২০ লাখেই ভ্যাটের ফাঁদ: ছোট ব্যবসায়ী কি টিকবে নাকি চাপে ভেঙে পড়বে?

সম্পাদকীয়
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন সিদ্ধান্তে দেশের অর্থনীতির তৃণমূলে বড় ধরনের আলোড়ন উঠেছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট নিবন্ধনের বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৩০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ২০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সহজ হিসাবে, যে দোকানে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হয়, তাকেই এখন থেকে ভ্যাটের খাতায় নাম লেখাতে হবে। সরকারের যুক্তি স্পষ্ট: রাজস্ব বাড়াতে হবে, ব্যবসাকে মূলধারায় আনতে হবে, ডিজিটাল লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্তের ভার দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী কতটা বইতে পারবেন?

১. সিদ্ধান্তটা কী বলছে?
এনবিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, বছরে ২০ লাখ টাকার বেশি বিক্রি হলেই ব্যবসাকে বিআইএন নিতে হবে। শুধু তাই নয়, ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি-যানবাহন নিবন্ধন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ, এমনকি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। লক্ষ্য ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির জায়গা একটাই: মাসিকের বদলে তিন মাস পরপর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ এবং প্রায় দেড় দশক পর প্যাকেজ ভ্যাট ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।

২. সাড়ে ৫ হাজার টাকার হিসাবটা কতটা বাস্তব?
ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে উপজেলার বাজার—একটি চায়ের দোকান, ফ্লেক্সিলোডের দোকান, মুদি দোকান, কিংবা ফুটপাতের কাপড়ের দোকানে দৈনিক ৫-৬ হাজার টাকা বিক্রি হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু বিক্রি মানেই লাভ নয়। ৫৫০০ টাকা বিক্রিতে একজন মুদি দোকানির লাভ থাকে ৪০০-৬০০ টাকা। মাসে ১৫-১৮ হাজার টাকা লাভ থেকে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন মিটিয়ে তার হাতে থাকে কত? এই আয়ের ওপর যখন ভ্যাটের হিসাব রাখা, রিটার্ন জমা, উকিল-মুহুরির খরচ এবং ভ্যাট কর্মকর্তার হয়রানির আশঙ্কা যোগ হবে, তখন ‘প্রান্তিক ব্যবসা’ টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে।

৩. ছোট ব্যবসায়ীরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
ক. কমপ্লায়েন্সের খরচ বনাম লাভ: ভ্যাট নিবন্ধন নিলেই শেষ নয়। প্রতি তিন মাসে রিটার্ন দিতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী খাতা-কলমেও হিসাব রাখেন না, সফটওয়্যার তো দূরের কথা। ফলে তাদের একজন হিসাবরক্ষক বা ভ্যাট কনসালটেন্ট রাখতে হবে। মাসে ২-৩ হাজার টাকা খরচ মানে বছরে ৩০ হাজার টাকা। যে ব্যবসায়ীর মাসিক নিট লাভই ১৫ হাজার, তার জন্য এটা বিশাল বোঝা।

খ. হয়রানি ও ভীতি: এনবিআর বলছে হয়রানি কমাবে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। ভ্যাট অফিসে ফাইল চালানো, নোটিশের জবাব দেওয়া, অডিট ফেস করা—এগুলো একজন চা-দোকানির পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে ‘ঝামেলা এড়াতে’ অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে পারেন বা পুরোপুরি অনানুষ্ঠানিক হয়ে যাবেন।

গ. দ্রব্যমূল্যে প্রভাব: ছোট দোকানদার ভ্যাটের বাড়তি খরচ কোথায় তুলবেন? স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দামে। ফলে ৫ টাকার বিস্কুট ৬ টাকা হবে। দিনশেষে চাপ পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতার পকেটে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে যা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

ঘ. নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা: এখন হাজারো নারী ঘরে বসে অনলাইনে কেক, পোশাক, হস্তশিল্প বিক্রি করছেন। অনেক তরুণ ছোট পুঁজিতে স্টার্টআপ দিচ্ছেন। ২০ লাখ টাকা টার্নওভার তাদের জন্য বড় কিছু নয়, কিন্তু ভ্যাটের জটিলতায় তারা শুরুতেই হোঁচট খাবেন। ফলে কর্মসংস্থানের নতুন দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ঙ. প্যাকেজ ভ্যাট কি সমাধান? এনবিআর বলছে প্যাকেজ ভ্যাট ফিরবে। এটি নির্দিষ্ট এলাকা ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ফিক্সড হারে ভ্যাট। শুনতে ভালো লাগলেও অতীতে দেখা গেছে প্যাকেজ ভ্যাটের হারও ছোটদের জন্য বেশি হয়ে যায়। ২০১১ সালে প্যাকেজ ভ্যাট উঠে গিয়েছিল ঠিক এই কারণেই। নতুন করে চালু করলে হার কতটা যৌক্তিক হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন।

৪. সরকারের যুক্তি কতটা জোরালো?
সরকারের পয়েন্ট তিনটি: রাজস্ব বাড়ানো, ডিজিটালাইজেশন ও শৃঙ্খলা। বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮% এর নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ভ্যাট নিবন্ধন বাড়লে রাজস্ব বাড়বে, সন্দেহ নেই। আবার বিআইএন বাধ্যতামূলক করলে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন বাড়বে, অর্থনীতি ফরমাল হবে। ক্যাশলেস লেনদেনে জালিয়াতি কমবে। এসব যুক্তি অর্থনীতির খাতায় সঠিক।

কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে ‘কর আহরণ’ আর ‘কর ন্যায্যতা’ এক জিনিস নয়। যার মাসে ১৫ হাজার টাকা লাভ, আর যার মাসে ১৫ লাখ—দুজনের কমপ্লায়েন্স খরচ যদি সমান হয়, তবে সেটি ন্যায্য কর ব্যবস্থা নয়। উন্নত দেশে টার্নওভার সীমা অনেক বেশি। ভারতে জিএসটি নিবন্ধন সীমা ৪০ লাখ রুপি, পাকিস্তানে ১ কোটি রুপি। সেখানে বাংলাদেশ ২০ লাখ টাকা অর্থাৎ প্রায় ১৬,৫০০ ডলার সীমা নির্ধারণ করছে, যা অত্যন্ত কম।

৫. তাহলে পথ কী?
আমরা করজাল বাড়ানোর বিপক্ষে নই। কিন্তু সেটা করতে হবে ধাপে ধাপে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে প্রস্তুত করার সময় দিয়ে। প্রিয় সময় মনে করে:

ক. টার্নওভার সীমা পুনর্বিবেচনা: ২০ লাখ নয়, অন্তত ৫০ লাখ টাকা করা হোক। মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম বিবেচনায় ২০১৯ সালের ৩০ লাখ টাকার প্রকৃত মূল্য এখন ৫০ লাখের কাছাকাছি।

খ. প্রযুক্তি সহজলভ্য করা: এনবিআর যদি সত্যিই হয়রানি কমাতে চায়, তবে ফ্রি মোবাইল অ্যাপ দিক। যেখানে দৈনিক বিক্রি লিখলেই অটো রিটার্ন জেনারেট হবে। এসএমএস-এর মাধ্যমে রিটার্ন দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা যায়।

গ. প্রথম ২ বছর ‘শিক্ষানবিশকাল’: নতুন নিবন্ধিত ছোট ব্যবসায়ীর জন্য প্রথম ২৪ মাস কোনো জরিমানা নয়, শুধু সতর্কতা ও প্রশিক্ষণ। ভুল করলে শেখাবে, শাস্তি দেবে না।

ঘ. প্যাকেজ ভ্যাট যৌক্তিক করা: এলাকাভিত্তিক ও লাভের মার্জিন বিবেচনায় প্যাকেজ ভ্যাট নির্ধারণ করতে হবে। গ্রামের মুদি দোকান আর গুলশানের সুপারশপের রেট এক হতে পারে না।

ঙ. সচেতনতা ও প্রণোদনা: শুধু আইন করে নয়, বুঝিয়ে ভ্যাটে আনতে হবে। যারা স্বেচ্ছায় নিবন্ধন নেবে, তাদের জন্য ব্যাংক লোনে সুদহার ১% কম, ট্রেড লাইসেন্স ফি মওকুফ—এমন প্রণোদনা দেওয়া যায়।

শেষ কথা
রাজস্ব বাড়ানো দরকার, দেশ গড়তে টাকা লাগবে। কিন্তু সেই টাকা যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পেটে লাথি মেরে আদায় হয়, তবে অর্থনীতির ভিতই নড়বড়ে হয়ে যাবে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের ৯০% প্রতিষ্ঠান এসএমই। এরাই ৮০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান দেয়। এদের গলা চেপে ধরলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কাগজে-কলমে থাকবে, কিন্তু মানুষের পকেট ফাঁকা হবে।

এনবিআরকে মনে রাখতে হবে, কর আদায়ের চেয়ে বড় দায়িত্ব হলো করদাতাকে বাঁচিয়ে রাখা। দৈনিক সাড়ে ৫ হাজার টাকা বিক্রি করা দোকানদার চোর নয়, তিনি অর্থনীতির অক্সিজেন। তাকে ফাঁদে ফেললে শ্বাস নেবে কে?

তাই আমরা বলি, ভ্যাটের জাল বড় করুন, কিন্তু জালের ফাঁস যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর গলায় না আটকায়। সংস্কার হোক, তবে সেটা হোক মানবিক ও বাস্তবসম্মত। নইলে রাজস্বের অঙ্ক মিলবে, কিন্তু বাজারের প্রাণ মিলবে না।

প্রকাশিত : বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ খ্রি

You might like

About the Author: priyoshomoy