চাঁদপুরের সাহসী কণ্ঠ মোসাদ্দেক আল আকিবের সাংবাদিকতার যাত্রা ও লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চাঁদপুরের মেঠোপথ থেকে ঢাকার হাসপাতালের বিছানা—সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিবের পেশাগত জীবন যেন এক চলমান সংগ্রাম। স্থানীয় দুর্নীতি, অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কলম ধরতে গিয়ে তিনি হয়েছেন হামলার শিকার, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, আবার একইসঙ্গে পেয়েছেন সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। তার সাংবাদিকতার শুরু, ‘চাঁদপুর টাইমস’ প্রতিষ্ঠা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এই ফিচার।

শুরুটা: মফস্বল থেকে গণমাধ্যমের মঞ্চে

মোসাদ্দেক আল আকিবের সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু চাঁদপুরের স্থানীয় পর্যায় থেকেই। তিনি “চাঁদপুর টাইমস এর প্রতিষ্ঠাতা” সম্পাদক। যিনি তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি সাংবাদিক মিজানুর রহমান রানার সম্পাদনায় শুরু করেন। এক বছরের মধ্যে কাজী ইব্রাহিম জুয়েলকে প্রকাশক হিসেবে চাঁদপুর টাইমস এর একজন অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দান করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শহরের “কম বেশি সবাই ওনাকে চিনে” এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে “সাহসী সাংবাদিক” হিসেবে পরিচিত।

মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি হওয়া। আকিব সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রশাসন, পৌরসভার কাজ, ঠিকাদারি অনিয়ম—এসব বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই মূলত তার নাম আলোচনায় আসে। অনেকেই তাকে “ভালো ছেলে” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে তিনি “দীর্ঘদিন ধরে সমাজের জন্য কাজ করছেন”।

চাঁদপুর টাইমস’: স্থানীয় সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম

মোসাদ্দেক আল আকিবের সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘চাঁদপুর টাইমস’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। তিনি তার বন্ধু সাংবাদিক মিজানুর রহমান রানাকে নিয়েই এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। সাথে ছিলেন তৃতীয় জন দেলোয়ার হোসেন, যিনি বাগাদী চৌরাস্তায় একটি কম্পিউটার প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়ে আকিবের আহ্বানে চাঁদপুর টাইমস এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। এর কিছুদিন পরই কাজী ইব্রাহিম জুয়েলকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে। কিন্তু এই তিন মহারথী আকিব, রানা ও দেলোয়ার প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখেন। পরে কাজী ইব্রাহিম জুয়েল প্রায় ছয় মাস জেলে থেকে জামিনে বের হয়ে এলে ওই প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ ষড়যন্ত্রের কারণে মিজানুর রহমান রানা নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন চাঁদপুর রিপোর্ট অনলাইন নিউজ পোর্টাল।

জাতীয় গণমাধ্যমে যখন মফস্বলের খবর তেমন গুরুত্ব পায় না, তখন স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোই হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। চাঁদপুর টাইমসের মাধ্যমে আকিব চেষ্টা করেছেন স্থানীয় সমস্যা, দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগের খবর তুলে ধরতে।

তবে এই পথ মসৃণ ছিল না। স্থানীয় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে প্রায়ই ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বা ‘চাঁদাবাজি’র অভিযোগের মুখে পড়তে হয়। আকিবের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

২৮ এপ্রিল ২০২৬: যে দিনটি বদলে দিল সবকিছু

২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল জনপ্রিয় অনলাইন ‘‘বাংলা এডিশন’’ এর জন্য চাঁদপুর পৌরসভায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন মোসাদ্দেক আল আকিব।

ঘটনার বিবরণ:
– একাধিক সূত্র জানায়, চাঁদপুর পৌর প্রশাসকের বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তার মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয় এবং তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
-এ ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, “চাঁদপুর পৌরসভায় মারধরের শিকার সাংবাদিক আকিবকে মোবাইল ভেঙ্গে হাসপাতালে পাঠানো” হয়েছে। তাকে প্রথমে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
– সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে দাবি করা হয়, চাঁদপুর পৌরসভার প্রশাসক এরশাদ উদ্দিনের নির্দেশে এই হামলা হয়েছে।

এই ঘটনার পর সারাদেশে সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। “তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ” জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি ওঠে। অনেকেই একে “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত” হিসেবে দেখেছেন।

বিতর্ক ও পাল্টা অভিযোগ: ক্যানসেল কালচারের শিকার?

হামলার ঘটনার পাশাপাশি আকিবের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগও ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি ভাইরাল পোস্টে তার ছবির উপর সবুজ ‘X’ চিহ্ন বসিয়ে তাকে “চাঁদাবাজ সাংবাদিক” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। অভিযোগ করা হয়, তিনি “সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি” করতে গিয়েছিলেন। অথচ তিনি সংবাদের জন্য তথ্য সংগ্রহের আবেদন করেই সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে কতিপয় দালাল সাংবাদিক তাদের দুর্নীতি ঢাকতে গিয়ে সহকর্মীর গায়ে হাত তোলেন, তাকে নাজেহাল ও লাঞ্ছিত করেন।

তবে এই অভিযোগের বিপরীতে তার পক্ষেও অনেকে দাঁড়ান। মন্তব্যে বলা হয়, “আকিব ভালো ছেলে, সাহসী সাংবাদিক, শহরের কম বেশি সবাই ওনাকে চিনে। মিথ্যা প্রচার না করাই ভালো”।

এই ঘটনা বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে ‘ক্যানসেল কালচার’ এবং ‘মব জাস্টিস’-এর একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে তিনি হামলার শিকার ভিকটিম, অন্যদিকে তার পেশাগত পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এই দ্বিমুখী বাস্তবতাই মফস্বল সাংবাদিকতার বর্তমান সংকটকে তুলে ধরে।

কর্মপদ্ধতি ও সাংবাদিকতার ধরন

যারা আকিবকে সমর্থন করেন, তাদের মতে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গিয়েই ক্ষমতাবানদের রোষানলে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই তার উপর হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলোতে সাংবাদিকদের প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। স্থানীয় রাজনীতি, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত ঘটনা। আকিবের ঘটনা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

কিছু কিছু মানুষ এই সুযোগের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। যারা আওয়ামী লীগ আমলে সরকারের পা চেটে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছিলেন তারা সাংবাদিক আকিবের বিষয়টি নিয়ে একটি বিভক্তি তৈরি করে সাংবাদিকদের মধ্যে, যা প্রমাণ করে, ডিজিটাল যুগে একজন সাংবাদিকের ভাবমূর্তি কতটা ভঙ্গুর। একটি ঘটনাই তাকে একইসঙ্গে নায়ক ও খলনায়ক বানিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে মফস্বল সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ

মোসাদ্দেক আল আকিবের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান জাতীয় বিতর্কেরই অংশ।

মূল চ্যালেঞ্জগুলো:
1. শারীরিক নিরাপত্তা: সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলা, মামলা, হুমকি।
2. পেশাগত স্বীকৃতি: ‘নব্য সাংবাদিক’ বা ‘ভুয়া সাংবাদিক’ ট্যাগ দিয়ে হেনস্তা। অথচ আকিব ২০০৯ সাল থেকে দৈনিক চাঁদপুর দিগন্ত পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতার সূচনা করেছিলেন। তারপর দৈনিক ইলশেপাড়সহ বহু প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য ও জনকল্যাণমূলক কাজও করেছেন।
3. আর্থিক সংকট: স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর আর্থিক দুর্বলতা, ফলে ‘চাঁদাবাজি’র অভিযোগ ওঠার সুযোগ তৈরি হয়।
4. ডিজিটাল ট্রায়াল: ফেসবুকে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়াই কাউকে ‘ভিলেন’ বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।

কলম থামবে না :

২৮ এপ্রিলের ঘটনার পর মোসাদ্দেক আল আকিব এখন ঢাকায় চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও, এই ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য একটি অশনি সংকেত।

একদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতা বজায় রাখা। আকিবের পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্কই বলে দেয়, মানুষ এখনও সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতা চায়। কিন্তু একইসঙ্গে তারা ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের অপব্যবহারও মেনে নেবে না।

চাঁদপুরের এই তরুণ সাংবাদিকের লড়াই তাই শুধু ব্যক্তি আকিবের নয়। এটি মফস্বলের হাজারো কলম সৈনিকের লড়াই, যারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশের চেষ্টা করে। কলমের কালি হয়তো মুছে ফেলা যায়, ফোন ভেঙে ফেলা যায়, হাসপাতালে পাঠানো যায়—কিন্তু সত্য বলার স্পৃহাকে দমানো যায় না।

মোসাদ্দেক আল আকিবের সাংবাদিকতা আবারও প্রমাণ করল: “সাংবাদিকতা কোনো পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা।” আর সেই দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় ‘চাঁদপুর টাইমস’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম, আর তৈরি হয় আকিবদের মতো সাহসী কণ্ঠ।

প্রকাশিত : শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy