বাংলাদেশ রেলওয়ের দরজা ব্যবহারে শৃঙ্খলা: যাত্রীদের ঝামেলা এড়ানোর পথ

ক্ষুদীরাম দাস :

বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের জনপ্রিয় ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী এ রেলপথে যাতায়াত করে। কিন্তু ট্রেনে উঠা-নামার সময় যাত্রীদের মধ্যে যে অশৃঙ্খলা, ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি ও চিৎকার-চেঁচামেচি হয়, তা’ যাত্রীদের জন্যে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি বগিতে দু’টি দরজা থাকলেও উঠা ও নামার জন্যে যাত্রীরা একই দরজা ব্যবহার করে। ফলে দুই দিক থেকে যাত্রীপ্রবাহের সংঘর্ষ হয়, সময় নষ্ট হয়, ঝগড়া-মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনে ড়াবৎপৎড়ফিরহম-এর কারণে যাত্রীরা জানালা দিয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছেন, যা’ ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। ঈদের সময় কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনের দরজায় যাত্রীদের ভিড়ে পদদলিত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ সমস্যা শুধু যাত্রীদের জন্যে নয়, রেলওয়ের সময়সূচি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকেও ব্যাহত করে।

এ অশৃঙ্খলার মূল কারণ হলো দরজা ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের অভাব। যাত্রীরা যেকোনো দরজা দিয়ে উঠতে বা নামতে চায়, ফলে প্রবাহিত যাত্রীপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে, এতে ট্রেনের স্টপেজ সময় বেড়ে যায়, যা’ পরবর্তী স্টেশনগুলোতে ডিলে সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ঈদের সময় ট্রেনগুলোতে যাত্রীসংখ্যা ক্ষমতার দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং দরজায় ভিড়ের কারণে ৫-১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় লাগে। এছাড়া, সিট দখল নিয়ে ঝগড়া, লটবহর হারানো, এমনকি দরজায় আটকে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বিশেষ করে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে (যেমন সুবর্ণ এক্সপ্রেস, ত‚র্ণা-নিশীথা) এ সমস্যা তীব্র। গ্রামীণ রুটে মেইল ট্রেনগুলোতে তো পরিস্থিতি আরো করুণÑদরজায় ঝুলে যাওয়া যাত্রীদের ছবি প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এ ঝামেলা এড়ানোর একটি সহজ, ব্যয়সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায় হলো প্রতিটি বগির দুটি দরজাকে নির্দিষ্ট করে দেয়া: সামনের দরজা শুধু উঠার জন্যে (ঊহঃৎু) এবং পেছনের দরজা শুধু নামার জন্যে (ঊীরঃ)। দরজার ভিতরে ও বাইরে উভয় পাশে স্পষ্ট বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা থাকবেÑ‘উঠার দরজা’ এবং ‘নামার দরজা’। প্ল্যাটফর্মেও মাটিতে চিহ্নিত লাইন বা তীরচিহ্ন দিয়ে যাত্রীদের নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে। এতে যাত্রীপ্রবাহ একমুখী হবে, ঠেলাঠেলি কমবে এবং উঠা-নামার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

আন্তর্জাতিকভাবে এ সিস্টেম সফলভাবে কার্যকর। জাপানের শিনকানসেন ও সাবওয়ে সিস্টেমে যাত্রীরা দরজার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান, প্রথমে নামতে দেন, তারপর উঠেন। প্ল্যাটফর্মে মার্কিং থাকে কোথায় দাঁড়াতে হবে। ফলে দরজা খোলার সাথে সাথে প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং মিনিটের মধ্যে শেষ। সিঙ্গাপুরের গজঞ, লন্ডনের টিউব, দিল্লি মেট্রোÑসবখানেই এ নিয়ম কার্যকর। দিল্লি মেট্রোতে চিহ্ন ও অ্যানাউন্সমেন্টের মাধ্যমে যাত্রীরা সুশৃঙ্খল থাকেন। বাংলাদেশের মেট্রোরেল (ঢাকা গজঞ খরহব-৬) ইতিমধ্যে এ সিস্টেম চালু করেছেÑপ্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর (চঝউ) ও নির্দিষ্ট দরজা ব্যবহারের নিয়মে যাত্রীপ্রবাহ অত্যন্ত দ্রæত ও নিরাপদ।

বাংলাদেশ রেলওয়েও এ মডেল গ্রহণ করা সম্ভব। প্রথম ধাপে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে (যেমন পারাবত, সিল্কসিটি, উপক‚ল এক্সপ্রেস) পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি দরজায় রঙিন স্টিকার, আলোকিত সাইনবোর্ড বা ডিজিটাল ডিসপ্লে লাগানো যাবে। স্টেশনে মাইকিং, পোস্টার, ভিডিও অ্যানাউন্সমেন্টের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করা যাবে। প্রাথমিকভাবে রেলওয়ে পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবকরা নিয়ম পালনে সহায়তা করতে পারেন। একবার যাত্রীরা অভ্যস্ত হলে, কোনো তদারকি ছাড়াই নিয়ম চলবেÑযেমনটা মেট্রোরেলে দেখা যাচ্ছে।

এ ব্যবস্থার সুবিধা অপরিসীম। প্রথমত, সময় সাশ্রয়: বর্তমানে একটি স্টেশনে ৫-৭ মিনিট লাগে উঠা-নামায়; নিয়ম চালু হলে ২-৩ মিনিটে সম্ভব। এতে ট্রেনের পাংচুয়ালিটি বাড়বে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা: ঠেলাঠেলি কমলে দরজায় আটকে যাওয়া, পড়ে যাওয়া বা পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তৃতীয়ত, আরাম: যাত্রীরা সুশৃঙ্খলভাবে যাত্রা করলে মানসিক চাপ কমবে, ঝগড়া বন্ধ হবে। চতুর্থত, অর্থনৈতিক লাভ: ট্রেনের দ্রæত চলাচল মানে বেশি ট্রিপ, বেশি আয়, কম জ্বালানি খরচ।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। অনেক যাত্রী অশিক্ষিত বা গ্রাম থেকে আসাÑতাদের বোঝানো কঠিন হতে পারে। এজন্যে স্থানীয় ভাষায় সরল বার্তা, ছবিসহ পোস্টার, স্কুল-কলেজে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো দরকার। প্রযুক্তিগতভাবে, পুরোনো কোচে দরজা সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে; কিন্তু এটি বড় বিনিয়োগ নয়। নতুন কোচ কেনার সময় এ ডিজাইন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

এছাড়া, প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা ও দরজার অবস্থানের মিল থাকতে হবে। অনেক স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম নিচু, যা’ উঠা-নামায় বাধা। এটি সমাধানের জন্যে ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন করা যেতে পারে। মেট্রোরেলের মতো অটোমেটিক দরজা বন্ধ হওয়ার সিস্টেম (ধহঃর-ফৎধম) যোগ করলে নিরাপত্তা আরো বাড়বে।

কাজেই বাংলাদেশ রেলওয়ের এ ছোট পরিবর্তনটি যাত্রীদের জীবনে বড় প্রভাব ফেলবে। দরজা ব্যবহারের নিয়ম চালু করা কোনো জটিল প্রযুক্তি নয়, শুধু ইচ্ছা ও পরিকল্পনার ব্যাপার। রেলমন্ত্রী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে পাইলট প্রকল্প শুরু করতে হবেÑপ্রথমে কমলাপুর, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো বড় স্টেশনগুলোতে। যাত্রীরা অভ্যস্ত হলে, বাংলাদেশ রেলওয়ে হবে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও আধুনিক। এটি হবে যাত্রীকেন্দ্রিক রেলসেবার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সোমবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড

You might like