

রাকিবুল হাসান, মনপুরা প্রতিনিধি :
ভোলার মনপুরা বিদ্যুতহীন জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্রাহকদের দাবি,ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউমন কোম্পানি (ওজোপাডিকোর) উপকেন্দ্রটি উপজেলা ১০ কিঃমিঃ সদরে ৮৫০ গ্রাহকদের দিনে ৮ ঘন্টা করে বিদ্যুৎ সরবাহ করে আসছে ।

সারাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিলে প্রতিষ্ঠানটি ৫ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবাহ করে আসছে । কিন্তু গত ২ মাসে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিলে, পরে লোডশেডিংয়ে দেড় ঘণ্টায়ও বিদ্যুৎ আসে না। এতে গরমে হাসপাতালে রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সেবা প্রদানে চিকিৎসকদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। মনপুরা উপজেলা বিদ্যুত না থাকায় অনেক সরকারি কর্মকর্তা এসে কর্মস্থলে থাকছেন না। তাদের অভিযোগ বিদ্যুৎ না থাকায় সরকারি কাজ ও সম্পূর্ন করতে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে উপজেলায় ৮৫০ জনের বেশি বিদ্যুৎ গ্রাহক। এরপর আবার বিদ্যুৎ এর তালবাহানা যেন মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুতের এমন আচরণে রাতের বেলা একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারছেন না গ্রাহকরা। শিক্ষার্থীরা রাতের বেলা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারছে না। উপজেলা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম বিপাকে রয়েছে গ্রাহকরা ।

সন্ধ্যায় মনপুরা হাসপাতালে গেলে মহিলা ওয়ার্ডের চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হাতাপাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায় স্বজনদের। গরম অসহ্য যন্ত্রণায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিদ্যুত না থাকায় কোন ধরণের পরীক্ষা নিরিক্ষা করাতে পারছে না হাসপাতালে আসা রোগীরা ।
বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা দিয়েছেন সাব-মেরিন ক্যাবলের এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন উপজেলা গুলোতে জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ সংযোগ করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু মনপুরা দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সোলার মিনি গ্রিড এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবাহ করছে এই উপজেলা। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন জাতীয় গ্রিড এর দাবিতে মানববন্ধন করে আসছে। এতে কোন সুফল পাছে না দ্বীপ উপজেলাবাসি।
বিদ্যুৎ সমস্যায় নিয়মিত কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটায় উপজেলার ব্যবসায়ী, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন। চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলার খামারী ও ব্যবসায়ীরা। এদিকে ১ মাস পরে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষা। বিদ্যুত না থাকায় অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা।
এছাড়াও সাধারণ শিক্ষার্থীরাও পড়ার টেবিলে বসতে পারছে না। বিদ্যুত না থাকার ফলে ভালোভাবে পড়ালেখা করতে না পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউমন কোম্পানি (ওজোপাডিকোর) সূত্র জানায়, তাদের অধীনে ১০ কিঃমিঃ এলাকায় প্রায় ৮৫০ জন গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহর জন্য রয়েছে ৫০০ কেভির দুইটি,৬৩০ কেভির একটি ও ১ মেগাওয়াটের একটি ইঞ্জিন রয়েছে । বিভিন্ন সময় এসব ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবারহ । ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন মেশিন টা দীর্ঘদিন বিকল হয়ে আছে। ৬৫০ কেভি মেশিন দিয়ে সারাদিন ১ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে । এছাড়াও ৫০০ কেভি ২ টি মেশিন রয়েছে সেগুলো নষ্ট হয়ে পরে আছে । এতে লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করেছে। তবে এই উপজেলার জন্য কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন ও কত মেগাওয়াট পাচ্ছেন তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওজোপাডিকোর আবাসিক প্রকৌশলী(বিদুত্) আবদুর সালাল ।
তথ্য অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে,নিয়মিত আবাসিক প্রকৌশলী(বিদ্যুৎ) অফিসার কর্মস্থল থাকেন না। ১৫ বছর ধরে কোন উচ্চমান সহকারী হিসাব রক্ষক এই উপজেলা নেই। কোন টেকনেশিয়ান নেই। ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে মনপুরা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এতে ভোগান্তির শিকার উপজেলার গ্রাহকরা ।
বিদুৎ না থাকায় মনপুরা উপজেলার ব্যবসায়ীরাও বিপাকে রয়েছেন বলে জানা গেছে। বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ২ মাস দিনে ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিচ্ছেন। তার মাঝে আবার লোডশেডিং থাকে। শুধু তাই নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, ব্যাংকিং সেবা, শিক্ষা ও গৃহস্থালির কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। সন্ধ্যার পর পরই উপজেলার প্রায় অধিকাংশ গ্রাম ও হাটবাজারে বিদ্যুৎ না থাকায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে। বিদুত্ না থাকায় ফ্রিজ, মোটর, কম্পিউটার, বাল্বসহ যান্ত্রিক ও ইলেকট্রিক সামগ্রী নষ্ট হচ্ছে।
মনপুরা নাগরিক কমিটি ব্যানারে দীর্র্ঘদিন জাতীয় গ্রিড এর বিদ্যুৎ এর দাবি করে আছে। গত কিছুদিন আগে উপজেলার বাজার ব্যবসায়ীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন ৮ ঘন্টা বিদ্যুৎ এর দাবীতে মানববন্ধন করেন । সেই থেকে এখন ইঞ্জিল বিকল বলে মাত্র ১ ঘন্টা বিদুত্ সরবারহ করছে দাবি করছেন নাগরিক কমিটির সভাপতি রিয়াদ মোল্লা ।
তিনি আরো বলেন, আমরা মনপুরার মানুষ স্মার্ট মনপুরা চাই। আমরা চাই মনপুরাকে জাতীয় গ্রীডের সাথে সংযুক্ত করা। এই উপজেলা জাতীয় গ্রিড এর সাথে সংযুক্ত হলে জীবন মান পরিবর্তন হয়ে যাবে। মনপুরা পাশে বিচ্ছিন্ন চর মুজাম্মেল যেখানে লোকের বসবাস খুই কম, সেই চরেও জাতীয় গ্রিড সংযুক্ত হয়েছে। মনপুরা একটি উপজেলা হলেও কোন অদৃশ্য শক্তি মনপুরাকে জাতীয় গ্রিড সংযুক্ত করছে না তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না ।
মনপুরা বিদ্যুৎ অফিসের এমন লুকোচুরি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা গ্রাহকরা।
বিদ্যুতের অভাবে রাতে চার্জ দিতে না পারায় উপজেলার অসংখ্য ইজিবাইক চালকও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ।এতে দেখা দিয়েছে যানবাহনের সমস্যা। আর যদি চার্জ এর ইজিবাইক পাওয়া যায় তাও চওয়া ভাড়া দিতে হয় ।
ইজিবাইক ড্রাইভার জীবন দাস জানান, হাজিরহাট থেকে সাকুচিয়া কিংবা রামনেওয়াজ গিয়ে গাড়ী চার্জ করতে হয় ।সেখানে ৩০ টাকা ইউনিয়ট ও ৭০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হচ্ছে ।
উপজেলা চরযতিন এলাকার বাসিন্দা জাহানারা জানান, দুই দিন ধরে একমাত্র শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করছি। শিশুদের নিয়ে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। রাতে ঠিকমতো ঘুমানো সম্ভব হয় না। শিশুদের সুস্থতার জন্য হাসপাতালে এনে এখন গরমে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
হাজিরহাট বাজারের স্টুডিও ব্যবসায়ী তানজিল জানান, সারা দিনে বিদ্যুৎ থাকেনা । প্রতিনিদি সন্ধ্যা ৫ টা দিলেও এখন আর সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে না । সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ না থাকাতে বাজারে মানুষই থাকে না। অন্ধকারে দোকানে ক্রেতারা প্রবেশ করে না। আইপিএসের ব্যাটারিতে ঠিকমতো চার্জ হয় না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা এর একটা সুষ্ঠু সমাধান চাই।
মনপুরার শাকিল আহম্মেদ বলেন, আর মাত্র কিছুদিন পর শুরু হবে আমাদের পরীক্ষা, দিনের বেলায় কলেজ ও কোচিং থাকি। রাতের বেলায় আমরা বাসায় পড়াশোনা করি । কিন্তু আজ কয়েক দিন সন্ধ্যা বিদ্যুত না থাকায় চরম হতাশা হয়ে পরছি। বিদ্যুত থাকায় ঘরের সোলার বিক্রয় করে দিয়েছে বাবা। কিন্তু বিদ্যুত না থাকায় রাতে বেলায় পড়তে খুব কষ্ট হয়। মোমবাতির আলোয় পড়তে গেলে চোখ ব্যথা করে। দ্রুত চোখে ঘুম চলে আসে। এছাড়া তো গরমের ক্লান্তিতো আছে।
হাজিরটাহ ইউনিয়নের বিদ্যুৎ গ্রাহক লিটন ফরাজি খোব প্রকাশ করে বলেন,যখন বিদ্যুৎ ছিলে না তখন ভালো ছিলাম । আধুনিক যুগে এসেও এখন হারিকেন এর আলোতে চলতে হয় । এটা আমাদের জন্য খুবই লজ্জার বিষয় ।
মনপুরা ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউমন কোম্পানি (ওজোপাডিকোর) আবাসিক প্রকৌশলী আবদুর সালাম বলেন, মনপুরা উপজেলা ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউমন কোম্পানি বছরে ৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে মনপুরা বাসিকে সার্ভিস দিয়ে আসছে । তাছাড়া মনপুরা ১ টি মেশিন ছাড়া সকল মেশিন নষ্ট হয়ে আছে । এখানে দক্ষ কোন টেকনেশিয়ান না থাকায় মেশিন গুলো মেরামত করানো যাচ্ছে না। খুলনা থেকে একটি টিম আসলে আমরা আশাকরছি কিছুদিনের মধ্যেই পূর্বের আট ঘন্টা বিদ্যুৎ সেবা দিতে পারবো ।










