষ্ট মেলবন্ধন ছিল। গ্রাম মানেই ছিল বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। কিন্তু বর্তমান যুগে শুরু হয়েছে ‘আধুনিক গ্রামায়ণ’। গ্রামীণ রাস্তা পাকা করা কিংবা বিলাসবহুল ভবন ও রিসোর্ট বানানোর জন্য প্রতিদিন কাটা হচ্ছে শতবর্ষী গাছপালা।

প্রাকৃতিক সবুজকে উপড়ে ফেলে সেখানে স্থান করে নিচ্ছে কৃত্রিম ফোয়ারা, প্লাস্টিকের ঘাস আর নিয়ন আলোর ঝলকানি। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, কৃত্রিম প্রযুক্তি আমাদের চোখকে সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু আমাদের ফুসফুসকে অক্সিজেন দিতে পারে না।

​প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জোয়ারে আমরা আমাদের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্যগুলোকে হারিয়ে ফেলছি। এক সময় বাংলার গ্রামীণ জনপদে বাঁশ, কাঠ এবং মাটির তৈরি গৃহের আধিক্য ছিল। মাটির ঘরকে বলা হতো ‘গরিবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসস্থান’, যা পরিবেশের তাপমাত্রা ও ভারসাম্য বজায় রাখত। আজ এই আধুনিক যুগে সেই ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী প্রায় বিলীনের পথে।

​মাটির ঘরের জায়গা দখল করেছে ইট-পাথরের বহুতল ভবন। শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রামেও ইট, বালু, সিমেন্ট আর রডের ব্যবহারে চারিদিকে গড়ে উঠছে আকাশচুম্বী দালানকোঠা। কিন্তু এই কংক্রিটের অরণ্য দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে পরিবেশকে প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত করে তুলছে।

অন্যদিকে, ইট তৈরির জন্য উর্বর মাটির উপরিভাগ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে এবং ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে কার্বন বাড়িয়ে অক্সিজেনের স্তরকে ধ্বংস করছে। সিমেন্ট ও কংক্রিট উৎপাদন প্রক্রিয়া বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​এই পরিস্থিতি আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য একটি বড় হুঁশিয়ারি। কৃত্রিম সৌন্দর্যের অন্ধ মোহ ত্যাগ করে আমরা যদি এখনই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নে নজর না দিই, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে সত্যি সত্যিই মানবজাতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী অক্সিজেন সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

উন্নয়ন প্রয়োজন, তবে তা প্রকৃতিকে হত্যা করে নয়। প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে যদি আমরা টেকসই পরিকাঠামো নির্মাণ করতে না পারি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এই পৃথিবীটি হবে সম্পূর্ণ ‘অক্সিজেন শূন্য’ এক জীবন্ত কবরস্থান।

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ খ্রি

You might like

About the Author: priyoshomoy