জুলকারনাইন কে ছিলেন? তার সম্পর্কে কোরআন হাদিস ও ইতিহাস কি বলে?

ইসলাম ডেস্ক :

জুলকারনাইন সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কোরআনে সুরা কাহফে (আয়াত ৮৩-৯৮) বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কোরআন-হাদিসে তার পরিচয়, নাম বা সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, বরং তার গুণাবলী ও ঘটনাগুলোকে শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

১. কোরআনে যা বলা হয়েছে
কোরআনে তাকে “যুলকারনাইন” অর্থাৎ “দুই শিংওয়ালা” বলা হয়েছে। দুই শিং বলতে দুই যুগের অধিকারী, দুই প্রান্তের শাসক, বা তার মুকুটে দুই শিং-এর মতো চিহ্ন ছিল — এমন বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।

কোরআন অনুযায়ী তার ৩টি বৈশিষ্ট্য ও ৩টি সফরের কথা বলা হয়েছে:

ক. বৈশিষ্ট্য:

ইন্না মাক্কান্না লাহু ফিল আরদ – “আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায় উপকরণ দিয়েছিলাম।” [১৮:৮৪]
তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, ঈমানদার ও আল্লাহর পথে শাসনকারী।
খ. তিনটি সফর:

১. পশ্চিম প্রান্তে সফর: তিনি পশ্চিম দিকে এমন এক স্থানে পৌঁছান যেখানে সূর্য কালো কাদাযুক্ত জলাশয়ে ডুবছে বলে মনে হচ্ছিল। সেখানে তিনি এক জাতিকে পান এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করেন।

২. পূর্ব প্রান্তে সফর: এরপর পূর্ব দিকে এমন এক জাতির কাছে যান যাদের সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার কোনো আড়াল ছিল না।

৩. দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সফর: সেখানে তিনি এমন এক জনগোষ্ঠীকে পান যারা প্রায় কোনো কথাই বুঝতে পারত না। তারা ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচারের অভিযোগ করে এবং তাকে একটি প্রাচীর নির্মাণের অনুরোধ করে। তিনি লোহা ও গলিত তামা দিয়ে এক মজবুত প্রাচীর তৈরি করে দেন। তিনি বলেন, “এটি আমার রবের অনুগ্রহ। যখন আমার রবের ওয়াদা আসবে (কিয়ামতের আগে), তিনি এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।”

২. হাদিসে যা বলা হয়েছে
হাদিসে যুলকারনাইন সম্পর্কে খুব বেশি বিস্তারিত নেই।

একটি হাদিসে রাসূল (সা.) কে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন সাহাবিরা যুলকারনাইন নবী ছিলেন কি বাদশাহ ছিলেন তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।
ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে, প্রতিদিন তারা প্রাচীর খুঁড়তে থাকে এবং “ইনশাআল্লাহ” না বলায় পরদিন তা আবার আগের মতো হয়ে যায়। কিয়ামতের আগে তারা “ইনশাআল্লাহ” বলবে এবং বের হতে সক্ষম হবে।
হাদিস থেকে এটা পরিষ্কার, ইসলামে তাকে নবী হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি, বরং আল্লাহর প্রিয়, ক্ষমতাশালী ও নেক বান্দা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

৩. ইতিহাস ও তাফসীরবিদগণ কি বলেন?
যুলকারনাইন কে ছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও মুফাসসিরদের মধ্যে ৩টি প্রধান মত আছে:

ক. আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট মত: ইমাম ইবনে কাসির, ইবনে জারির আত-তাবারি সহ অনেক প্রাচীন মুফাসসির তাকে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার মনে করেছেন। কারণ তিনি পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন।
আপত্তি: আলেকজান্ডার ছিলেন পৌত্তলিক ও অত্যাচারী, কিন্তু কোরআনের যুলকারনাইন ছিলেন একত্ববাদী ও ন্যায়পরায়ণ।

খ. সাইরাস দ্য গ্রেট মত (বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য): আধুনিক গবেষক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার “যুলকারনাইন” বইতে এবং অনেক সমসাময়িক গবেষক যুক্তি দিয়েছেন, তিনি ছিলেন পারস্যের সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ)। তার মুকুটে দুই শিং-এর মতো প্রতীক ছিল, তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, ইহুদিদের মুক্ত করেছিলেন এবং কোরআনে বর্ণিত প্রাচীরের সাথে ককেশাসের “দারিয়াল পাস” এর মিল আছে।

গ. দক্ষিণ আরবের হিমইয়ারি বাদশাহ মত: কেউ কেউ বলেন তিনি ইয়েমেনের কোনো বাদশাহ ছিলেন, যাদের উপাধি ছিল যুলকারনাইন।

সারসংক্ষেপ: কোরআনের উদ্দেশ্য যুলকারনাইনের ব্যক্তি পরিচয় নির্ধারণ নয়, বরং তার ঘটনা থেকে শিক্ষা দেওয়া — ক্ষমতা পেয়েও কীভাবে আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকতে হয়, ন্যায়বিচার করতে হয় এবং অহংকার না করতে হয়। এজন্য আল্লাহ তার নাম-পরিচয় গোপন রেখেছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

প্রকাশিত : রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬

.

You might like

About the Author: priyoshomoy