

অমিত সেনগুপ্ত যখন ‘সুরভী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্প প্রদর্শনী বোর্ড’-এর মহাপরিচালকের চেয়ারে বসলেন, তখন চারপাশের বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। এই বোর্ডটি ছিল অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো ও মর্যাদাপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে কাজ করার স্বপ্ন দেখত বহু তরুণ-তরুণী। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠানেও লেগেছিল দুর্নীতির হাওয়া। যোগ্যতার মূল্যায়ন ধীরে ধীরে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। অমিতবাবুর ঠিক উলটো পিঠেই ছিলেন মৃণাল চক্রবর্তী। মৃণালবাবু ছিলেন এই বোর্ডেরই একজন জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা।
দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। হস্তশিল্পের ওপর তাঁর গবেষণা এবং নতুন ডিজাইনের কাজগুলো বোর্ডের সুনামকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর তৈরি করা নকশাগুলো কেবল দেশেই নয়, বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল। মৃণালবাবুর সাথে তাঁর সহকর্মী সুমিত রায়ও ছিলেন। সুমিতবাবু ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান এক তরুণ, যিনি নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া এনেছিলেন এই শিল্পে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন বোর্ডের নতুন পদোন্নতির তালিকা প্রকাশিত হলো। মৃণালবাবু আশা করেছিলেন, তাঁর পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা এবং সফল কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পরিচালক পদে উন্নীত হবেন। সুমিতও আশা করেছিল তার গবেষণার স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু ফলাফল প্রকাশিত হতেই দুজনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। দেখা গেল, পরিচালক পদে উন্নীত হয়েছেন রতন রায়চৌধুরী—যিনি বোর্ডে যোগ দিয়েছিলেন মাত্র দুই বছর আগে এবং যাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা বা কাজের রেকর্ড ছিল না। রতনের একটাই যোগ্যতা ছিল—তিনি মহাপরিচালক অমিত সেনগুপ্তের দূরসম্পর্কের আত্মীয় এবং প্রতিদিন মহাপরিচালকের টেবিলে গিয়ে মিষ্টিমুখ করানো থেকে শুরু করে তোষামোদে ব্যস্ত থাকতেন।
সেদিন বিকেলে অফিসের করিডোরে দাঁড়িয়ে মৃণালবাবু আর সুমিতবাবু নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলেন। মিতালবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সুমরঃ, এই প্রতিষ্ঠানে কি তবে যোগ্যতার কোনো মূল্যই নেই? আমরা সারাদিন রাত এক করে কাজ করলাম, আর রতন কেবল স্যারের পিছু পিছু ঘুরে আজ আমাদের ওপরে বসে গেল!” সুমিত মাথা নিচু করে বলল, “মৃণালদা, আমি তো আর এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কোনো আগ্রহই পাচ্ছি না। যেখানে পরিশ্রামের চেয়ে তোষামোদের কদর বেশি, সেখানে সততার সাথে কাজ করা মানে নিজের সাথে বেইমানি করা। শুধু কি তাই? আমার তো এখন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিই সব আস্থা উঠে গেছে।”
কথাগুলো শুধু সুমিতের একলার ছিল না, এটি ছিল পুরো অফিসের বহু কর্মীর মনের কথা। রতনের পদোন্নতির পর থেকেই অফিসে এক ধরণের শীতল পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। যারা সত্যি সত্যিই দেশের হস্তশিল্পকে ভালোবাসত, তারা একে একে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করল। রতন প্রতিদিন অফিসে আসত দেরিতে, এসেই মহাপরিচালকের কামরায় ঢুকে দীর্ঘক্ষণ খোশগল্প করত। কাজের টেবিলে তার কোনো ফাইল জমলে সে তা সুমিত বা অন্য কোনো জুনিয়র কর্মীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিত। আর নিজে নাম কুড়াত মহাপরিচালকের সামনে গিয়ে। অমিতবাবু অবশ্য এসব চোখ বন্ধ করে সহ্য করছিলেন।
তিনি জানতেন কে কতটা যোগ্য, কিন্তু পরিচিতি আর তোষামোদের মোহে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, যাঁদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত খাতির আছে, তাঁরাই কেবল তাঁর অনুগত থাকবেন। কাজের গুণগত মান বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। এরই মধ্যে এল বার্ষিক হস্তশিল্প প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার আয়োজন। এটি ছিল বোর্ডের বছরের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের সফলতার ওপর নির্ভর করত সরকারের কাছ থেকে পরবর্তী বছরের বাজেট বরাদ্দ। প্রতি বছর এই মেলার মূল পরিকল্পনা ও নকশার দায়িত্ব থাকত মৃণালবাবুর ওপর। কিন্তু এবার অমিতবাবু রতনকে প্রধান সমন্বয়ক করে দিলেন। মৃণালবাবুকে বলা হলো রতনের অধীনে কাজ করতে।
মৃণালবাবু আত্মসম্মানে আঘাত পেলেন। তিনি অমিতবাবুর কামরায় গিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, “স্যার, আমি দীর্ঘ পনেরো বছর এই প্রতিষ্ঠানের সেবা করেছি। কিন্তু জুনিয়র একজন কর্মীর অধীনে বড় এই মেলার দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া রতন এই কাজের কিছুই বোঝে না।” অমিতবাবু ভ্রু কুঁচকে বললেন, “মৃণালবাবু, আপনি বড় বেশি অহংকারী হয়ে গেছেন। পদোন্নতি পাননি বলে কি এখন কর্তব্যে অবহেলা করবেন? রতন বেশ চটপটে ছেলে, ও সব সামলে নেবে। আপনাকে ওর সাহায্য করতে হবে।”
মৃণালবাবু আর কোনো কথা বাড়ালেন না। তিনি বুঝলেন, এখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো আশাই নেই। তিনি নীরবে নিজের টেবিলে ফিরে এলেন। সেদিন থেকেই তিনি আর অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকা বন্ধ করে দিলেন। ঠিক সময়ে অফিসে আসা এবং ঠিক সময়ে বাড়ি ফেরা—এটাই হয়ে দাঁড়াল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। কাজের প্রতি যে উদ্দীপনা ও ভালোবাসা তাঁর ছিল, তা চিরতরে হারিয়ে গেল। এদিকে সুমিত তো আরও এক পা এগিয়ে গেল। সে গোপনে অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করতে শুরু করল এবং মাসখানেক পরেই সে পদত্যাগপত্র জমা দিল। সুমিতের পদত্যাগপত্র দেখে অমিতবাবু অবাক হয়ে বললেন, “সুমরঃ, তুমিও এমন অবুঝের মতো কাজ করছ? তোমার সামনে তো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল!”
সুমিত মৃদু হেসে উত্তর দিল, “স্যার, যে বাগানে যত্নের চেয়ে আগাছাকে বেশি সার দেওয়া হয়, সে বাগান থেকে ফুল ঝরে পড়াই স্বাভাবিক। আমি এমন জায়গায় কাজ করতে চাই না যেখানে যোগ্যতার কোনো মূল্যায়ন হয় না।” সুমিতের এই চলে যাওয়াটা বোর্ডের জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল, কারণ মেলার মূল প্রযুক্তিগত দিকটি সেই দেখভাল করত। কিন্তু অমিতবাবু বা রতন কেউই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাল না। তারা নিজেদের ঢাক নিজে পেটানোয় ব্যস্ত রইল। অবশেষে এল সেই প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিন। চারদিকে জমকালো আয়োজন। অনেক মন্ত্রী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। কিন্তু মেলার ভেতরে প্রবেশ করতেই শুরু হলো বিপর্যয়।
রতনের অপরিকল্পিত স্টল বিন্যাসের কারণে ভিড় সামলানো গেল না। বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রধান মঞ্চের আলো নিভে গেল। বিদেশি অতিথিরা এসে দেখলেন, যে হস্তশিল্পগুলোর কথা প্রচার করা হয়েছিল, তার মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং কারুশিল্পীদের অনেকেই বয়কট করায় আসল শিল্পগুলো প্রদর্শনীতেই স্থান পায়নি। চারদিকে সমালোচনার ঝড় উঠল। সংবাদপত্রে বড় বড় অক্ষরে লেখা হলো—‘বোর্ডের অব্যবস্থাপনা ও তোষামোদের সংস্কৃতির কারণে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প প্রদর্শনী পণ্ড’।
সরকারের উচ্চমহল থেকে তদন্ত কমিটি বসল। তদন্তে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মহাপরিচালক অমিত সেনগুপ্ত যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অযোগ্য ও তোষামোদকারী রতন রায়চৌধুরীকে বড় দায়িত্ব দেওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে। ফলাফল হিসেবে অমিতবাবুকে তাৎক্ষণিকভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো এবং রতনকে বরখাস্ত করা হলো। কয়েক মাস পর। সেদিন সকালেও বোর্ডের সেই পুরোনো করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মৃণাল চক্রবর্তী।
অমিতবাবু আর নেই, নতুন এক মহাপরিচালক এসেছেন যিনি যোগ্যতার ভিত্তিতেই সবকিছু পরিচালনা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মৃণালবাবুর মনের সেই পুরোনো আগুন আর জ্বলল না। তিনি আজও নিয়মিত অফিস করেন, ফাইলপত্র সই করেন, কিন্তু কাজের সেই আনন্দ আর গভীরে টান তিনি আর খুঁজে পান না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একবার কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারিয়ে গেলে, ওপরের কর্তাব্যক্তিরা বদলে গেলেও সেই ক্ষত সহজে শুকায় না। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি আর তোষামোদের জয়জয়কার যেখানে একবার শুরু হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠান শুধু মেধাবী কর্মীই হারায় না, হারিয়ে ফেলে তার প্রাণশক্তিকেও।
প্রকাশিত: বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.













