

উপসম্পাদকীয়
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে ঘিরে যে ভয়াবহ ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সংবাদটি পড়ার পর যেন বুকের ভেতর কেমন এক ভারী নীরবতা জমে থাকে। একজন মা তার শিশুকন্যাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজছিলেন। দরজার সামনে পড়ে থাকা স্যান্ডেল দেখে তিনি বারবার কড়া নাড়ছিলেন। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতরে চলছিল এক নিষ্ঠুরতার শেষ অধ্যায়।

ভাবতেই শিউরে উঠতে হয়, একটি শিশু কতটা অসহায় হলে এমন নির্মমতার শিকার হতে পারে!
পুলিশের তথ্যমতে, বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ছোট্ট রামিসাকে। শুধু তাই নয়, আলামত গোপন করতে মরদেহ টুকরো করার চেষ্টার কথাও উঠে এসেছে। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই নৃশংস ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে ঘাতকের স্ত্রীর বিরুদ্ধেও।
এমন সংবাদ কেবল আতঙ্ক নয়, সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্রও সামনে নিয়ে আসে।
একজন মা যখন সন্তানের জন্য দরজায় কড়া নাড়েন, সেখানে থাকে মমতা, নিরাপত্তা আর ভালোবাসার ডাক। কিন্তু সেই দরজার ওপাশে যদি মৃত্যু অপেক্ষা করে, তাহলে সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?
আজ প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি? প্রযুক্তি, উন্নয়ন আর আধুনিকতার বড় বড় গল্পের মাঝেও যদি একটি শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের অর্থ কী?
বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, মানবিক মূল্যবোধের সংকট এবং বিকৃত মানসিকতার বিস্তার ভয়ংকরভাবে বেড়ে চলেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, সবাইকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
শুধু কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানবিক শিক্ষা, নৈতিকতা চর্চা এবং সচেতন সমাজ গড়ে তোলা। কারণ অপরাধ জন্ম নেয় তখনই, যখন মানুষের ভেতর থেকে বিবেক হারিয়ে যায়।
রামিসা আজ আর ফিরবে না। কিন্তু তার এই নির্মম মৃত্যু যেন আরেকটি শিশুর ভাগ্যে না জোটে, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা যেন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে না যাই; বরং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও সচেতন সমাজ গড়তে বাস্তব পদক্ষেপ নিই।
ছোট্ট রামিসার জন্য দোয়া। মানবতার কাছে আজও তার নীরব প্রশ্ন।
লেখক পরিচিতি: মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি, লেখক ও সাংবাদিক
কী ঘটেছিলো রামিসার সাথে?
পুলিশ জানায়, ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন সোহেল রানা। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। এর আগে ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের একটি বাসায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত রামিসা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হান্নান মোল্লার মেয়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোহেল রানা পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ছিলেন। কী কারণে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা আছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর লাশ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। পরে সিআইডি ও এসবি সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন।
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ খ্রি.











