

ক্ষুদীরাম দাস
রাতের অন্ধকার যতোটা না ঘন ছিলো, তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর কালো অন্ধকার নেমে এসেছিলো অনিমেষের বুকের ভেতর| ঘড়িতে তখন রাত দু’টো| ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সে অন্ধকারের মধ্যদিয়ে তাকিয়ে ছিলো শোবার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে| তার সমস্ত শরীর রাগে আর অপমানে কাঁপছিলো| চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিলো| কপালে জেগে উঠেছিলো রাগের মোটা মোটা শিরা|

অনিমেষ আর শ্রাবণীর বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় সাত বছর| তাদের ঘরে কোনো শিশুরা নেই, তবে সুখের কোনো অভাব ছিলো না—অন্তত অনিমেষ এতোদিন তা’ই ভেবে এসেছিলো| কিন্তু মানুষের মনের ভেতর যে এতোটা নোংরামি লুকিয়ে থাকতে পারে, তা’ সে আজ নিজের চোখে না দেখলে কোনোদিন বিশ্বাস করতো না| শ্রাবণী পরকীয়ায় জড়িয়েছে| কার সাথে? অনিমেষের নিজের মামাতো ভাই বিপ্লবের সাথে| যে বিপ্লব এই বাড়িতে দিনের পর দিন এসেছে, অনিমেষের টাকায় খেয়েছে, শুয়েছে, সে-ই শেষ পর্যন্ত অনিমেষের পিঠে এই ভয়ঙ্কর ছুরিটা মারলো!
এক.
অনিমেষ আর চুপ করে বসে থাকতে পারলো না| সে সোফা থেকে উঠে গিয়ে সজোরে লাথি মারলো শোবার ঘরের দরজায়| ঠাস করে একটা বিকট শব্দ হলো| ঘরের ভেতরের আলো দপ করে জ্বলে উঠলো| দরজা খুলে শ্রাবণী সামনে এসে দাঁড়াতেই অনিমেষের ভেতরের সমস্ত রাগ আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লো|
“কী রে মাগী! তোর এতো বড়ো সাহস? আমার ঘরে বসে আমারই ভাইয়ের সাথে তুই এই নোংরামি করছিস?” অনিমেষ চিৎকার করে উঠলো|
শ্রাবণী প্রথমে কিছুটা ভীত হয়ে পড়েছিলো, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অপরাধ ঢাকতে সে-ও চিৎকার করে উঠলো, “মুখ সামলে কথা বলো অনিমেষ! যা’ তা’ মুখে উচ্চারণ করবে না বলে দিচ্ছি!”
“মুখ সামলাবো আমি? ওরে হারামজাদী, চরিত্রহীন বেশ্যা! তোকে মুখ সামলাতে বলবো আমি? তুই তো একটা ডাস্টবিনের নোংরা! তোকে ঘরে এনে আমি ভুল করেছি| তুই আর ওই শুয়োরের বাচ্চা বিপ্লব মিলে আমার জীবনটা শেষ করে দিলি!” অনিমেষের মুখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিলো| সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না|
শ্রাবণী মুখ বাঁকিয়ে হাসলো| এক কুৎসিত অবজ্ঞার হাসি| সে বললো, “বিপ্লবের নাম মুখে নিবি না তুই! তুই তো একটা নপুংসক, কতোটা অপদার্থ তুই তা’ কি তুই নিজে জানিস? প্রতিমাসে শুধু টাকার অঙ্ক গোড়া ছাড়া তোর জীবনে আর কোনো কাজ আছে? একটা মেয়ের শরীরের কী চাহিদা, মনের কী চাহিদা, তা’ বোঝার মতো কোনো কাণ্ডজ্ঞান কি তোর এই গাধার মাথায় কোনোদিন ছিলো?”
“তোর মুখে আমি ঝাঁটা মারি, খানকি!” অনিমেষ শ্রাবণীর চুল ধরে টান দিয়ে ঘরের মাঝখানে আছাড় মারলো| শ্রাবণী মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠলো, কিন্তু তার চোখ দিয়ে তখনও অহঙ্কারের আগুন বেরোচ্ছিলো|
“মার! যতো পারিস মার!” মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শ্রাবণী চিৎকার করলো, “তোর মতো একটা বলদের সাথে সংসার করার চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো| তুই আমাকে কী দিয়েছিস রে? কেবল ওই চার দেয়ালের বন্দিজীবন! বিপ্লব আমাকে ভালোবাসা দিয়েছে, যা’ তুই কোনোদিন দিতে পারিসনি| ও যখন আমাকে ছুঁয়ে দেখে, তখন নিজেকে নারী মনে হয়| আর তোর সাথে থাকা মানে একটা লাশের পাশে শুয়ে থাকা!”
দুই.
এই ভয়ঙ্কর সত্যটা শোনার পর অনিমেষের মাথার ঠিক থাকলো না| সে দেয়ালে টাঙানো একটা কাঠের শোপিস তুলে নিয়ে শ্রাবণীর দিকে ছুঁড়ে মারলো| শ্রাবণী মাথা সরিয়ে নেয়ায় তা’ দেয়ালে লেগে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো|
“হারামজাদী, তুই আমার ঘরে খেয়ে, আমার দেয়া গয়না পরে, আরেকটা কুত্তার বাচ্চার সাথে বিছানা গরম করিস! তোদের দু’জনকে যদি আমি কুচকুচ করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে না দিয়েছি, তবে আমার নামও অনিমেষ নয়!” অনিমেষ পকেট থেকে ফোনটা বের করলো| তার হাত কাঁপছিলো| সে বিপ্লবকে ফোন করতে লাগলো|
ওপাশ থেকে ফোনটা ধরতেই অনিমেষ হুঙ্কার দিয়ে উঠলো, “ওরে শুয়োরের বাচ্চা, ওরে কুকুরের জাত! তুই আমার ভাই? তুই আমার ঘরে সিঁধ কেটেছিস? তুই আজ কোথায় আছিস বল, তোকে যদি আমি আজ না পিটিয়ে মেরেছি, তো আমার বাপের রক্তে কোনো তেজ নেই!”
ফোনের ওপাশ থেকে বিপ্লব প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরে অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো হেসে উঠলো| সে বললো, “আরে দাদা, এতো চিল্লাচ্ছো কেন? তোমার বউ যদি তোমার ঘরে সুখ না পায়, তবে সে তো অন্য কোথাও যাবেই| এতে আমার কী দোষ? শ্রাবণী তো তোমার কাছে শুধু অবহেলাই পেয়েছে| তুমি পুরুষ নামের কলঙ্ক, বুঝলে দাদা?”
“তুই আমাকে পুরুষত্ব শেখাবি রে মাগির ছেলে?” অনিমেষ ফোনের ওপরেই চিৎকার করে উঠলো, “কাল সকালের সূর্য তুই দেখতে পাবি কি না, তা’ তুই নিজেই দেখে নিবি| তোকে আমি ছাড়বো না!” সে ফোনটা আছাড় মেরে মেঝেতে ভেঙে ফেললো|
শ্রাবণী সোফায় গিয়ে বসলো| সে এখনো এতোটা শান্ত কীভাবে আছে, তা’ ভেবে অনিমেষ আরো অবাক হয়ে গেলো| শ্রাবণী একটা উপহাসের হাসি হেসে বললো, “কী রে, খুব তো লাফাচ্ছিস! কী করবি তুই? পুলিশে দিবি? দে না! পরকীয়া করা এখন আর কোনো আইনগত অপরাধ নয়, জানিস না? তুই আমাকে আটকে রাখতে পারবি না| আমি বিপ্লবকে ভালোবাসি, ওর সাথেই আমি যাবো|”
তিন.
অনিমেষ শ্রাবণীর দিকে এগোলো| তার চোখ দু’টি লাল হয়ে গিয়েছিলো| সে শ্রাবণীর গলার টিপে ধরলো| শ্রাবণীর দম আটকে আসছিলো, তার মুখ নীল হয়ে উঠছিলো, কিন্তু অনিমেষের হাত নড়লো না| সে যতোটা পারছিলো শক্তি দিয়ে চাপ দিচ্ছিলো|
“তোকে আজ আমি মেরেই ফেলবো| এই সমাজ, এই জগৎ যা’ ইচ্ছা বলুক, তোর মতো একটা ডাইনিকে বেঁচে রাখার কোনো অধিকার নেই!” অনিমেষ ফুঁসছিলো|
শ্রাবণী শেষ শক্তিতে অনিমেষের হাতে নখ দিয়ে আঁচড় কাটলো| অনিমেষ যন্ত্রণায় হাতটা একটু আলগা করতেই শ্রাবণী ছিটকে সরে গেলো এবং জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো| সে কাশতে কাশতে বললো, “তুই… তুই একটা খুনি! তোর এই অহঙ্কারের আমি শেষ দেখে ছাড়বো|”
“আমার অহঙ্কার? তুই আমার অহঙ্কারে আঘাত করেছিস!” অনিমেষ ঘরের আলমারিটা খুলে শ্রাবণীর সমস্ত কাপড়-চোপড় টেনে বের করতে লাগলো| “বের হ আমার বাড়ি থেকে! এই মুহূর্তে বের হ! তোকে রাখার মতো কোনো জায়গা এই পবিত্র ঘরে নেই| কাল রোববারে আমাদের ডিভোর্সের কাগজ তোর বাপের বাড়ি পৌঁছে যাবে| তোর ওই নোংরা বাপ-মাকেও জানাবো তারা কেমন এক বেশ্যা জন্ম দিয়েছে!”
“আমার মা-বাপের তুলে কথা বলবি না, কুত্তার বাচ্চা!” শ্রাবণী দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো, “আমার মা-বাপ কী করেছে? তুই নিজে একটা খাসি, একটা মেয়েকে সুখে রাখতে পারিস না, এখন দোষ দিচ্ছিস আমার মা-বাপের? তোর বংশের কোনো ঠিক আছে? তোর ওই মামাতো ভাই বিপ্লব যখন আমার শরীরে হাত দিতো, তখন তোর এই পুরুষত্ব কোথায় ছিলো? তখন তো তুই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলি!”
এই চরম অপমান অনিমেষ আর সহ্য করতে পারলো না| সে ড্রয়ার থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে আনলো| শ্রাবণী এবার কিছুটা সত্যি সত্যিই ভীত হয়ে পড়লো| সে পেছাতে পেছাতে খাটের কোণে গিয়ে ধাক্কা খেলো|
চার.
“কী রে, এখন ভয় পাচ্ছিস কেন? এতোক্ষণ তো খুব বড়ো বড়ো কথা বলছিলি!” অনিমেষ ছুরিটা নিয়ে শ্রাবণীর মুখের সামনে ধরলো| “এই মুখটা দিয়েই তো তুই বিপ্লবের প্রশংসা করছিলি, তাই না? এই ঠোঁট দু’টি দিয়েই তো তুই তাকে চুমু খাচ্ছিলি? আজ এই মুখটাই আমি শেষ করে দেবো|”
শ্রাবণী কাঁপতে কাঁপতে বললো, “অনিমেষ, তুমি পাগল হয়ে গেছো! তুমি যদি আমাকে কিছু করো, তবে তোমার জেল হবে| তোমার পুরো কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে|”
“কেরিয়ারের মুখে আমি লাথি মারি!” অনিমেষ গর্জে উঠলো| “যে কেরিয়ার দিয়ে আমি তোকে রাজরানি বানিয়ে রেখেছিলাম, আর তুই তার বদলে আমাকে এই উপহার দিলি? আমার জীবনের কিসের কেরিয়ার আর কিসের সম্মান? তুই আমার সব সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস| এলাকার মানুষ যখন জানবে অনিমেষের বউ তার ভাইয়ের সাথে পালিয়ে গেছে, তখন সমাজে আমার কী মুখ থাকবে?”
শ্রাবণী এবার একটু নরম সুরে কথা বলার চেষ্টা করলো, কিন্তু তার ভেতরের ধূর্ততা স্পষ্ট ছিলো| সে বললো, “অনিমেষ, আমাদের মধ্যে যা’ হওয়ার হয়ে গেছে| চলো আমরা দু’জন আলাদা হয়ে যাই| শান্তিতে ডিভোর্স দিয়ে দাও| কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করে লাভ কী?”
“শান্তিতে ডিভোর্স?” অনিমেষ ˆপশাচিক হেসে উঠলো| “তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি করবি, আর আমি তোকে শান্তিতে ছেড়ে দেবো? এতো সহজ নয়| তুই আর ওই বিপ্লব, তোদের দু’জনকে আমি নরক দেখাবো|”
ঠিক তখনই বাড়ির কলিংবেলটা বেজে উঠলো| এই গভীর রাতে কে আসতে পারে? অনিমেষ ছুরিটা হাতে নিয়েই দরজার দিকে এগোলো| শ্রাবণীও তার পেছনে পেছাতে পেছাতে আসলো| অনিমেষ দরজা খুলতেই দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিপ্লব| তবে সে একা নয়, তার সাথে রয়েছে দু’টি লোক| বিপ্লবের হাতে একটা লাঠি|
পাঁচ.
বিপ্লব ঘরে ঢুকেই বাঁকা হেসে বললো, “কী হে দাদা? ফোনে খুব গালিগালাজ করছিলে? এখন বলো কী করবে? শ্রাবণীকে তুমি মারধর করছো, তা’ আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম| তাই আমি চলে আসলাম|”
অনিমেষের রাগ এবার সাত আসমানে চড়ে গেলো| সে ছুরিটা উঁচিয়ে বিপ্লবের দিকে তেড়ে গেলো, “ওরে শুয়োরের বাচ্চা! তুই নিজে থেকেই যমদূতের মতো আমার সামনে এসেছিস! আজ তোকে আমি মেরেই ফেলবো|”
বিপ্লবের সাথে আসা দু’টি লোক দ্রুত অনিমেষকে ধরে ফেললো| অনিমেষ যতোই চেষ্টা করুক না কেন, দু’জনের শক্তির সাথে সে পেরে উঠছিলো না| তার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নেয়া হলো| বিপ্লব এগিয়ে এসে অনিমেষের পেটে সজোরে একটা লাথি মারলো| অনিমেষ মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে গেলো|
শ্রাবণী দৌড়ে গিয়ে বিপ্লবকে জড়িয়ে ধরলো| “বিপ্লব, ও আমাকে মেরেই ফেলতো! দেখো আমার গলায় ও কীভাবে দাগ করে দিয়েছে| এই পশুটো একটা আস্ত পাগল!”
বিপ্লব শ্রাবণীর চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে অনিমেষের দিকে তাকিয়ে থুতু ফেললো| “থুঃ! তোকে আমি দাদা বলে শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু তুই একটা আস্ত জঞ্জাল| নিজের বউকে সামলাতে পারিস না, আবার আমাদের মারতে আসিস? শোন অনিমেষ, শ্রাবণী এখন থেকে আমার সাথে থাকবে| তুই যদি কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করিস, তবে তোকে এই সমাজেই মুখ দেখানোর অযোগ্য করে দেবো| আমাদের দু’জনের কাছে তোর কতো নোংরা ভিডিও আছে তা’ তুই জানিস?”
“ভিডিও?” অনিমেষ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো|
“হ্যাঁ, ভিডিও!” শ্রাবণী উপহাসের সুরে বললো| “তুই যখন অফিসে থাকতিস, তখন আমরা এই ঘরেই সব করেছি| আর তোর কিছু গোপন দুর্বলতার কথা আমি বিপ্লবকে বলেছি, যা’ ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলে তুই আর কোনোদিন মানুষের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবি না|”
ছয়.
অনিমেষের মনে হলো তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে| সে কতোটা ভয়ঙ্কর এক সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা’ সে এখন বুঝতে পারছে| যে মেয়েটিকে সে সাত বছর ধরে ভালোবেসে এসেছে, সে এতোটা নিচে নামতে পারে? এতোটা বিষাক্ত হতে পারে কোনো নারী?
অনিমেষ মেঝেতে বসেই হাসতে লাগলো| এক অদ্ভুত, পাগলাটে হাসি| সে হাসতে হাসতে বললো, “তোরা ভেবেছিস এই সমস্ত নোংরামি করে তোরা পার পেয়ে যাবি? তোরা তো জগতের সবচেয়ে বড়ো কীট! তোদের মতো নরপশুদের কোনো ক্ষমা নেই| তোরা আজ যা’ করছিস, তার ফল তোদের এই জন্মেই পেতে হবে|”
বিপ্লব অনিমেষের মুখে আরেকটা লাথি মারার জন্য পা বাড়াতেই শ্রাবণী তাকে টেনে ধরলো| “থাক বিপ্লব, ওর সাথে আর কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না| চলো আমরা জিনিসপত্র নিয়ে এখনই বেরিয়ে যাই|”
শ্রাবণী দ্রুত ঘরের ভেতর গিয়ে তার কিছু গয়না আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ভরে নিলো| অনিমেষ শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলো| তার চোখের সামনে তার পুরো সংসারটা ভেঙে ছাই হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার কিছুই করার ছিলো না| তার নিজের মামাতো ভাই আর তার নিজের অর্ধাঙ্গিনী আজ সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে|
তারা যখন দরজার দিকে এগিয়ে গেলো, অনিমেষ সোজা হয়ে দাঁড়ালো| তার মুখ থেকে তখন সমস্ত গালিগালাজ শেষ হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু তার চোখে ছিলো এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসার আগুন| সে শান্ত গলায় বললো, “শ্রাবণী, তুই যা’ করলি, তা’ মনে রাখিস| আর বিপ্লব, তুই আমার ভাই হয়ে আমার পিঠে যে ছুরিটা মারলি, তার বদলা আমি নেবোই| তোরা যেখানেই যাস না কেন, আমার অভিশাপ তোদের পিছু ছাড়বে না|”
বিপ্লব দরজার কাছে গিয়ে একবার পেছন ফিরে তাকালো এবং এক কুৎসিত গালি দিয়ে বললো, “তোর অভিশাপের মুখে আমি লাথি মারি, শালা ভীরু! ক্ষমতা থাকলে কিছু করে দেখাস|”
তারা দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলো|
সাত.
ঘরটা এক নিমিষে ফাঁকা হয়ে গেলো| চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা কাচ, ছেঁড়া কাপড় আর অনিমেষের ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের টুকরোগুলো| অনিমেষ মেঝেতে বসে পড়লো| তার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো, কিন্তু তা’ দুঃখের জল ছিলো না, তা’ ছিলো এক ভয়ঙ্কর প্রতিশোধের আগুন|
সে জানতো, এই ঘটনার পর সে আর আগের অনিমেষ থাকবে না| সমাজ কী বলবে, জগত কী ভাববে—তাতে তার এখন আর কিছুই আসে যায় না| তার একমাত্র লক্ষ্য এখন একটাই—বিপ্লব আর শ্রাবণীকে তাদের এই ভয়ঙ্কর পাপের শাস্তি দেয়া|
সে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো| মেঝে থেকে তার ভাঙা ফোনটা তুলে নিলো| ফোনের স্ক্রিনটা ফেটে গিয়েছিলো, কিন্তু ভেতরের আলোটা তখনও জ্বলছিলো| অনিমেষ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, যতোদিন না সে ওই দু’জনকে রাস্তায় নামাতে পারছে, ততোদিন সে শান্তিতে ঘুমোবে না| এই পরকীয়া শুধু একটা সংসার ভাঙেনি, তা’ এক শান্ত মানুষকে এক ভয়ঙ্কর মানুষে পরিণত করেছে| সমাপ্ত

















