

সম্পাদকীয়:
বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি বেড়েছে প্রতারণার কৌশলও। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে ডিসমিসল্যাব যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সচেতনতার সীমাবদ্ধতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারকেরা এখন এমন এক জাল বিস্তার করেছে, যার প্রতিটি স্তর প্রযুক্তি-নির্ভর, সুপরিকল্পিত এবং বহুমুখী।
বিজ্ঞাপন থেকে প্রতারণার শুরু
প্রতারণার সূচনা হয় ঝকঝকে, পেশাদার গ্রাফিক্সে সাজানো বিজ্ঞাপন দিয়ে। অল্প সময়ে শেয়ারবাজারে বড় মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়। এই বিজ্ঞাপনগুলোতে ব্যবহার করা হয় দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বদের ছবি ও পরিচয়, যেমন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বা ড. জাহিদ হোসেন।
এই বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে, যেখানে সাজানো প্রশংসা, তথাকথিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং যান্ত্রিক ভাষায় তৈরি বার্তাগুলো দিয়ে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা চলে।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ: প্রতারণার দ্বিতীয় স্তর
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে অন্তত ২০টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ শনাক্ত হয়েছে, যেখানে সদস্যসংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। এই গ্রুপগুলো পরিচালিত হচ্ছে দুটি বৈধ ব্রোকারেজ হাউজ—সিটি ব্রোকারেজ লিমিটেড (সিবিএল) এবং ব্র্যাক ইপিএল সিকিউরিটিজ—এর নাম ব্যবহার করে।
গ্রাহক সেজে গবেষকেরা এই গ্রুপে যোগ দিয়ে দেখেছেন, কীভাবে ভুয়া অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করিয়ে বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলা হয়। এই লেনদেন হয় সরাসরি প্রতারকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে, কোনো বৈধ ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নয়।
প্রযুক্তির ছদ্মবেশে প্রতারণা
এই প্রতারণার প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।
– ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম: নামসর্বস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে শত শত বিজ্ঞাপন চালানো হয়।
– হোয়াটসঅ্যাপ: এনক্রিপটেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করা হয়।
– এআই প্রযুক্তি: বিজ্ঞাপনের ভাষা, গ্রাফিক্স, এমনকি ছবিও এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত।
– গুগল প্লে স্টোর: ভুয়া ট্রেডিং অ্যাপ সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে।
– এমএফএস প্ল্যাটফর্ম: বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে প্রতারকেরা টাকা তুলছে।
এই প্রতারণায় ব্যবহৃত বার্তাগুলো যান্ত্রিক, ইংরেজি থেকে আক্ষরিক অনুবাদ, এবং প্রায়ই অটোমেশনের ইঙ্গিত বহন করে।
নৈতিক দায় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
প্রতারণায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর আইনি দায় থাকুক বা না থাকুক, নৈতিক দায় অস্বীকার করা যায় না।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন যথার্থই বলেছেন, “তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণা করা হচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীরা বিশ্বাস হারাবেন, যা ভবিষ্যৎ ব্যবসার প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।”
বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান জানিয়েছেন, তারা নিয়মিত তদারকি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই প্রতারণা ঠেকাতে কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
প্রতারণার বিস্তার ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
এই ধরনের স্কিম শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও দেখা গেছে। সামাজিক মাধ্যম, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম, ভুয়া ওয়েবসাইট—সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ংকর চক্র গড়ে উঠেছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব গ্রুপ পরিচালনায় দেশি-বিদেশি নাগরিক জড়িত। ২৯টি ফোন নম্বরের মধ্যে বেশিরভাগই বন্ধ, কেউ কল ধরেনি, এমনকি অনুসন্ধানকারীকে গ্রুপ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
প্রতিরোধের পথ কোথায়?
এই প্রতারণা ঠেকাতে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ:
– সচেতনতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষকে প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রতারণা সম্পর্কে জানাতে হবে।
– আইনগত পদক্ষেপ: সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
– প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি**: ফেসবুক, গুগল, হোয়াটসঅ্যাপ—সবকেই তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রতারণা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
– এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নজরদারি: বিকাশ, নগদসহ সব মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতারণা এখন আর শুধু রাস্তাঘাটে ঘটে না—এটা আমাদের মোবাইল স্ক্রিনে, সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি পরিচিত নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
এই প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, মানুষের বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির প্রতি আস্থাকে ধ্বংস করে দেয়।
তাই এখনই সময়—সতর্ক হওয়ার, সচেতন হওয়ার, এবং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার আগে প্রশ্ন করার।
প্রতারণার ছদ্মবেশে প্রযুক্তি যেন আর কোনো পরিবারকে নিঃস্ব না করে, কোনো মানুষকে বিভ্রান্ত না করে।
বুধবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৫











