মনপুরা অতিবৃষ্টির ফলে আমন চাষির কপালে চিন্তার ভাঁজ

রাকিবুল হাসান,মনপুরা প্রতিনিধি :

ভোলার মনপুরায় প্রবল বর্ষণ ও মেঘনার পানি বিপদসীমার ওপর প্রবাহিত হয়ে ৭ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে দশ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। এতে ওই সমস্ত গ্রামে বসবাসরত বাসিন্দাদের মধ্যে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি মেঘনা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।গত বুধবার থেকে বৃষ্টি হচ্ছে অবিরাম ভাবে । এতে করে আমন চাষিদের মাথায় হাত ।

গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। এ কারণে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে।সেই সাথে দেখা দিয়েছে চরম সংকট ।এইদিকে ৭ দিন নিম্মঞ্চাল প্লাবিত হওয়াই আমন চাষাবাদের ধানের চারা অতি বর্ষণে পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে করে আমন চারার চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ফলে মনপুরার অধিকাংশ কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছে। চারা সঙ্কটের কারণে এবার এ অঞ্চলে অনেক জমি অনাবাদি থাকবে বলে কৃষকরা আশংকা প্রকাশ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিতে মনপুরা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে উপজেলার ১০ হাজার মানুষ। ভেসে যায় পুকুর-ঘের। অবিরাম বৃষ্টিতে ফসলি জমি, বীজতলা, আমন ধান, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। পানি নিষ্কাশনের পর দৃশ্যমান হতে থাকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় আমনের বীজতলা । বীজতলা পচে ও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে দেখা দিয়েছে বীজ সংকট ।

এতে আমন চাষিদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে।এতে চাষিদের প্রায় ৬ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবী করেন । বিস্তীর্ণ এলাকার বিল ও মাঠ ঘাট বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে গেছে। এতে করে কৃষকের স্বপ্ন চলতি আমন মৌসুমের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। বীজ ধানও মিলছেনা । ধান রোপন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহীন রয়েছে কৃষকদের ।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ৪ ইউনিয়ন গঠিত। চলতি মৌসুমে এখানে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি। এ জন্য ৬০০ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছিল। সম্প্রতি অতিবৃষ্টিতে ৫০ শতাংশ বীজতলা ডুবে যায়। অনেক স্থানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০০ হেক্টর জমির বীজতলা পুরো নষ্ট হয়েছে।পানি নিষ্কাশ হতে যদি আরো ৩ থেকে ৪ দিন লেগে যায় তা হলে ক্ষতির পরিমান আরো বাড়বে ।

উপজেলার হাজিরহাট দক্ষিণ সাকুচিয়া ও উত্তর সাকুচিয়া অন্তত ১০ কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রাবণের মাঝামাঝি (আগস্টের প্রথম সপ্তাহ) থেকে ভাদ্রের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমনের চারা রোপণ করা হয়। বীজতলা করা হয় আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। এবারও চাষিরা সময়মতো বীজতলা তৈরি করেছিলেন। তবে গত বুধবার থেকে বুধবার পর্যন্ত টানা বর্ষণ হয়। এতে উপকূলীয় এই নিচু এলাকার সব বীজতলা ডুবে যায়। উপজেলার যেসব এলাকার পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, সেখান থেকে বৃষ্টি থামার দু–এক দিনের মধ্যে পানি নেমে গেছে। তবে সেসব বীজতলার চারার অবস্থাও ভালো নেই। আর এখনো অনেক এলাকার বীজতলা পুরোপুরি পানির নিচে।

বুধবার সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে ,উপজেলা দক্ষিন সাকুচিয়া রহমানপুর,মাষ্টার হাট, হাজিরহাট সহ এলাকায় পানি এখনো তলিয়ে আছে ।এতে করে হতাশা বিরাজ করছে কৃষকদের মাঝে ।

কৃষকদের অভিযোগ, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র ইজারা নিয়ে অধিকাংশ খাল দখলে রেখেছেন। ইজারাদার আর তাঁদের প্রতিনিধিরা খালে জাল ও বেড়া দিয়ে মাছ শিকার করেন। এতে পানিনিষ্কাশনসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।বিল ও খালের জমিতে বহু মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছে এবং চলাচলের জন্য ছোট ছোট রাস্তা নির্মাণ করায় পানি আটকে জলাবদ্ধতার চরম সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রয়োজনের সময় যেমন পানি সরছে না, তেমনি দিন দিন খালের নাব্যতা কমছে।

মনপুরার বেশিরভাগ জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইজ গেটগুলো অকেজো থাকায় ঠিকমতো পানি নিস্কাশন হচ্ছে না এতে করে যখন প্রয়োজন নেই তখন স্লুইজ দিয়ে নদী থেকে পানি উঠি যাচ্ছে। আবার প্রয়োজনের সময় পানি ঠিকমতো সরাছে না।

রহমাপুর গ্রামের কৃষক র্স্বন কুমার দাস বলেন, তাঁর বীজতলা পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আবার বীজতলা তৈরির জন্য বেশি দামে বীজধান সংগ্রহ করেছেন। এতে তাঁর ধান লাগানোর সময় অন্তত তিন – চার সপ্তাহ পিছিয়ে যাবে।

উপজেলার মাষ্টার হাট এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন,আমাদের একমাত্র ফসল এই আমন।টানা বৃষ্টিতে ধানের চারা ডুবে ছিল। তখন চারার গায়ে শেওলা জমেছে। বীজতলা থেকে পানি নেমেছে, তবে চারা নেতিয়ে রয়েছে। কিছু চারা একবারে নষ্ট হয়ে গেছে।এতে করে বীজতলা থেকে চারা নিয়ে জমিতে লাগানোর আর সুযোগ নাই ।

উপজেলা দক্ষিন সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাবেক সেনা কর্মকর্তা সোলেমান তালুকদার বলেন, টানা বৃষ্টি ও মেঘনা নদীর পানি বৃদ্ধি হওয়া দীর্ঘ ৭ দিন যাবত পানি বন্দী হয়ে আছে অনেকে ।তার বাড়ীর আশপাশের সব বাড়ী তলিয়ে গেছে ।এখন বাড়ীর উঠনে ও উঠছে পানি ।৭ দিন হলেও কোন মতেই বৃষ্টি কমছে না ।এইভাবে বৃষ্টির পানি হওয়া বিস্তীত আমন ধানের বীজ তলা নষ্ট হয়ে গেছে ।

তিনি খোব প্রকাশ করে বলেন,দক্ষিন সাকুচিয়া পানি নামার সে খাল গুলো আছে সেগুলোকে বন্ধ করে চাই জাল পাতা হয় ।এতে করে পানি নিষ্কাশন হতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে ।তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কে এই বিষয় গুলো একটু খেয়াল করা উচিত ।

মনপুরা উপজেলা সহকারী কৃষি অফিসার মোঃ আনোয়র হোসেন বলেন, এ বছর এই উপজেলা ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপনের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়।ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে বীজতলা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শাক সবজি ডুবে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির ধানের বীজ যাতে সংকট না পড়ে তার জন্য উর্ধতন কৃর্তপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষকেদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।

You might like