

ইসলাম ডেস্ক :
শত্রুর আক্রমণের ভয়ে মসজিদে না গিয়ে বাসায় যোহর পড়া জায়েজ হবে কি না — এ বিষয়ে কোরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।

১. জুমআর নামাজের গুরুত্ব
জুমআর নামাজ ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচা-কেনা ত্যাগ করো।” [সূরা আল-জুমআহ, ৬২:৯]
ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা ওজরে জুমআ ত্যাগ করা কবিরা গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অবহেলা করে পরপর তিনটি জুমআ ত্যাগ করে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন।” [আবু দাউদ: ১০৫২, তিরমিজি: ৫০০]
তবে শরিয়ত কিছু ওজরকে জুমআ মাফ হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য করেছে।
২. ভয় কি জুমআ ত্যাগের বৈধ ওজর?
হ্যাঁ। ফকীহগণের সর্বসম্মত মতে, প্রাণ, সম্পদ, পরিবার বা সম্মানের উপর প্রবল ভয়ের আশঙ্কা থাকলে জুমআ ও জামাত মাফ হয়ে যায়।
ক. কোরআনের দলিল:
“যদি তোমরা ভয়ে থাকো, তবে পদচারী অবস্থায় বা সওয়ার অবস্থায় (নামাজ পড়ে নাও)।” [সূরা আল-বাকারা, ২:২৩৯]
এই আয়াতটি সালাতুল খাওফ বা ভয়ের সময়ের নামাজ সম্পর্কে নাজিল হলেও, এর মূলনীতি হলো — ভয়ের সময় আল্লাহ বান্দার জন্য বিধান সহজ করে দিয়েছেন। ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, এই আয়াত প্রমাণ করে ভয় নামাজের স্বাভাবিক নিয়মে ছাড়ের কারণ।
খ. হাদিসের দলিল:
১. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আযান শুনলো এবং তার মসজিদে না যাওয়ার কোনো ওজর নেই, তার নামাজ (বাসায় পড়লে) কবুল হবে না।” সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, ওজর কি? তিনি বললেন, “ভয় অথবা অসুস্থতা।” [আবু দাউদ: ৫৫১, ইবনে মাজাহ: ৭৯৩ – হাদিসটি সহিহ]
এই হাদিস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ভয় একটি শরয়ী ওজর।
২. ইবনে আব্বাস (রা.) একবার প্রচন্ড বৃষ্টির দিনে মুয়াজ্জিনকে বললেন, “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” বলার পর “হাইয়া আলাস সালাহ” না বলে “সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম – তোমরা ঘরে নামাজ পড়ে নাও” বলো। লোকেরা আশ্চর্য হলে তিনি বললেন, “আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি (রাসূল ﷺ) এমনটি করেছেন।” [বুখারি: ৬১৬, মুসলিম: ৬৯৯]
বৃষ্টি, কাদা, ঠান্ডার মতো কষ্ট যদি জামাত ত্যাগের ওজর হয়, তবে শত্রুর আক্রমণে জীবনহানির ভয় তো আরও বড় ওজর।
৩. ফকীহগণের মতামত
চার মাযহাবের সকল ইমাম একমত যে, শত্রুর ভয় জুমআ ত্যাগের বৈধ ওজর।
ইমাম নববী (শাফেয়ী) (রহ.) বলেন: “শত্রু, বন্য প্রাণী, অত্যাচারী শাসকের ভয়, এমনকি ঋণদাতার ভয়ে গ্রেফতারের আশঙ্কা থাকলেও জুমআ মাফ।” [আল-মাজমু: ৪/৩৫২]
ইবনে কুদামা (হাম্বলী) (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি তার জান, মাল বা পরিবারের উপর আক্রমণের ভয় করে, তার জন্য জুমআ ত্যাগ করা জায়েজ।” [আল-মুগনি: ২/১০৪]
৪. কখন জায়েজ হবে? শর্ত
শুধু মনের কল্পিত ভয় নয়, ভয়টি বাস্তব ও প্রবল হতে হবে:
১. ভয়টি প্রবল ধারণার ভিত্তিতে হতে হবে: যেমন – নিশ্চিত খবর আছে যে শত্রু আজ মসজিদে হামলা করবে, বা এলাকায় কারফিউ, গোলাগুলি চলছে, মসজিদে গেলে প্রাণহানির সমূলে আশঙ্কা আছে।
২. অন্য নিরাপদ মসজিদ না থাকা: যদি কাছাকাছি অন্য কোনো নিরাপদ মসজিদে গিয়ে জুমআ পড়া সম্ভব হয়, তবে সেখানে গিয়েই পড়তে হবে।
৩. যদি সম্ভব হয় বাড়িতে জুমআর জামাত: কিছু আলেমের মতে, যদি কয়েকজন মিলে বাড়িতে নিরাপদে জুমআর জামাত করতে পারেন (হানাফি মতে শহরে এর শর্ত পূরণ কঠিন), তবে তা উত্তম। না পারলে যোহর পড়বেন।
৫. করণীয় কি?
যদি উপরোক্ত শর্তে শত্রুর আক্রমণের প্রবল ভয় থাকে, তাহলে:
আপনার জন্য মসজিদে না যাওয়া জায়েজ। আপনি বাসায় ৪ রাকাত যোহরের নামাজ পড়ে নেবেন। আপনার কোনো গুনাহ হবে না।
রাসূল ﷺ এর একটি মূলনীতি হলো:
“নিশ্চয় দ্বীন সহজ।” [বুখারি: ৩৯]
এবং আল্লাহ বলেন:
“আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।” [বাকারা: ১৮৫]
তবে মনে রাখবেন: যদি ভয়টা সাময়িক গুজব বা দুর্বল আশঙ্কা হয়, আর মসজিদে যাওয়া নিরাপদ মনে হয়, তাহলে অবশ্যই জুমআয় যাওয়াই ফরজ। নিজের ধারণা দিয়ে জুমআ ত্যাগ করা যাবে না।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রকাশিত : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬

















