আসুন শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই

সম্পাদকীয়

শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৪
শুধুমাত্র একটু সহানুভূতি ও হৃদয়কে জাগ্রত করতে পারলেই আমাদের মন কেঁদে উঠবে গরীব ও অসহায়দের জন্যে। কেননা বর্তমানে প্রচণ্ড শীতে তারা খুবই কষ্ট পাচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক নর-নারী ও শিশুরা। এমন অনেক পরিবার রয়েছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ বাজারে পেটের ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে; তার উপর শীতের পোশাক তারা কোনোভাবেই কিনতে পারছে না। আর এ সময়টাতে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। শীতকাল এলেই তারা শীতে জবুথবু হয়ে যায়।

আবার কারো কারো খাবারের চেয়েও তাদের শীত নিবারণ অতীব প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমরা অনেকে মনে করি, শীতকাল এসেছে ধনীদের জন্যে সুখ, আনন্দ ও উল্লাস নিয়ে; আর গরীবদের জন্যে দুঃখ, হতাশা ও অশান্তি নিয়ে এসেছে। একদিকে শীতকাল আসলে বিত্তবান শ্রেণির মানুষগুলো খুশিতে আনন্দিত হয়। অন্যদিকে শীতকাল আসলে গরিব, দুর্ভাগা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো দুঃখিত হয়। আমাদের সমাজে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যে শীতকাল হলো এক ধরনের অভিশাপ। তাছাড়া শীতে তাদের মাঝেমধ্যে না খেয়েও থাকতে হয়। কারণ খেতে হলে তো কাজ করতে হবে, কাজকর্ম ছাড়া কেউ তো তাদের আহার দেবে না। তাই শীতকালে না পারে তারা শান্তিতে ঘুমাতে, না পারে ভালোভাবে খেতে, না পারে তারা ঠিকমতো কাজ করতে। শীতে তাদের জীবনযাপন শুধু কষ্টকরই না, মৃত্যুর ঝুঁকিও বটে। শৈত্যপ্রবাহের রুক্ষতা থেকে রক্ষা পাওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থাপনাও তাদের নিজেদের থাকে না। ফলে অসহায় ও হতদরিদ্রদের কষ্ট কেবল বেড়েই যায়।

আমাদের এই বৈষম্যকবলিত সমাজে অবশ্য এক শ্রেণির মানুষ আবার শীতের জন্য বছর ধরে অপেক্ষা করে। বিশেষ করে শহরের নাগরিকরা শীতকালকে খুব ভালোবাসে। তাদের কাছে শীতকাল পরম কাক্সিক্ষত। অল্প কয়েক দিনের জন্য শীতকালটা আসে। আর এই কয়েকটা দিন রং-বেরঙের সোয়েটার-জ্যাকেট পরা, কম্বল-লেপের তলায় উষ্ণতা উপভোগ। এর বাইরে তো সারা বছর গরম আর ঘাম! এই শ্রেণির কাছে শীত মানেই বনভোজন, বিয়েশাদি, ভ্রমণ আর পিঠাপুলির উৎসব। শীত মানেই আনন্দ, ফুর্তি ও পার্টি। শীতের সন্ধ্যায় হাই-পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন, টেনিস ও ভলিবল খেলা। পোড়া-মাংসের সঙ্গে ‘উত্তাপ-সঞ্চারী’ পানীয়তে বুঁদ হয়ে থাকা!

বর্তমান শৈত্যপ্রবাহ আর ঠাণ্ডা দেশের উত্তরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের জনগণ অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেই সঙ্গে ডায়রিয়া, জ্বর, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ ঠাণ্ডাজনিত রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শীতের সময় করোনা ভাইরাসের আরেক দফা সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। এজন্য নানা প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। তবে শীতকালে দেশের কোথাও শীত বেশি কম হতেই পারে, এতে কারো হাত নেই, এটি প্রাকৃতিক। তবে এক্ষেত্রে শীতার্তদের জন্য আমাদের অনেক কিছুই করণীয় আছে। সরকারের পাশাপাশি আমরাও পারি শীতার্তদের জন্য আমাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে। শীতের সময় শহরাঞ্চলের মানুষের তুলনায় গ্রামের সাধারণ মানুষগুলো বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। তারা যেখানে দুবেলা দুমুঠো খাবার কিনতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে উঠে সেখানে শীতের বস্ত্র কেনা অসম্ভব। গ্রামের এসব মানুষের অনেকের পক্ষে আলাদাভাবে শীতের কাপড় কেনা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। প্রতি বছর শীতের সময় দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা এমনকি ব্যক্তিপর্যায়ে শীতার্ত মানুষের জন্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

আমরা মনে করি, সমাজে যারা বিত্তবান ব্যক্তি আছেন, তারা চাইলেই ছিন্নমূল মানুষের এ হাড়কাঁপানো শীতের সময় একটু সাহায্য করতে পারেন। আপনাদের একটু সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাজে বসবাসরত গরিব অসহায় মানুষগুলোর মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। যদি আমরা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি একটু মানবতা দেখাই এবং পাশে দাঁড়াই তাহলে আমরা তাদের অশান্তি একটু হলেও দূর করতে পারব, পাশাপাশি তাদের মুখে হাসি ফুটাতে সক্ষম হবো। এই কনকনে শীতে ফুটপাত, রেলস্টেশন ও বস্তিতে বসবাস করার মানুষগুলো শান্তিতে নেই। আমাদের সবার উচিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া। সরকারের পাশাপাশি আমরা সবাই এগিয়ে আসলে শীতার্তরা উপকৃত হবে।

গরীবদের জীবনে শুধু শীত, কেবলই শীতের প্রকোপ। শীতের কশাঘাতে তাদের জীবন জর্জর। তাদের জীবনে গরম কাপড় বা উত্তাপের প্রস্তাব নেই। শীতে ‘বেড়াতে যাওয়া’ নেই, শীতের পিঠা-পায়েস নেই, নেই কোনো পিকনিক! কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিসুটি মেরে কোনোমতে দাঁতে দাঁত চেপে তাদের বেঁচে থাকা! সামান্য কিছু উপার্জনের ধান্দায় অহর্নিশ ঘুরে বেড়ানো! কিন্তু সেটারও কোনো নিশ্চয়তা নেই!

আমি, আপনি, আমরা সবাই যদি সচেতন ও উদ্যোগী হই, তবেই সম্ভব শীতের এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা। মানুষের বিপদের সময় তার পাশে থেকে সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতা করাই মানুষের মূল ব্রত হওয়া উচিত। একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে যদি একটি প্রাণ বাঁচে, একজন মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে, একটি শিশু উষ্ণতা পায়, তাতেই হয়তো জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আসুন শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই।

You might like