সন্তান বিক্রি করে দেয়া : আর কতো অমানবিকতা

সম্পাদকীয়

মাটির বুক চিরে যখন হাহাকার ওঠে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আমরা মানুষ হিসেবে কতোটা নিচে নেমে গেছি। সভ্যতার এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও যখন খবর পাওয়া যায়Ñমাত্র ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ৬ মাসের একটি কোলের শিশুকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, তখন থমকে দাঁড়াতে হয়। এই মানবজগৎ কি তবে দিন দিন তার পশুর রূপ ধারণ করছে? আর কতোটা অমানবিকতা দেখলে আমাদের বিবেকের ঘুম ভাঙবে?

ঘটনাটি কুমিল্লার মুরাদনগর ও বাঙ্গরা বাজার এলাকার। অভাবের তাড়না নাকি চক্রান্ত- কারণ যাই হোক না কেন, ছ’ মাসের এক ফুটফুটে শিশুকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে টাকার বিনিময়ে পরহাতে তুলে দেয়া হলো! যে মা গর্ভে ধারণ করলো, দুধ খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখলো, অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বা বিভ্রান্ত করে সেই মায়ের কোল খালি করে দেয়া হলো। এক মা যখন অবুঝের মতো কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের সন্তানকে ফেরত চান, তখন সেই আহাজারি আকাশের বাতাসকেও ভারী করে তোলে।

সন্তান বিক্রি করে দেয়ার এ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিন্তু এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের চরম নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবকে আরো একবার নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুললো। অভাব মানুষকে কতোটা লাচার করতে পারে, কিংবা চরম স্বার্থপরতা মানুষকে কতোটা অন্ধ করতে পারে, এ ঘটনা তার এক ভয়ঙ্কর দলিল।

অভিযুক্ত স্বজনরা একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ বলছেন স্ট্যাম্পে শুধু স্বাক্ষর করেছেন, কেউ বলছেন কিছুই জানেন না! আবার বাচ্চার বাবাও নীরব। প্রশ্ন ওঠে, একটি শিশুর জীবন কি শুধুই কিছু টাকার খেলা? নাকি স্ট্যাম্পের একটি স্বাক্ষরই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে?

অবশ্যই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এগিয়ে এসেছে এবং শিশুটিকে উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছে। এটি আশার কথা। তবে শুধু শিশুটিকে উদ্ধার করলেই কি এই অপরাধের বিচার শেষ হয়ে যাবে? যারা একজন অসুস্থ মায়ের সরলতার সুযোগ নিয়ে কিংবা ষড়যন্ত্র করে এমন অমানবিক কাজ করলো, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

আমরা আর কোনো মায়ের কোল খালি দেখতে চাই না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে জাগ্রত হতে হবে। এই সমাজকে ভালোবাসার ও নিরাপত্তার জায়গায় পরিণত করতে হবে, কোনো পশুপালনের চারণভূমি নয়। শিশুটিকে অবিলম্বে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়া হোক- এটাই এখন সময় ও বিবেকের একমাত্র দাবি।

প্রকাশিত :  ‍মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy