তিস্তার তীরে অবিরাম দুর্ভোগ: স্থায়ী সমাধানের জন্য জোরালো পদক্ষেপ দরকার

সম্পাদকীয়

প্রিয় সময়ে ’সুন্দরগঞ্জে নদীগর্ভে বসতভিটা-ফসলী জমি: ভাঙ্গণ অব্যাহত’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জনগণের ভাঙ্গনের ফলেকষ্টের বিষয় আমরা জানতে পেরেছি। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙ্গণ একবার আবার মানবজীবনকে চ্যাপ্টা করে দিয়েছে। গত রবিবার থেকে শুরু হয়েছে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যা কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার, উত্তর লালচামার, ভোরের পাখি, সিঙ্গিজানীসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা, ফসলী জমি, রাস্তাঘাটÑসবকিছু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে পানির স্রোতে, গৃহপালিত পশু-পাখি হারিয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ভাঙ্গণের কবলে পড়েছে। এই দৃশ্য কেবল স্থানীয় জনপদের নয়, সমগ্র দেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিস্তা নদী, যা বাংলাদেশ-ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে পরিচিত, বছর বছর ধরে এমন বিপর্যয় ডেকে আনে। এটি ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম উপনদী হলেও, জলবণ্টনের অসমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এর প্রবাহ অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠেছে। সুন্দরগঞ্জের তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, কাপাসিয়া ইউনিয়নসহ পৌরসভা এবং অন্যান্য এলাকা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের চাপে রয়েছে। বছরে দুবারÑবর্ষায় এবং উজানেÑএই চরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী বন্যা ও ভাঙ্গণের শিকার হয়। এবারের ভাঙ্গণে কৃষকদের আমণ ক্ষেতসহ বিস্তীর্ণ ফসলী জমি নষ্ট হয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে এক বিশাল ক্ষতির কারণ। উপজেলা কৃষি অফিসার রাশিদুল কবিরের মতে, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়ন চলছে, কিন্তু কৃষকদের ক্ষতি পূরণের পথ এখনও অস্পষ্ট।

এই দুর্ভোগের মধ্যে স্থানীয়দের অভিযোগও কম নয়। ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলামের নিজের বাস্তভিটা নদীতে মিলিয়ে গেছে, যিনি অন্তত ৮০ পরিবারের ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেনÑযা এখন ৩০০-এরও বেশি হয়েছে। ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কোনোমতে, কিন্তু নতুন স্থানের অভাবে চরে বা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বৃষ্টি এবং উজানের পানিতে নিচু চরগুলো ডুবে যাচ্ছে, যা দৈনন্দিন জীবনকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলছে। ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা এখনও পৌঁছায়নি, যদিও দুর্গত পরিবারের তালিকা উপজেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজকুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে জরুরি সভা হয়েছে এবং সাময়িক ত্রাণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এগুলো কেবল অস্থায়ী প্রতিকার।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হকের কথায়, হরিপুরের মাওলানা ভাসানী সেতু থেকে বালাসীঘাট পর্যন্ত বৃহৎ প্রকল্পের জন্য উচ্চপর্যায়ে প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু জিওব্যাগ ফেলে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে প্রশ্ন ওঠেÑকেন বছর বছর একই দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে? তিস্তা জলবণ্টন চুক্তির অভাব, ভারত-চীনের ভ‚-রাজনৈতিক জটিলতা এবং দেশীয় পরিকল্পনার দীর্ঘসূত্রিতা এর মূলে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, চরাঞ্চলের পুনর্বাসন, কৃষি বীমা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোÑএসব ছাড়া এই চক্র ভাঙবে না।

সরকারের উচিত এখনই সক্রিয় হওয়া। দুর্যোগ ত্রাণের পাশাপাশি জলসম্পদ মন্ত্রক এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একীভ‚য়ে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের দাবি স্পষ্টÑনদীভাঙ্গণ প্রতিরোধকল্পে যথোপযোগী পদক্ষেপ এবং স্থায়ী সমাধান। এই দুর্ভোগীদের কথা শুনলে মনে হয়, তিস্তার তীরে বসে তারা কেবল পানির স্রোত দেখছেন না, বরং এক অসহায়ত্বের গভীরতম ক‚লে দাঁড়িয়ে আছেন। দেশের উন্নয়নের পথে এমন জনপদকে উপেক্ষা করা যায় না। সময় এসেছে, তিস্তাকে শুধু নদী হিসেবে নয়, জীবনরেখা হিসেবে রক্ষা করারÑযাতে ভাঙ্গণের ভয় না হয়ে যায় এক অবিরাম যন্ত্রণায়।

বুধবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like