কলম যখন রক্তাক্ত: দলীয় চাটুকারিতা বনাম সত্যের সাংবাদিকতা, আকিবের উপর হামলা ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ

ফিচার প্রতিবেদক :

‘আমাকে জ্ঞান দেয়ার আগে নিজেদের জ্ঞানকে শানিত করেন দয়া করে। আমার কাছে দল না দেশ বড়। আমার কাছে, সবার আগে বাংলাদেশ।’’—সাংবাদিক মো. ইসমাইল আলীর এই উচ্চারণ এখন শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বাংলাদেশের গোটা সাংবাদিক সমাজের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে।

একদিকে শেখ হাসিনা সরকারের সময় ‘‘লুঙ্গি সাংবাদিক’’ ট্যাগ, অন্যদিকে ইউনূস সরকারের উপদেষ্টার আনফ্রেন্ড আর প্রেস উইংয়ের চাপ, তারপর বিএনপির সমর্থকদের ‘‘গুপ্ত নাকি?’’ ফিসফাস—সব মিলিয়ে সাংবাদিকতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘‘দলীয় পা-চাটা’’।

এই প্রেক্ষাপটেই গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ চাঁদপুর পৌরসভায় তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নৃশংস হামলার শিকার হন তরুণ সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিব। তার রক্তাক্ত শরীর আর ভাঙা মোবাইল ফোন যেন জানিয়ে দিল—বাংলাদেশে সত্যের পক্ষে কলম ধরা মানে এখন জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।

দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই সাংবাদিক—মো. ইসমাইল আলী ও জুলকারনাইন সায়ের—এর বক্তব্য এবং আকিবের উপর হামলার ঘটনা একসূত্রে গেঁথে দিলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা হলো: দল-মত নির্বিশেষে ক্ষমতার ছায় থাকা একটি ‘প্রেস-নিয়ন্ত্রক’ গোষ্ঠীর উত্থান, যারা ভিন্নমতকে দমনে মরিয়া।

১. ইসমাইল আলীর জবানবন্দি: তিন সরকার, একই চাপের ফর্মুলা

জ্বালানি খাতের রিপোর্টার মো. ইসমাইল আলী লিখেছেন, হাসিনা আমলে নিউজ করলে ‘‘অবাঞ্ছিত কমেন্ট’’ আর ‘‘শতশত ব্লক’’ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ইউনূস সরকারের সময় বিদ্যুতের এক নিউজে ‘‘ক্ষেপে গিয়ে উপদেষ্টা নিজেই আমাকে আনফ্রেন্ড করে দেন’’। এমনকি প্রেস উইং থেকে তার কোম্পানির চেয়ারম্যানকে বলা হয় ‘‘ইউনূস সরকারের বিপক্ষে লেখালেখি বন্ধ করতে’’।

এখন বিএনপির বিপক্ষে নিউজ গেলেই ‘‘লোকজন জ্ঞান দিতে চলে আসে’’, কেউ ‘‘বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ক্লাস নিতে চায়’’, কেউ ‘‘গুপ্ত নাকি?’’ বলে ফিসফাস করে। অথচ ‘‘গত ১ দশকের বেশি সময় তারা অনেকেই কুয়ার ব্যাঙ হয়ে ছিল’’।

ইসমাইল আলীর বক্তব্যের মূল সুর: সরকার বদলায়, কিন্তু সাংবাদিকের উপর চাপের ভাষা বদলায় না। দলের পক্ষে লিখলে ‘‘ঠিক’’, বিপক্ষে গেলেই ‘‘লুঙ্গি সাংবাদিক’’।

২. জুলকারনাইন সায়েরের অভিযোগপত্র: প্রেস সচিব থেকে হুমকিদাতা

অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের আরও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, Dhakapost.com এর সাবেক সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকারকে ‘‘ইউনূসের প্রেস সচিব শফিক হুমকি দিয়ে তার সাংবাদিকতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলো’’। হুমকিতে আতঙ্কিত মহিউদ্দিন ‘‘সপরিবারে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে’’ বাধ্য হন।

একইভাবে ইউনূসের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ফয়েজ আহম্মদ ‘‘হুমকি দিয়েছিলো Md. Ismail Ali’কে’’, কারণ তিনি ইউনূস সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। পরে ‘‘শফিকের প্রেস টিম’’ ইসমাইল আলীর নিয়োগকর্তা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং তাকে ‘‘নিজের ফেসবুক পোস্ট মুছতে বাধ্য করা হয়’’।

সায়েরের অভিযোগ, শফিক, ফয়েজ, আজাদ—এই তিনজন ‘‘স্বল্প সময়ের একটা সরকারের কর্তা হয়ে নিজ সহকর্মীদের কণ্ঠ রোধ করার ধৃষ্টতা’’ দেখিয়েছেন এবং এখন আবার ‘‘সাংবাদিক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টায় মত্ত’’।

দুই সাংবাদিকের বক্তব্য একবিন্দুতে মিলেছে: ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা সাবেক সাংবাদিকরাই এখন সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় হুমকি।

৩. আকিবের রক্ত: তথ্য অধিকার আইনের গায়ে প্রথম কিল-ঘুষি

এই যখন প্রেক্ষাপট, তখন ২৮ এপ্রিল ২০২৬ চাঁদপুরে ঘটে গেল আরেকটি নির্মম অধ্যায়। ‘বাংলা এডিশন’ এর সাংবাদিক মোসাদ্দেক আল আকিব চাঁদপুর পৌরসভার ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার ড্রেন প্রকল্পের অনিয়মের তথ্য চাইতে যান। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী লিখিত আবেদনও জমা দেন।

জবাবে তিনি পেলেন ‘‘কিল-ঘুষি, ভাঙা মোবাইল, মাথায় আঘাত আর ডান হাতের ফ্র্যাকচার’’। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘‘চাঁদপুর পৌরসভায় মারধরের শিকার সাংবাদিক আকিবকে মোবাইল ভেঙ্গে হাসপাতালে পাঠানো’’ হয়েছে। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করে ৭২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

আকিব নিজেই বলেন, ‘‘মূলত আমাকে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিলো। সেখানে আমারই সহকর্মী যাদের সাথে আমি কাজ করি, তারাই প্রথমে আমার উপর হামলা করে’’। সামাজিক মাধ্যমে দাবি ওঠে, পৌর প্রশাসক এরশাদ উদ্দিনের নির্দেশেই এই হামলা।

এটি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ও তথ্য অধিকার আইনের উপর সরাসরি হামলা। অথচ তিন দিনেও পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পায়নি। ‘‘পৌর প্রশাসক ফোন ধরেন না, সচিব বলেন ‘প্রক্রিয়াগত দেরি’’’।

৪. প্যাটার্ন অব সাইলেন্সিং: আকিব একা নন

আকিবের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। তিনি ২০২৩ সালে নদী দখল নিয়ে রিপোর্ট করে প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন। চাঁদপুরেই গত এক বছরে সাংবাদিকের ওপর চারটি হামলা হয়েছে। প্রতিবারই ‘‘অভিযোগের তীর দুর্নীতি ও অনিয়মের রিপোর্টের দিকে’’।

ইসমাইল আলী-মহিউদ্দিন-আকিব—তিনটি ঘটনায় কমন থ্রেড তিনটি:
দালাল চক্র: হামলায় ‘‘কথিত দালাল সাংবাদিকসহ একটি গোষ্ঠী’’ জড়িত। আকিবকে ‘‘দালাল সাংবাদিকরা তাদের দুর্নীতি ঢাকতে গিয়ে’’ লাঞ্ছিত করেন।
প্রশাসনিক নীরবতা: তথ্য চাইলে ‘‘কর্মকর্তা বিরক্ত হন’’, ফুটেজ উদ্ধারে ‘‘ঢিলেমি’’।
ক্যানসেল কালচার: আকিবের বিরুদ্ধে ‘‘চাঁদাবাজ সাংবাদিক’’ ট্যাগ দিয়ে সবুজ ‘X’ চিহ্ন বসানো হয়। ঠিক যেমন ইসমাইল আলীকে ‘‘লুঙ্গি সাংবাদিক’’ বলা হয়েছিল।

৫. সাংবাদিক বনাম সাংবাদিক: সবচেয়ে বিপজ্জনক বিভাজন

জুলকারনাইন সায়েরের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরেকটি ভয়ংকর দিক: ক্ষমতার বলয়ে ঢুকে পড়া সাবেক সাংবাদিকরাই এখন স্বাধীন সাংবাদিকতার শত্রু। শফিক-ফয়েজ-আজাদরা প্রেস সচিব/ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি হয়ে ‘‘নিজ সহকর্মীদের কণ্ঠ রোধ’’ করেছেন।

আকিবের উপর হামলায়ও ‘‘আমারই সহকর্মী’’ যুক্ত ছিল। স্থানীয় সাংবাদিকতায় ‘‘হলুদ সাংবাদিকতা বা চাঁদাবাজি’র অভিযোগ’’ তুলে প্রকৃত সাংবাদিকদের দমন করা হচ্ছে।

ইসমাইল আলী লিখেছেন, ‘‘গত ১ দশকের বেশি সময় তারা অনেকেই কুয়ার ব্যাঙ হয়ে ছিল’’। অর্থাৎ যারা এতদিন চুপ ছিলেন, তারাই এখন দলীয় ছত্রছায়ায় ‘বিশেষজ্ঞ’ সেজে প্রকৃত রিপোর্টারদের টার্গেট করছেন।

৬. তিনটি প্রশ্ন: রাষ্ট্রের কাছে সাংবাদিক সমাজের

আকিবের উপর হামলার পর যে তিনটি প্রশ্ন উঠেছে, তা গোটা রাষ্ট্রের সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের প্রশ্ন:

দালালচক্রের উৎস কোথায়? প্রকল্পের ফাইল চাইলে কর্মকর্তা বিরক্ত হন কেন? ‘‘ফাইল জনগণের টাকার হিসাব। সেখানে গোপনীয়তা কীসের?’’
সিসিটিভি ফুটেজ তিন দিনেও উদ্ধার হয় না কেন? এই ‘‘ঢিলেমি প্রমাণ করে প্রভাবশালী মহলকে সময় দেওয়া হচ্ছে আলামত নষ্ট করার’’।
তথ্য অধিকার আইন কি শুধু কাগজে থাকবে? টিআইবি বলেছে—‘‘আইন আছে, প্রয়োগ নেই’’।

৭. শেষ কথা: দল না দেশ, কলম না চাটুকারিতা

ইসমাইল আলীর ঘোষণা—‘‘আমার কাছে দল না দেশ বড়’’—এখন সময়ের দাবি। জুলকারনাইন সায়েরের ‘‘শেইম অন ইউ’’ ধিক্কার শুধু শফিক-ফয়েজদের জন্য নয়, গোটা ব্যবস্থার জন্য।

আকিবের ভাঙা মোবাইল আর রক্তমাখা শার্ট প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন দুই ভাগে বিভক্ত: একদল ‘প্রেস উইং’ এর ফোন পেয়ে নিউজ মোছে, আরেকদল মাথায় আঘাত নিয়েও তথ্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।

‘‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত’’ ঠেকাতে হলে দরকার তিনটি জিনিস:

১) আকিবের হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি,

২) প্রেস উইং-প্রশাসন-দালাল সাংবাদিক নেক্সাস ভাঙা,

৩) তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

নইলে ইসমাইল আলীর আশঙ্কাই সত্যি হবে: সাংবাদিকতার মাপকাঠি হবে ‘‘দলীয় পা-চাটা’’। আর মোসাদ্দেক আল আকিবের মতো সাহসী কণ্ঠগুলো একে একে নিভে যাবে হাসপাতালের বেডে কিংবা দেশান্তরের প্লেনে।

সত্যের পক্ষে কলম ধরার দাম যদি রক্ত হয়, তবে সে রক্তের দাগ মুছবে না। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র সেই দাগ দেখবে, নাকি চোখ বন্ধ করে রাখবে?

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy