

এইচএম জাকির
বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়—এটি বাঙালির সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মৎস বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিস-এর সেপ্টেম্বর ২০২০ সালের তথ্যমতে—বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের ৮৬ শতাংশই আসে বাংলাদেশ থেকে। এই রূপালি সম্পদ দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে, জেলে পরিবারের জীবিকার উৎস এবং উপক‚লীয় জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত আহরণ, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও দূষণের কারণে ইলিশের উৎপাদন এবং প্রজনন ক্ষেত্র ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। তাই টেকসই ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন শুধু একক প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়—বরং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার এক সমন্বিত কাঠামো।
ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ সরকার গত দুই দশকে ইলিশ সংরক্ষণের জন্য একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন—ইলিশ সংরক্ষণ আইন, জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচি, মা ইলিশ রক্ষা অভিযান, ইলিশ অভয়াশ্রম স্থাপন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও ভিজিএফ কার্যক্রম ইত্যাদি। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে ইলিশ উৎপাদন ২০০৮ সালের প্রায় ২.৯৮ লাখ মেট্রিক টন থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫.৪৫ লাখ মেট্রিক টনে। কিন্তু এখনো নদীর নাব্যতা হ্রাস, সীমান্তবর্তী জলাশয়ে অনিয়ন্ত্রিত আহরণ, এবং সমন্বিত গবেষণা ও তথ্য বিনিময়ের অভাব টেকসই ব্যবস্থাপনায় বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা
ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে একাধিক সরকারি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালালেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ—মৎস্য অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্য সরবরাহ করে, পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী নাব্যতা ও বাঁধ ব্যবস্থাপনা করে, পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এবং স্থানীয় প্রশাসন, কোস্টগার্ড, পুলিশ আইন প্রয়োগে ভূমিকা রাখে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা না থাকলে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণ কার্যকর হয় না। যেমন—নদীর বাঁধ বা সেতু নির্মাণের সময় যদি মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনায় না নেওয়া হয়, তাহলে প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই “একটি নদী, একাধিক প্রতিষ্ঠান—একটি পরিকল্পনা” নীতিতে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপই হতে পারে স্থায়ী সমাধান।
আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা
ইলিশ একটি অভিবাসী প্রজাতি। এটি বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের নদী-নদীতে গমনাগমন করে প্রজনন সম্পন্ন করে। ফলে ইলিশ সংরক্ষণে সীমান্তের ভেতরে যত প্রচেষ্টা নেওয়া হোক না কেন, প্রতিবেশী দেশের কার্যক্রমের সঙ্গে তা সমন্বিত না হলে পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।
১. বাংলাদেশ–ভারত সহযোগিতা :
গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা নদী ব্যবস্থা দুই দেশের অভিন্ন সম্পদ। ভারতের উজানে বাঁধ নির্মাণ বা জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা ও ইলিশ প্রজননে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই নিয়মিত যৌথ গবেষণা, তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত আহরণনীতি প্রণয়ন জরুরি।
২. বাংলাদেশ–মিয়ানমার সহযোগিতা :
বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ–পূর্ব অংশে মিয়ানমারের জলসীমায় ইলিশ আহরণ হয় ব্যাপকভাবে। এখানে সুনির্দিষ্ট আহরণ সীমা ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যৌথ চুক্তি দরকার।
৩. বঙ্গোপসাগর আঞ্চলিক মৎস্য ফোরাম :
বাংলাদেশ এ ফোরামের সদস্য দেশ হিসেবে সমুদ্রজীবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করতে পারে। আঞ্চলিক ডেটাবেস, স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রযুক্তি ও গবেষণায় সমন্বয়
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে। তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং নদীর প্রবাহের পরিবর্তনে ইলিশ নতুন প্রজনন অঞ্চল খুঁজে নিচ্ছে। তাই প্রয়োজন—ড্রোন ও স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে নদী ও মোহনার পর্যবেক্ষণ, ডিএনএ ও ট্যাগিং প্রযুক্তি দ্বারা ইলিশের অভিবাসনপথ নির্ধারণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর (বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট, মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ) মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সেতুবন্ধন। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে সাউথ এশিয়ান ইলিশ রিসার্চ নেটওয়ার্ক গঠন করলে তা পুরো অঞ্চলেই ইলিশ ব্যবস্থাপনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়
ইলিশ ব্যবস্থাপনায় নীতি প্রণয়ন থেকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রশাসনিক স্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় দরকার। জাতীয় পর্যায়ে: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে কার্যকরী কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে। আঞ্চলিক পর্যায়ে: উপক‚লীয় জেলা ও নদী অববাহিকা ভিত্তিক “কার্যকরী ইলিশ টাস্কফোর্স” গঠন জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে: মৎস ব্যবসায়ী সংগঠন, বোট বা নৌকা মালিক সমিতি, জাল ব্যবসায়ী সমিতি, জেলেদের সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলে পাড়া, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক সহযোগিতা
ইলিশ সংরক্ষণ কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি। স্থানীয় জনগণ, জেলে পরিবার, মৎস ব্যবসায়ী সংগঠন, বোট বা নৌকা মালিক সমিতি, জাল ব্যবসায়ী সমিতি, জেলেদের সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলে পাড়া, এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও প্রশাসনের মধ্যে সচেতনতা ও আস্থা গড়ে না তুললে কোনো আইনই টেকসই হবে না। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ইলিশ সংরক্ষণ বিষয়ে শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো, জেলেদের প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান কিংবা কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী গ্রহণ ও নিশ্চিত করা, নদী তীরবর্তী স¤প্রদায়ের অংশগ্রহণমূলক মিটিং ও ফোরাম আয়োজন করা—এসব পদক্ষেপ টেকসই ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, রূপালি ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক শক্তি। এই সম্পদকে রক্ষা করতে হলে “বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগ” নয়, বরং “সমন্বিত আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা” এখন সময়ের দাবি। নদী, জলবায়ু ও সাগরের আন্তঃনির্ভর সম্পর্ককে বিবেচনায় রেখে যদি বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার যৌথভাবে নীতি ও প্রযুক্তি বিনিময় করে, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই ইলিশ ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে। ইলিশ কেবল খাদ্য নয়—এটি আমাদের সংস্কৃতি, নদী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক জীবন্ত ঐতিহ্য। তাই এখনই সময়, সীমান্ত পেরিয়ে, প্রতিষ্ঠানের দেয়াল ভেঙে, সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলার।
এইচএম জাকির : লেখক ও সংগঠক
বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড















