মনপুরায় গরুর লাম্পি স্কিনে দিশেহারা কৃষক

রাকিবুল হাসান, মনপুরা প্রতিনিধি :

গরুর ভাইরাসজনিত লাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাবে দিশেহারা ভোলার মনপুরা উপজেলার প্রান্তিক খামারিরা। সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকটি গরু ইতিমধ্যে মারা গেছে। ফলে গরুর খামারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

রোগটির সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই। এরই মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে গরু মারা যাওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।এই রোগে আক্রান্ত গরুর গায়ে গুটি বের হতে দেখা যায়। পরে গায়ে প্রচণ্ড ব্যথায় গরু অসুস্থ হয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা না থাকায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে রয়েছেন খামারি ও গরু পালনকারীরা।

অভিযোগ রয়েছে রোগটি ব্যাপক আকার ধারণ করলেও মাঠে দেখা যাচ্ছে না প্রাণিসম্পদ অফিসসহ সংশ্লিষ্টদের তেমন কোনো তৎপরতা। ফলে গ্রামের কিছু হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চলছে চিকিৎসা সেবা। এতে গরু সুস্থ না হয়ে উল্টো আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

মনপুরা উপজেলা গরু পালন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন গরু পালন করা হচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু পালন অনেকের সংসারে সচ্ছলতা এনেছে। পাশাপাশি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু নতুন এই রোগের কারণে শঙ্কিত গরু পালনকারীরা।

সরেজমিনে উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া,উত্তর সাকুচিয়া,হাজিরহাট,মনপুরাসহ,চারটি ইউনিয়ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গরুর শরীরে ভাইরাসজনিত লাম্পি স্কিন রোগ দেখা দিয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীর হঠাৎ গরম হয়ে যায়।

প্রথমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছোট আঁচিলের মতো ফুলে ওঠে। একপর্যায়ে চামড়া উঠে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ রোগে আক্রান্ত গরু খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। চিকিৎসা করেও তেমন প্রতিকার পাচ্ছেন না গরু পালনকারী ও খামারিরা। অনেক সময় মৃত্যু ঘটছে আক্রান্ত গরুর। এতে দুশ্চিন্তায় ও বিপাকে পড়েছে খামারিরা । বর্তমান সময়ে নিত্যপণ্যের ঊর্ধগতির পরিস্থিতিতে টাকা পয়সা হাতে না থাকায় আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে গরুর মালিকদের।

দক্ষিন সাকুচিয়া ইউনিয়নের মোঃআমির হোসেন বলেন, তার গরুর শরীরে হঠাৎ করে টিউমারের মতো গুটি গুটি কী যেন বের হয়েছে। এটা হওয়ার পর থেকেই গরু খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিয়ে শুধু ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পশু ডাক্তারকে দেখিয়েছেন, তারা ওষুধ দিয়েছেন। কিন্তু ভালো হয়নি। কিছুদিন পর গরুটি মারা যায়।

রহমানপুর গ্রামের খামারী পল্লি চিকিৎস সুশান্ত চন্দ্র দাস বলেন, তার খামারে ছয়টি গরু আছে । একটি গরু হঠাৎ লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে । তার খামারের গরুসহ এলাকার অনেক গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া এই গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে ভাইরাসটি হানা দিচ্ছে।

একই গ্রামে বাসিন্দা জসিম মুন্সি জানান, গত ৫দিন আগে তার ৪০ হাজার টাকা দামের একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

গরু পালনকারী হাজিরহাট ইউনিয়নের চরযতিন গ্রামের বসির আহম্মদ জানান, গাভী ও বাচ্ছা গরুগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এতে করে বাচ্চা গরু গুলো মারা যাচ্ছে । আর গাভী গরু গুলো আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় দুধ না পাওয়ায় বাছুর পালন করতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। অন্যদিকে গরুর শরীরে ব্যথা ও শরীরে ঘা’র স্থলে মশা-মাছি বসে অস্থির করে রাখছে।

মনপুরা থেকে বিছিন্ন চর কলাতলি সদ্য ঘোষিত ইউনিয়নের গরু পালনকারী মোঃ জসিম বলেন, এ রোগ হলে চিকিৎসা কী হবে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই। প্রাণীসম্পদ হাসপাতালেও কোনো চিকিৎসক এই চরে নাই । স্থানীয় পল্লি চিকিৎসক থেকে শুধু জ্বর ও ব্যথার ইনজেকশন এনে গরুকে দিচ্ছি। এতে আক্রান্ত গরুর ফোলা ও গুটি সারতে অনেক সময় লাগছে। অনেক টাকা খরচ হচ্ছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারা উপজেলায় প্রায় পাঁচশত গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক গরুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও সরকারী ভাবে গরু আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে তবে ২/৩ টি গরুর মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা। কিন্তু বাস্তবে অনেক বেশি গরুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিয়ত সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। এতে করে দিশেহারা হয়ে পরছেন এই উপজেলার খামারীরা ।

উপজেলার গরু মালিক রাদেশ চন্দ্র দাস জানান,তাদের খামারের একটি বড় ও একটি বাছুর গরুর পা ফুলে সারা গায়ে ফোসকা বের হয়েছে। বড় গরুটির অবস্থা খুবই খারাপ। শরীর পচে গর্ত হয়ে গেছে। দুই গরুর দশ হাজার টাকা খরচ করেও গরু সুস্থ হয়নি। উপজেলা (সরকারি ডাক্তার) প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা কে ফোন করলে সে দেশে আছে বলে যানান ।

দক্ষিণ সাকুচিয়া গ্রামের পশু চিকিৎসক দুলাল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রায় প্রতিদিনই ফোন আসে লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু জন্য। আমরা প্রতিটি গরুকে বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে ।উপসর্গের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে গরুর জ্বর হয়, এর পর গা গুটি গুটি হয়ে ফুলে যায়। ঘা হয়ে পেকে ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হয়। কাঁপুনিও থাকে। আর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দিতে চালাতে হয় । তবে সেরে উঠতে মাসখানেক সময় লাগছে।

উপজেলা ভেটেরিনারী সার্জন ও (ভারপ্রাপ্ত) প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা.আবু বক্কর সিদ্দিক মুঠোফোনে বলেন,লাম্পি স্কিন ভাইরাসজনিত এই রোগের কোনো টিকা বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তবে প্রানীসম্পদ হাসপাতালে যে ঔষধ আছে তা দিয়ে আমরা চিকিৎসা চালাচ্ছি । তবে এই রোগ প্রতিরোধে অসুস্থ গরুগুলোকে মশারির ভেতরে রাখা ও বাড়ির আশপাশ (গোয়াল ঘর) পরিষ্কার রাখতে বলা হচ্ছে।এ রোগের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতার জন্য লিফলেট বিতরণ ও উঠান বৈঠক করা হবে । এছাড়া রোগ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ প্রাণীসম্পদ দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। হাসপাতালে লোকবল কম থাকায় মাঠে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া সম্বভ না ।

You might like