

ক্ষুদীরাম দাস :
১ম অধ্যায়: নীরব বিষাদ
সকালবেলার মিষ্টি রোদটুকুও মাঝেমধ্যে ঘরটার ভেতর ঢুকতে পারত না। শহরের একটি পুরোনো পাড়ার সেকেলে দোতলা বাড়ির নিচতলায় থাকত অয়ন আর মৌমিতা। অয়নের বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সে। সারাদিনের ধকল সামলে যখন ঘরে ফিরত, তখন তার কাঁধের ওপর যেন আস্ত একটা পাহাড় চেপে বসত। কিন্তু সেই ক্লান্তি মুছে ফেলার মতো কোনো স্নেহের ছোঁয়া বা শান্তির নিঃশ্বাস কি তার জন্য অপেক্ষা করে থাকত? না, কখনোই না।
দরজায় খিল খোলার শব্দ হতেই মৌমিতার চেরা গলার স্বর ভেসে আসত।

— “এত দেরি হলো কেন? বাজারে গিয়ে মাছ আনতেও কি সারা দিন লেগে যায়? নাকি অন্য কোথাও আড্ডা দিয়ে এলে?”
অয়ন ক্লান্ত মুখে বলত, — “অফিস শেষ করে আসার পথে একটু জ্যামে পড়ে গিয়েছিলাম। তাছাড়া আজ বসের একটা জরুরি ফাইল দেখতে হয়েছিল।”
মৌমিতা বাঁকা হেসে বলত, — “সবাই তো অফিস করে, আর তোমারই শুধু এত ঝামেলা! আমার ভাগ্যে তো কেবল একটা অপদার্থ জুটেছে। একটা ভালো শাড়ি বা গহনা কিনে দিতে পারো না, সারাদিন শুধু অজুহাত!”
অয়ন কোনো কথা বলত না। চুপচাপ জুতো খুলে ঘরে ঢুকে নিজের ঘামভেজা শার্টটা বদল করত। সে ভালো করেই জানত, কোনো প্রতিবাদ করলে অশান্তি আরও বেড়ে যাবে। তাই সে সহ্য করাকেই বেছে নিয়েছিল। মৌমিতার পরিবার শুরু থেকেই একটু অহংকারী ছিল। তারা মনে করত অয়ন তাদের মেয়ের যোগ্য নয়। বিয়ের পর থেকেই প্রতিনিয়ত অয়নকে ছোট করা, তার চাকরি নিয়ে কটূক্তি করা এবং তার বাবা-মাকে নিয়ে অপমানজনক কথা বলাটা মৌমিতার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
মাঝেমধ্যে অয়নের খুব ইচ্ছে করত প্রাণ খুলে কাঁদতে। একজন পুরুষেরও তো কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে। সমাজের চোখে পুরুষ মানেই যেন পাথর, যার কোনো অনুভূতি থাকতে পারে না। কিন্তু সে যখন দেখত তার ছোট মেয়ে পুতুল ভয়ে কোণায় দাঁড়িয়ে আছে, তখন সে বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটাকে জোর করে গিলে ফেলত। পুতুল মায়ের বকুনি খেয়ে সবসময় তটস্থ থাকত।
২য় অধ্যায়: তিল তিল করে নিঃশেষ হওয়া
সময় বয়ে যেতে লাগল। দিন যত যাচ্ছিল, মৌমিতার দুর্ব্যবহার ততই বাড়ছিল। সে শুধু অয়নকে মৌখিকভাবেই অপমান করত না, মাঝে মাঝে ঘরের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে চরম অশান্তি তৈরি করত। পাশের ফ্ল্যাটের লোকজনও এই নিত্যদিনের কোলাহলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কেউ কি কখনো এগিয়ে এসেছিল? না, কেউ এগিয়ে আসেনি। সবাই নিজেদের মতো করে দরজা বন্ধ করে রাখত।
অয়ন অফিসের টেবিলে বসে প্রায়ই শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত। তার চোখের নিচে কালি জমে গিয়েছিল। চুলগুলো অল্প বয়সেই পেকে যেতে শুরু করেছিল। সহকর্মীরা বলত, — “অয়ন দা, তোমাকে আজকাল খুব ক্লান্ত দেখায়। শরীর কি ভালো নেই?”
অয়ন মৃদু হেসে বলত, — “না রে ভাই, একটু ঘুমের সমস্যা হচ্ছে।”
সে কাউকে বলত না যে তার এই ক্লান্তির উৎস কোনো শারীরিক রোগ নয়, বরং তার নিজের ঘরের এক অদ্ভুত অদৃশ্য কারাগার। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর সময় সে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবত, সে কি সত্যিই এত অপরাধী? সে তো সাধ্যমতো চেষ্টা করত পরিবারকে ভালো রাখতে। নিজের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে সে মৌমিতার বায়না মেটাত। তবুও কেন এই অপমান?
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তীব্র ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছিল অয়ন। বৃষ্টিতে ভিজে তার জ্বর এসে গিয়েছিল। গায়ে প্রচণ্ড কাঁপুনি নিয়ে সে যখন ঘরে ফিরল, তখন মৌমিতার হাতে এক কাপ চা পাওয়ার বদলে সে পেল শুধু কড়া কথা।
— “সারাদিন তো ঘুরে এলে, এখন আবার নাটক শুরু করলে বুঝি? আমার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে, আর তোমার আবার জ্বর এল! ডাক্তার দেখানোর টাকা কোথায় পাবো শুনি?”
অয়ন কোনো কথা না বলে ভেজা কাপড়েই খাটের একপাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। তার মাথাটা ফুঁসে উঠছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা যেন গোল গোল ঘুরছে। সে বিড়বিড় করে ভাবল, “সংসার কি তবে এভাবেই নরক হয়ে যায়?”
৩য় অধ্যায়: অহংকারের পতন
মৌমিতা আর তার বাপের বাড়ির লোকজন নিজেদের অহংকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা ভাবত অয়ন এতটাই দুর্বল যে সে কখনোই প্রতিবাদ করতে পারবে না। মৌমিতা প্রায়ই বলত, — “আমার মতো মেয়েকে বিয়ে করেছিস বলেই তো তোদের মতো গরিব ঘরের ছেলে শহরের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে পারছে। নইলে কে তোকে পাত্তা দিত?”
এই ক্রমাগত অপমান আর মানসিক নির্যাতনের একটা চরম সীমা ছিল। সেদিন ছিল রবিবার। মৌমিতার বাবা ও ছোট ভাই হঠাৎ বাড়িতে এসে হাজির হলো। এসেই তারা অয়নের ওপর চড়াও হলো। একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তারা এমন এক কদর্য ভাষায় গালাগাল শুরু করল যা শোনার মতো নয়। মৌমিতাও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে অয়নকে অকথ্য ভাষায় অপমান করতে লাগল।
অয়ন সেদিন আর চুপ করে থাকতে পারল না। তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত অভিমান, কষ্ট আর দ্রোহ একসঙ্গে জেগে উঠল। সে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল, — “আর কত? সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার কি আমার নেই? সংসার তো কেবল একজনের অহংকার আর নির্যাতনের ওপর টিকে থাকে না। আজ তোমরা যা করছ, তার ফল তোমাদের একদিন পেতেই হবে।”
মৌমিতার ভাই উপহাস করে বলে উঠল, — “খুব তো কথা বলছ! দেখি কী করতে পারো তুমি? বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও যদি সাহস থাকে!”
অয়ন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে রইল না। সে নিজের সামান্য কিছু জামাকাপড় একটা ব্যাগে ভরল, ছোট্ট পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে কপালে একটা চুমু খেল এবং ঘর থেকে চিরকালের মতো বেরিয়ে গেল। পুতুল তখন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, কিন্তু মৌমিতারা সেদিন এতটাই অন্ধ ছিল যে তারা সেই কান্নার কোনো অর্থই বুঝতে পারেনি।
৪র্থ অধ্যায়: নতুন ভোর এবং করুণ পরিণতি
ঘর ছাড়ার পর অয়ন একটি ছোট মেসে উঠতে শুরু করেছিল। প্রথম কিছুদিন তার খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, অপমানজনক বিষাক্ত পরিবেশের চেয়ে একা থাকা অনেক বেশি শান্তির। সে নিজের কাজে মন দিল। তার মেধা ও সততার কারণে অফিসে তার পদোন্নতি হলো। সে তার মেয়ে পুতুলের খোঁজখবর রাখত গোপনে, যাতে মেয়েটার কোনো কষ্ট না হয়।
এদিকে অয়ন চলে যাওয়ার পর মৌমিতার সংসারে বিপর্যয় নেমে এল। যে অহংকার আর অর্থের মোহে তারা অন্ধ হয়েছিল, সেই অহংকারই তাদের কাল হয়ে দাঁড়াল। অয়ন চলে যাওয়ার কারণে মৌমিতার বাপের বাড়ির সাহায্য আর পাওয়া গেল না। উল্টো মৌমিতার ভাই এক বড় ধরণের ব্যবসায়িক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ল। তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে উঠে গেল। পাড়ার লোকজন যারা এতদিন ভয়ে চুপ ছিল, তারাও মুখ খুলল। কেউ তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল না।
মৌমিতা বুঝতে পারল, সে নিজের হাতে নিজের সুখের স্বর্গ ধ্বংস করে দিয়েছে। সে একা ঘরে বসে রোজ কাঁদত, কিন্তু তখন আর আফসোস করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তার রাগ, অহংকার আর চরম মানসিক নির্যাতন তাকে একাকীত্বের অতল গহ্বরে ঠেলে দিয়েছিল। তার বাবা ও ভাই ঋণগ্রস্ত হয়ে এমন এক দুর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি হলো যা কোনোদিন তারা কল্পনাও করতে পারেনি। এটিই ছিল তাদের সেই নিষ্ঠুর আচরণের করুণ পরিণতি।
অন্যদিকে অয়ন নিজের মনের ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, জীবনের পথ যতই কঠিন হোক না কেন, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। সত্যিকারের শান্তি তখনই আসে যখন মানুষ নিজের অধিকার ও মর্যাদাকে চিনতে পারে। ঘরে ফিরে শান্তি পাওয়ার অধিকার সবারই আছে—তা সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। অয়নের জীবনে অবশেষে এক নতুন ও শান্তিময় সকালের সূর্য উদিত হলো।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.













