

সম্পাদকীয়:
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে, কোচিং বাণিজ্য ফুলে ফেঁপে উঠছে এবং এর মধ্যে বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এ তিনটি সমস্যা শুধু স্থানীয় নয়, বরং গ্রামীণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ মেয়েদের শিক্ষার ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে। উপজেলা প্রশাসন গত কয়েক মাসে কয়েকটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করলেও, এর মূল কারণগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। এখন সময় সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই সংকট মোকাবিলা করার।

স্কুল উপস্থিতির হ্রাসের পেছনে কোচিংয়ের প্রভাব স্পষ্ট। উপজেলায় ৪২টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে অনেক বিদ্যালয়ে ১৫-২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন অনুপস্থিত থাকে। শিক্ষার্থীরা ভোরবেলা ও সন্ধ্যায় কোচিংয়ে অংশ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং স্কুল ক্লাসকে গুরুত্ব দেয় না। কোচিংকে তারা ‘অবশ্যপাঠ্য’ মনে করে। স্থানীয় অভিযোগ, কিছু শিক্ষক স্কুলের বাইরে নিজস্ব বা ভাড়া কক্ষে কোচিং চালিয়ে শিক্ষা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। ফলে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৪৯.৬০%, ভোকেশনালে ৬৫.১০% এবং দাখিলে ৪৯.৫১%। এইচএসসিতে মাত্র ২৩.০২%, আলিমে ৫০.৬৩%। জীবগাঁও জেনারেল হক স্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসিতে ১৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ পাস করেনিÑপাসের হার শূন্য।
কিন্তু এ সঙ্কটের মধ্যে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সবচেয়ে ভয়াবহ। গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর প্রবণতা কমছে। ফাতেমা বেগম নামে এক মা বলেন, মেয়েকে স্কুলে পাঠালেও রাস্তা নিরাপদ কিনা ভয় হয়। খরচও বাড়ছে। তাই অনেকে আগেভাগে বিয়ের চিন্তা করে। এই মানসিকতা বাল্যবিবাহকে উস্কে দিচ্ছে। বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণির মেয়েরা ঝরে পড়ছে। এটি শুধু শিক্ষা নয়, মেয়েদের স্বাস্থ্য, অধিকার ও ভবিষ্যতকে ধ্বংস করছে। বাল্যবিবাহের ফলে মেয়েরা প্রসবের জটিলতায় ভুগে, শারীরিক-মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনও ৫১% এর কাছাকাছি, গ্রামে আরও বেশি। মতলব উত্তরের মতো এলাকায় এটি শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমিয়ে ফেলাফল বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বাল্যবিবাহের মূল কারণগুলো জটিল। প্রথমত, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অভাব। তারা মেয়েদের পড়াশোনাকে বিলাসিতা মনে করে। দ্বিতীয়ত, রাস্তার নিরাপত্তাহীনতা। স্কুল যাতায়াতে ঝুঁকি দেখে অনেকে মেয়েকে বাড়িতে বসিয়ে রাখে এবং তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ। দারিদ্র্েযর কারণে মেয়ের খরচ কমাতে বিয়ে একটি ‘সমাধান’ বলে মনে হয়। চতুর্থত, সামাজিক প্রথা। গ্রামে বাল্যবিবাহকে ‘সম্মান রক্ষা’ বলে দেখা হয়। এছাড়া মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ফেসবুক-টিকটক আসক্তি এবং মাদকাসক্তি শিক্ষার্থীদের উদাসীন করে বাল্যবিবাহকে সহজ করে দিচ্ছে। মতলব উত্তর প্রেসক্লাবের সভাপতি বোরহান উদ্দিন ডালিম বলেন, ইংরেজিতে দুর্বলতা, বিজ্ঞান-গণিতে খারাপ ফল এবং মোবাইল আসক্তি উপস্থিতি কমাচ্ছে। বাল্যবিবাহ শিক্ষার ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিশেষ করে মেয়েদের।
শিক্ষকরা বলছেন, অভিভাবকদের অনুরোধে কোচিং চাপে শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নাউরি আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম তাইজুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনার চাপ ছাড়াও স্কুলে সাংস্কৃতিক-ক্রীড়া কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কিন্তু বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতাই মূল চাবিকাঠি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, কোচিং নিয়ন্ত্রণে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে প্রশাসন, শিক্ষা অফিস, জনপ্রতিনিধি ও বিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করছে। নবম-দশম শ্রেণির মেয়েদের ঝরে পড়া রোধে সচেতনতা কার্যক্রম, অভিভাবক সমাবেশ এবং স্কুলভিত্তিক কর্নার খোলা হচ্ছে। সমাধানের পথ স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত। প্রথমত, বাল্যবিবাহ রোধে ইউনিয়নভিত্তিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ইতোমধ্যে এই কাজ শুরু হয়েছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে অভিভাবকদের শাস্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেয়েদের স্কুল যাতায়াত নিরাপদ করতে সম্প্রদায়ভিত্তিক গার্ড সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সাহায্য। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা মেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করে স্কলারশিপ দিক। চতুর্থত, সচেতনতা অভিযান। স্কুলে নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ করে বাল্যবিবাহের ক্ষতিÑস্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষাহানি, দারিদ্র্যচক্রÑবোঝাতে হবে। পঞ্চমত, স্কুলকে আকর্ষণীয় করতে ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাড়ানো এবং মোবাইল নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। ষষ্ঠত, শিক্ষকদের কোচিং নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। এসব পদক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রæত পরিবর্তন হবে।
বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়, এটি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে। মতলব উত্তরের এই চিত্র পুরো দেশের গ্রামীণ এলাকার প্রতিফলন। সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এখনই কর্মে উদ্যত হোন। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আরও কমবে, ফলাফল আরও খারাপ হবে এবং বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে নতুন প্রজন্ম বিপন্ন হবে। শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নই এই সংকটের প্রতিকার।
শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
.















