চাঁদপুর থেকে বিশ্বের প্রযুক্তি নগরী: গ্রামের ছেলেমেয়েরাই হবে আগামীর কর্মসূচি নির্মাতা

মিজানুর রহমান রানা :

কথাগুলো কিন্তু মিথ্যে নয়, আশা জাগানিয়া। চাঁদপুর জেলার অনেক কৃতী সন্তানই দেশে বিদেশে ছড়িয়ে তথ্য প্রযুক্তিতে সফল হয়েছেন কিন্তু অনেকেই তা জানে না, তাই তারা নিজেরাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভবিষ্যতের সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারে না, বরং মুঠোফোন নিয়ে গেম খেলে সময়টা নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এই মুঠোফোন অভিশাপ না হয়ে আপনার জন্য আশির্বাদও হতে পারে। কিন্তু কীভাবে?

হাজীগঞ্জের একটি ছেলে সকালবেলা পাঠশালায় যায়, বিকেলে বাবার দোকানে বসে। তার হাতে একটি পুরনো মুঠোফোন। সে মুঠোফোনে খেলা খেলে না, সে চলচ্চিত্র দেখে শেখে কীভাবে একটি ব্যবহার-সামগ্রী বানানো হয়।এই ছেলেটিই আগামী পাঁচ বছরে মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয় করতে পারবে, রাজধানীতে না গিয়েও, বিদেশে না গিয়েও। শুধু দরকার সঠিক পথ জানা।

আজকের এই লেখাটি চাঁদপুরের সেই সব ছেলেমেয়ের জন্য, যারা ভাবছে আমাদের দিয়ে কি কর্মসূচি নির্মাতা হওয়া সম্ভব? উত্তর একশ ভাগ সম্ভব। কারণ আগামীর তথ্য-প্রযুক্তি আর রাজধানীর বড় দালানে আটকে নেই, এটা এখন আপনার মুঠোফোনেই।

১. আগামীর তথ্য-প্রযুক্তি আসলে কী?

২০৩০ সালের পৃথিবী কেমন হবে?আমরা এখন যে যুগে আছি, তাকে বলা হয় যন্ত্র-বুদ্ধির যুগ। আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবীর ষাট ভাগ কাজ বদলে যাবে। যারা প্রযুক্তি শিখবে, তারা কাজ দেবে। যারা শিখবে না, তারা কাজ হারাবে।

আগামীর পাঁচটি সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি:

১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা:

এখন যেমন আপনি যন্ত্র-সহকারীর কাছে লেখা লেখাচ্ছেন, আগামীতে যন্ত্র চিকিৎসা করবে, জমির হিসাব করবে, মামলার কাগজ লিখবে। যারা এই বুদ্ধি বানাতে পারবে, তাদের চাহিদা হবে সবচেয়ে বেশি। এই দেশে এখনই একজন কৃত্রিম বুদ্ধি নির্মাতার বেতন শুরু হয় এক লাখ টাকা থেকে।

২. জালপাতা ও মুঠোফোনের ব্যবহার-সামগ্রী: প্রতিটি দোকান, পাঠশালা, চিকিৎসালয়ের এখন ব্যবহার-সামগ্রী দরকার। চাঁদপুরের চিকিৎসা কেন্দ্রেরও একদিন ব্যবহার-সামগ্রী লাগবে, রোগীর ক্রমিক দেওয়ার জন্য। সেই ব্যবহার-সামগ্রী কে বানাবে? চাঁদপুরেরই কোনো ছেলে।

৩. জাল-নিরাপত্তা: যত বেশি মানুষ আন্তর্জালে আসবে, তত বেশি চোর আসবে। গত রচনায় আমরা নীরব দূরালাপ নিয়ে কথা বলেছি। এই প্রতারণা ঠেকাতে দরকার জাল-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।

৪. উপাত্ত বিজ্ঞান: সামাজিক মাধ্যম কীভাবে জানে আপনি কী পছন্দ করেন? উপাত্ত দিয়ে। যারা উপাত্ত বোঝে, তারা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়।

৫. দূর-কাজ ও স্বাধীন কাজ: এখন আর কার্যালয়ে যেতে হয় না। হাজীগঞ্জে বসে আপনি আমেরিকার প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে পারবেন। ডলারে বেতন পাবেন।

চাঁদপুরের ছেলেমেয়েদের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। রাজধানীতে গিয়ে ভাড়া ঘরে থাকার দরকার নেই। গ্রামে বসেই বিশ্বের সাথে কাজ করা যায়।

২. কর্মসূচি নির্মাতা হতে কী কী শিখতে হবে? সহজ পথ-নকশাঅনেকে ভাবে নির্মাতা হতে অঙ্কে একশ পেতে হবে, বিদেশি ভাষায় পাকা হতে হবে, গণকযন্ত্র বিজ্ঞানে পড়তে হবে। এগুলো ভুল ধারণা।আপনার দরকার মাত্র তিনটি জিনিস: একটি মুঠোফোন বা বহনযোগ্য গণকযন্ত্র, আন্তর্জাল, আর প্রতিদিন দুই ঘণ্টা সময়।

ধাপ ১: প্রথম এক মাস, ভিত্তি ঠিক করুনগণকযন্ত্র চালানো, লেখা-যন্ত্রে দ্রুত লেখা, আন্তর্জালে খোঁজ করা শিখুন। বিদেশি ভাষার ভিত্তি শিখুন। প্রতিদিন দশটি প্রযুক্তি শব্দ শিখুন। যেমন: জালপাতা, ব্যবহার-সামগ্রী, সংকেত, ত্রুটি।মাতৃভাষায় শেখান এমন শিক্ষকদের চলচ্চিত্র দেখুন। তারা একদম শূন্য থেকে শেখান।

ধাপ ২: মাস দুই থেকে চার, প্রথম সংকেত ভাষাএটা হলো জালপাতা বানানোর ভাষা। এটা শিখলে আপনি তিন মাসেই নিজের একটি জালপাতা বানাতে পারবেন। চাঁদপুরের কোনো দোকানের জালপাতা বানিয়ে পাঁচ হাজার টাকা আয়ও শুরু করতে পারবেন।প্রথমে জালপাতার কাঠামোর ভাষা শিখুন, তারপর রূপসজ্জার ভাষা শিখুন, তারপর জালপাতাকে জীবন্ত করার ভাষা শিখুন।

ধাপ ৩: মাস পাঁচ থেকে আট, একটি মূল ভাষা বেছে নিনদুটো পথ আছে:জালপাতা নির্মাতা হতে চাইলে আধুনিক জাল-কাঠামো শিখুন।

মুঠোফোনের ব্যবহার-সামগ্রী বানাতে চাইলে একবারে সব মুঠোফোনে চলে এমন কাঠামো শিখুন। একবার শিখলে সব ধরনের মুঠোফোনেই ব্যবহার-সামগ্রী বানানো যায়।

ধাপ ৪: মাস নয় থেকে বারো, নমুনা কাজ বানানশংসাপত্রের চেয়ে নমুনা কাজের দাম বেশি। তিনটি নমুনা কাজ বানান:১. হাজীগঞ্জ বাজারের দোকানগুলোর একটি জালপাতা

২. একটি নামাজের সময় ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ শেখার ব্যবহার-সামগ্রী
৩. একটি রোগীর ক্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থাএই তিনটি কাজ সংকেত-ভাণ্ডারে রাখুন। এটাই আপনার জীবনবৃত্তান্ত।৩. চাঁদপুরে বসে বিনা মূল্যে কোথা থেকে শিখবেন?টাকা নেই বলে থেমে থাকার দিন শেষ। পৃথিবীর সেরা পাঠগুলো এখন বিনা মূল্যে পাওয়া যায়।

১. চলচ্চিত্রের ভাণ্ডার: মাতৃভাষায় শেখান শিক্ষকদের পাঠ দেখুন। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে।

২. বিনা মূল্যের সংকেত বিদ্যালয়: আন্তর্জালে এমন বিদ্যালয় আছে যেখানে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে, শংসাপত্রসহ শেখানো হয়। মুঠোফোন দিয়েও করা যায়।

৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত পাঠ: বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।

৪. সরকারি সুযোগ: সরকারের সংখ্যাগত পরীক্ষাগার এখন চাঁদপুরের প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে আছে। সেখানে বিনা মূল্যে গণকযন্ত্র আছে। এছাড়া শেখা ও আয় প্রকল্পে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উপজেলা সংখ্যাগত কেন্দ্রে খোঁজ নিন।

৫. চাঁদপুরের দল: সামাজিক মাধ্যমে চাঁদপুরের নির্মাতাদের দলে যুক্ত হোন। সেখানে বড়রা বিনা মূল্যে সাহায্য করে।

মনে রাখবেন, রাজধানীর ছেলেরা যা শিখছে, আপনিও একই পাঠ দেখে শিখছেন। পার্থক্য শুধু ধৈর্যে।

৪. মেয়েরা কি পারবে? ধর্মীয় পাঠশালার ছাত্ররা কি পারবে?এই প্রশ্নটা চাঁদপুরে সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। উত্তর, মেয়েরাই এখন এগিয়ে। এই দেশের সেরা স্বাধীন কর্মীদের ত্রিশ ভাগ এখন মেয়ে। ঘরে বসে পর্দা মেনে, পরিবারের সম্মান রেখে মেয়েরা এখন মাসে এক লাখ টাকা আয় করছে। ধর্মীয় পাঠশালার ছাত্রদের জন্য আরও বড় সুযোগ। কারণ তাদের ধৈর্য বেশি, মুখস্থ শক্তি বেশি, আর তারা আরবি জানে। আরবি জানা একজন নির্মাতা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিষ্ঠানে সহজে কাজ পায়।

সৌদি আরব, আমিরাত এখন হাজার হাজার নির্মাতা নিচ্ছে। ধর্মে জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক। প্রযুক্তি শেখা শুধু দুনিয়ার জ্ঞান নয়, এটা এখন উপাসনার মতোই জরুরি। কারণ প্রযুক্তি দিয়ে আপনি ধর্মের সেবাও করতে পারবেন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ব্যবহার-সামগ্রী, হজের পথ-নির্দেশিকা, যাকাতের হিসাব-যন্ত্র বানিয়ে।

৫. টাকা আয় শুরু করবেন কীভাবে? বাস্তব পরিকল্পনাশেখা শেষ হলে আয়ের তিনটি পথ:

১. স্বাধীন কাজ: প্রথমে ছোট কাজ করুন। পাঁচ ডলারের কাজ দিয়ে শুরু করুন। ছয় মাসে সুনাম বাড়লে পাঁচশ ডলারের কাজ পাবেন। স্বাধীন কাজের বাজারে নিজের পরিচয় তৈরি করুন।

২. দূর-চাকরি: দেশের বড় প্রতিষ্ঠান এখন গ্রাম থেকে দূরে বসে কাজ করার লোক নিচ্ছে। বেতন চল্লিশ হাজার থেকে এক লাখ।

৩. নিজের পণ্য: চাঁদপুরের ব্যবসায়ীদের জন্য হিসাব-যন্ত্র বানিয়ে মাসিক ভাড়া নিন। যেমন: ঔষধের দোকানের হিসাবের ব্যবস্থা, মাসে এক হাজার টাকা করে বিশটি দোকান থেকে নিলেই মাসে বিশ হাজার টাকা।

শুরুটা আজই করুনআপনার বন্ধু ক্ষণিকের চলচ্চিত্রে সময় নষ্ট করছে, আপনি সংকেত শিখুন। তিন বছর পর পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল হবে। সে দেখার সংখ্যার জন্য ভিক্ষা করবে, আপনি কাজ দেবেন।আজ রাতেই মুঠোফোনে খুঁজে দেখুন মাতৃভাষায় জালপাতা বানানো শেখার প্রথম পাঠ। প্রথম চলচ্চিত্রটা দেখুন। ব্যাস, আপনার যাত্রা শুরু। চাঁদপুরের মাটি শুধু ইলিশ আর ধান দেবে না, আগামীতে কর্মসূচিও দেবে, যদি আপনি আজ থেকে শুরু করেন।

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy