

সম্পাদকীয়
একটি গোলাকার ফুটবল কিংবা সাড়ে পাঁচ আউন্সের একটি চামড়ার বল যখন সীমানা ছাড়িয়ে সীমানান্তরে ছোটে, তখন ভৌগোলিক মানচিত্রের সমস্ত দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। খেলাধুলা, বিশেষ করে বিশ্বকাপÑতা ফুটবলই হোক কিংবা ক্রিকেটÑবাঙালি মানসে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এক পরম উদযাপনের নাম। বিশ্বকাপ এলেই ষোলো কোটির এই বদ্বীপ এক অদ্ভুত, জাদুকরী ও আবেঘন চাদরে ঢাকা পড়ে। বিশ্বের তাবড় তাবড় পরাশক্তি যেখানে খেলার মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে মগ্ন, সেখানে হাজার মাইল দূরের এক বাংলাদেশ কোনো এক অলৌকিক টানে সেই আনন্দের অংশীদার হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপ আর বাংলাদেশের এই আনন্দ এক চিরন্তন, মনস্তাত্তি¡ক এবং সমাজতাত্তি¡ক মেলবন্ধন, যা আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে এক পশলা বিশুদ্ধ আনন্দ এনে দেয়।
বিশ্বকাপের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বাংলাদেশের আকাশ-বাতাসে এক দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের টিনের চালা থেকে শুরু করে রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদÑসবখানে পতাকার সুনামি নেমে আসে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ক্রিকেটের কোনো পরাশক্তিÑযাকে কেন্দ্র করেই হোক না কেন, বাঙালির এই উন্মাদনা পৃথিবীর বুকে অনন্য। বিদেশী কোনো দেশের প্রতি এই বিপুল ভালোবাসা দেখে অনেক সময় বহির্বিশ্বের মানুষ চমকে ওঠে। কাতার ফুটবল বিশ্বকাপ বা সাম্প্রতিক বড় টুর্নামেন্টগুলোতে বাংলাদেশের এই উন্মাদনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। ফিফা বা আইসিসির অফিশিয়াল পেজে বাংলাদেশীদের এই আবেগকে কুর্নিশ জানানো হয়েছে। খেলা এখানে কেবল মাঠের ৯০ মিনিট বা ১০০ ওভারের হিসেব নয়; এটা এমন এক উৎসব, যা মানুষকে সাময়িকভাবে হলেও তার দৈনিক দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন ভুলিয়ে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।

এখানেই বাংলাদেশের আনন্দের সার্থকতা। যে দেশের সাথে আমাদের কোনো সরাসরি রক্তের সম্পর্ক নেই, ভাষার মিল নেই, সেই লাতিন আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো দলের জয়ে এ দেশের মানুষের চোখ আনন্দে অশ্রæসজল হয়ে ওঠে, আবার তাদের পরাজয়ে পুরো পাড়ায় নেমে আসে শ্মশানের নীরবতা। এই যে নিঃস্বার্থ আবেগ, এটাই বাঙালির আনন্দের মূল চালিকাশক্তি।
আধুনিক যুগে যখন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ কমছে, সবাই যখন চার দেয়ালের মাঝে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি, তখন বিশ্বকাপ যেন এক সামাজিক জাদুকর হিসেবে আবির্ভ‚ত হয়। এটি মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনে, এক জায়গায় জড়ো করে। পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বড় প্রজেক্টরের সামনে যখন হাজারো মানুষ একসাথে জড়ো হয়, তখন সেখানে কোনো ধনী-দরিদ্রের ভেদ থাকে না। রিকশাচালক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পাশাপাশি বসে একই দলের জন্যে গলা ফাটান।
খেলা দেখার সমান্তরালে চলে খাওয়া-দাওয়ার উৎসব। আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই পাড়ায় পাড়ায় কাচ্চি বা খিচুড়ি রান্নার ধুম। এই যে একসাথে মিলেমিশে খাওয়া এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা, তা আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক সম্প্রীতিকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে। পাড়ার চায়ের দোকানে চায়ের কাপে ঝড় তোলা সেই চিরচেনা বিতর্কÑকে সেরা, কার কয়টা ট্রফিÑএই হালকা বিতর্কগুলোর মধ্যে কোনো হিংসা থাকে না, থাকে এক ধরনের অনাবিল নিখাদ আনন্দ।
পরের দেশের জন্যে আমুদে বাঙালি যতটা উন্মাদনা দেখায়, নিজের দেশ যখন সেই বৈশ্বিক মঞ্চে পা রাখে, তখন আনন্দের মাত্রা পৌঁছায় এক অলৌকিক উচ্চতায়। ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন কোনো বড় দলকে হারায়, তখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেভাবে গর্জে ওঠে, তার কোনো তুলনা পৃথিবীতে নেই। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই জয় থেকে শুরু করে ২০১৫ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের যেকোনো বড় জয়Ñবাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা আর আনন্দের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই ক্রীড়াঙ্গনেই।
লাল-সবুজের জার্সি গায়ে যখন এ দেশের এগারোটা ছেলে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গায়, তখন গ্যালারির বা টিভির সামনের কোটি কোটি মানুষের চোখে যে আনন্দাশ্রæ দেখা যায়, তা কেবলই এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব। এ আনন্দ আত্মপরিচয়ের, এই আনন্দ এক বুক গর্বের।
বাংলাদেশের মানুষের এই ক্রীড়াপ্রেমি কেবল দেশের গণ্ডির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক অনন্য ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতে সাহায্য করছে। ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের দর্শকদের উন্মাদনা বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছায়, যা বাংলাদেশকে একটি প্রাণবন্ত জাতি হিসেবে তুলে ধরে। খেলাধুলার এই আবেগ দেখে বিদেশী সাংবাদিক ও পর্যটকরা বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হন, যা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও আতিথেয়তাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে। এমনকি আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার জবাবে আর্জেন্টিনা সরকার ঢাকায় পুনরায় তাদের দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, যা ক্রীড়াভিত্তিক ক‚টনীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
তবে যেকোনো আনন্দেরই একটা অন্ধকার দিক থাকতে পারে যদি না সেখানে সংযম থাকে। বিশ্বকাপে দল সমর্থন করা নিয়ে মাঝেমাধ্যে যে অপ্রীতিকর ঘটনা, মারামারি বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি দেখা যায়, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। খেলাধুলার মূল সুরই হলো খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। অন্য একটি দলকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে প্রতিপক্ষ দলকে বা তার সমর্থককে শত্রæ ভাবতে হবে। আনন্দ তখনই সার্থকতা পায় যখন তা সবার মুখে হাসি ফোটায়, কারো মনে আঘাত দেয় না। তাই উৎসবের এই আবহে আমাদের আরো বেশি সহনশীল এবং পরমতসহিষ্ণু হতে হবে। বিদেশী দলের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব ফুটবল ও ঘরোয়া অন্যান্য খেলার প্রতিও এই ভালোবাসার কিয়দাংশ ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে আমাদের নিজস্ব ক্রীড়াঙ্গনও একদিন বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বকাপ আসে এবং চলে যায়। ট্রফি কোনো একটি দেশ জিতে নেয়, বাকিরা রানার্স-আপ বা পরাজিত হয়ে বাড়ি ফেরে। কিন্তু এই এক-দেড় মাসের টুর্নামেন্টটি বাংলাদেশের মানুষকে যে অনাবিল আনন্দ, রোমাঞ্চ আর ঐক্যের অনুভ‚তি দিয়ে যায়, তার রেশ থেকে যায় বহু বছর। দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাপোড়েন, সামাজিক কোলাহল আর অর্থনৈতিক ব্যস্ততার মাঝে বিশ্বকাপ যেন এক টুকরো নীল আকাশ, যেখানে বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। মাঠের বলটির গড়ানোর সাথে সাথে যেভাবে কোটি বাঙালির হৃদস্পন্দন ওঠানামা করে, তা প্রমাণ করে আমরা কতটা জীবন্ত, কতটা আবেগপ্রবণ এবং কতটা ভালোবাসতে জানা এক জাতি। বিশ্বকাপ আর বাংলাদেশের এই আনন্দের জয়যাত্রা চলুক অনন্তকাল; লাল-সবুজের বুকে বৈশ্বিক এই আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ুক বারবার।













