মনপুরায় শিক্ষককে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন

মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি  :
ভোলার মনপুরায় লজিং বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হিদু ধর্মীয় এক শিক্ষককে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন চালায় একদল দুর্বৃত্তরা। জোর করে ওই শিক্ষকের কাছ থকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে ভিডিও ধারন করে।

শুক্রবার রাত আনুমানিক ১২ টায় উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সিরাজগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে করাত কলের পাশে এই ঘটনা ঘট।

খবর পেয়ে রাতেই উপজেলার ৪ নং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অলি উল্লা কাজল ও সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মােঃ জামাল উদ্দিন ওই শিক্ষক কে উদ্ধারে করে উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

এদিকে এই ঘটনায় শিক্ষক সমিতির নেতারা ও স্থানীয় ইমাম সমিতির নেতার নিন্দার পাশাপাশি দােষীদের দৃষ্টাত মূলক শাস্তি দাবী করেন।

পরে শনিবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় ওই শিক্ষক বাদী হয় ৯ জনসহ অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামী করে মনপুরা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এদিকে এই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত ও শিক্ষক নির্যাতনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ওসি মােঃ জহিরুল ইসলাম।

নির্যাতনে আহত শিক্ষক হলেন, সুব্রত বালা। তিনি মনপুরার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হিদু ধর্মীয় শিক্ষক হিসাবে কর্মরত। শিক্ষকের বাড়ি গােপালগঞ্জ জেলার মােকসেদপুর উপজেলার বহুগ্রাম ইউনিয়নে বহুগ্রাম গ্রামে। তিনি মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রতাপ চদ্র দাসের বাড়িতে লজিং টিচার হিসাবে থাকেন।

শিক্ষক নির্যাতন অভিযুক্তরা হলেন, মােঃ সােহাগ বর্দ্দার (৩০), মােঃ মুরাদ হােসেন (২১), মােঃ রাহাত (১৮), মােঃ ফাহাদ (২০), মােঃ সুজন (২০), মােঃ শাকিব (২২), মােঃ ইমন (১৮), মােঃ জাহিদ (১৯), মোঃ আরিফ (২০) সহ অজ্ঞাত ৫-৬ জন। সকলের বাড়ি উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বিভিন গ্রামে।

যে ঘটনাকে কেদ্র করে শিক্ষক নির্যাতনঃ
গত ২১ জুন বুধবার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভােকেশনাল শাখার নবম শ্রেণীর ইংরেজী বিষয় অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় পরিদর্শক হিসাবে হলরুমে প্রবেশ করেন শিক্ষক সুব্রত বালা। পরে তিনি কয়েকজন পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইংরেজী গাইড ও বই উদ্ধার করে হলরুমের মেঝেতে রাখে। পরীক্ষার শেষে পরীক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ইসলাম ধর্ম বই মেঝেতে রেখে অবমাননার অভিযোগ এনে প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ দেয়। তাৎক্ষনিক প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন ওই শিক্ষককে ডেকে স্কুলের সকল শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের সামনে ঘটনা জানতে চান। তখন অভিযুক্ত শিক্ষক সুব্রত বালা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইংরেজী বই ও গাইড উদ্ধার করে মেঝেতে রেখেছেন বলে জানায়। সেখানে ইসলাম ধর্ম বই ছিল না বলে তিনি জানান। তারপরেও শিক্ষার্থীদের চাপের কারণে এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক স্কুলের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ক্ষমা চান। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তখন ঘটনাটি মিটমাট হয়ে যায়।

কিন্তু ওই দিন বিকালে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও ইমাম সমাজ ঘটনা জানতে পারলে ঘটনার রুপ পাল্টাতে থাকে। ওই দিন সন্ধ্যায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও ইমাম সমাজ ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ইসলাম ধর্ম বই অবমাননা করার অভিযোগ তুলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি অলি উল্লা কাজলের কাছে বিচার দাবী করেন। পরে চেয়ারম্যান সকলের মতামত নিয়ে ২৪ জুন শনিবার বিকেলে স্কুলে অভিযুক্ত শিক্ষককে নিয়ে বসার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বসার একদিন পূর্বেই শুক্রবার রাতে ওই শিক্ষককে লজিং বাড়ি থেকে ফ্লিম স্টাইলে তুলে সিরাজগঞ্জ বাজারে পাশবিক কায়দায় নির্যাতন চালায় দুর্বৃত্তরা।

শিক্ষক সুব্রতা বালা জানান, শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১ টা থেকে ১২ টার মধ্যে ৫-৭ টি মােটর সাইকেলে ১৫-১৬ জন এসেছে আমাকে লজিং বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার জন্য । পরে ওরা সিরাজগঞ্জ বাজারের দক্ষিণ পাশে করাত কলে নিয়ে গিয়ে লাকড়ী ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। মারধরের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি একটি দােকানে। সেখানে আমার কাছ থেকে ইসলাম ধর্ম বই অবমাননা করি এর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে ভিডিও ধারন করে। পরে চেয়ারম্যান ও আমার প্রধান শিক্ষক আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় থানায় লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে মামলার আবেদন করি।

এই ব্যাপারে সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মােঃ জামাল উদ্দিন জানান, শুক্রবার রাতে হিদু ধর্মীয় শিক্ষক সুব্রতা বালাকে উদ্ধার করে হাসাতালে ভর্তি করি। তিনি আরও জানান, গত বুধবার ওই শিক্ষক ভােকেশনাল শাখার ইংরেজি বিষয়ে পরীক্ষার পরিদর্শক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। পরীক্ষার শেষে পরীক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম বই মেঝেতে ফেলে অবমাননা অভিযোগ তুলে। পর স্কুলের সকল শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক সুব্রতা বালাকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ইসলাম ধর্ম বই মেঝেতে রাখেনি বরং পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইংরেজী বই ও গাইড উদ্ধার করে মেঝেতে রেখেছে বলে জানায়। পরে তিনি তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চান। আমিও ওই শিক্ষকের হয়ে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করি।

এই ব্যাপারে দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ইসলামী আদোলনের সভাপতি হাফেজ আবদুল মতিন জানান, ইসলাম ধর্ম বই অবমাননার বিষয় জানতে পেরে আমার কয়েকজন চেয়ারম্যানের কাছে বিচার দাবী করি। শনিবার বিকেলে ওই শিক্ষককে নিয়ে বসার তারিখ ঠিক হয়। কিন্তু শুক্রবার রাতে ওই শিক্ষককে যারা নির্যাতন করেছে তাদের বিচার দাবী ও ঘটনার নিন্দা জানাই। কারণ ইসলাম কখনো সংঘাত চায় না।

এই ব্যাপারে মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি অলি উল্লা কাজল জানান, ইসলামী আন্দোলনের নেতারা সহ আলেমরা ইসলাম ধর্ম বই অবমাননা করায় শিক্ষককের বিচার দাবী করে। পরে শনিবার বিকেলে ঘটনার বিষয়ে ওই শিক্ষককে নিয়ে বসার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে শুক্রবার রাতে ওই শিক্ষককে লজিং বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন চালায়। পরে আহত অবস্থায় ওই শিক্ষককে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এই ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষক সমিতির নেতা আলমগীর হােসেনসহ একাধিক নেতারা জানান, শিক্ষককে এইভাবে তুলে নিয়ে যারা পাশবিক কায়দায় নির্যাতন করেছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করার দাবী করেন।

এই ব্যাপারে মনপুরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মােঃ জহিরুল ইসলাম জানান, শিক্ষককে তুলে নিয়ে নির্যাতনের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম বই অবমাননা ও শিক্ষক নির্যাতনের বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে পুলিশ তদন্ত করছে। আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

You might like