গরম বাড়ছে, বিদ্যুৎ কমছে: জ্বালানি সংকটে সারাদেশ অন্ধকারে, সামনে কতটা ভয়াবহ লোডশেডিং?

বৈশাখের মাঝামাঝি। খুলনার আকাশে রোদ আগুন ছড়াচ্ছে। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই। ফ্যান ঘুরছে না, এসি তো দূরের কথা। দিনে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। রাতে ঘুম ভাঙছে ঘামে ভিজে। খুলনা শহর থেকে বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া থেকে পাইকগাছা, একই চিত্র। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এবার সরাসরি আঘাত করেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদনে। প্রশ্ন একটাই, সামনে কী হবে?

খুলনায় বন্ধ ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র, উৎপাদন অর্ধেক

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের জ্বালানি সংকটে বড় ধাক্কা লেগেছে খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায়। বর্তমানে এই অঞ্চলের ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টিই বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।

কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির খুলনা ২২৫ মেগাওয়াট, মধুমতি ১০০ মেগাওয়াট এবং রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রসহ মোট ৬টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান বলেছেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের হাতে কোনো জ্বালানি নেই। জ্বালানি পেলে কেন্দ্রটি চালাতে প্রস্তুত আছি’।

লোডশেডিংয়ের ভয়াবহ চিত্র: ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অন্ধকার

গ্রীষ্ম মৌসুমে খুলনা অঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

শহরাঞ্চলে ২-৩ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে জনগণকে। ভ্যাপসা গরমে এই লোডশেডিংয়ে দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিল্পকারখানা, সেচ পাম্প ও গৃহস্থালির কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

চকবাজার, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রভাবে বাসাবাড়িতে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় অনেক এলাকায় মানুষকে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান বলেন, ‘সীমিত সরবরাহের মধ্যে চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে’।

সংকট শুধু খুলনায় নয়, সারাদেশেই ছায়া

খুলনার চিত্রটি বিচ্ছিন্ন নয়। সারাদেশেই জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাক্কা খেয়েছে। দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি বসে আছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট। আর সর্বোচ্চ চাহিদা থাকছে পিক আওয়ারে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। অথচ সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না জ্বালানি সংকটে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বর্তমানে গ্যাস, কয়লা ও তেল এই তিন জ্বালানির সংকটে ৬৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ১৬ এপ্রিল দুপুর ১টায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

চট্টগ্রামেও জ্বালানি সংকটে পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ২৫০ মেগাওয়াট। দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

সংকটের মূল কারণ: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আমদানি নির্ভরতা

চলমান সংকটকে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর দেশে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে শুধু স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার বা ওমান থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রয়েছে।

প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম জানায়, দেশের এলএনজি আমদানির ৬৮-৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। এই রুটে সরবরাহ ব্যাহত হলে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ে।

সামনে কী হতে যাচ্ছে?

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারকন্ডিশনার ও সেচের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চট্টগ্রামে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের প্রভাব ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলেই বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্নেস অয়েলের তুলনায় কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ও সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু করলে দীর্ঘমেয়াদে বড় সাশ্রয় সম্ভব।

সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি অফিসের সময় ৯টা থেকে ৪টা করা হয়েছে, দোকান-মার্কেট সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

খুলনার ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। চট্টগ্রামের ১০টি বন্ধ। সারাদেশে ৬৩টি কেন্দ্র আংশিক বা পুরো বন্ধ। বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, এলএনজি ও তেলের সরবরাহ নিশ্চিত না হলে, এই গরমে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা অনুমান করা কঠিন।

গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা যখন ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছুঁয়ে যাবে, তখন ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। তীব্র গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা, পানি না পাওয়া, শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট—এই বাস্তবতাই এখন খুলনাবাসীর নিত্যসঙ্গী। সামনে পুরো দেশেই এই চিত্র আরও প্রকট হতে পারে।

সামনে কী হতে যাচ্ছে, আল্লাহই ভালো জানেন। তবে প্রস্তুতি ও বিকল্প জ্বালানিতে না গেলে অন্ধকার আরও ঘন হবে, সেটা নিশ্চিত।

প্রকাশিত :  বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy