গল্প: একাকীত্বের বন্ধন

ক্ষুদীরাম দাস:

জন মলের জীবনটা ছিলো গ্রামের ধূসর পথের মতোধুলোয় ভরা, তবু তার মধ্যে একটা গন্তব্যের আভাস ছিলো। গ্রামের একপ্রান্তে তার ছোট্ট কাঠের বাড়ি, পাশে একটা আমেন গাছ, আর সামনে একটা ক্রুশের মূর্তি। এ বাড়িতে সে থাকতো তার স্ত্রী মেরির সঙ্গে। কিন্তু তাদের সম্পর্ক ছিলো যেন একটা ফাটল ধরা কাচের পাত্রবাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে ভাঙা।

জন ছিলো গ্রামের একমাত্র খ্রীষ্টান পরিবারের সন্তান। বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন যখন সে ছোট। আত্মীয় বলতে কেউ ছিলো না। গ্রামের চার্চের ফাদার জোসেফের কাছে মানুষ হয়েছিলো জন। দিনমজুরের কাজ করে, গীর্জায় প্রার্থনা করে, সে স্বপ্ন দেখতো একটা সংসারেরযেখানে সে একা থাকবে না। মেরির সঙ্গে বিয়েটা তাই তার কাছে ছিলো ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই জন বুঝতে পারলো, মেরির হৃদয় তার কাছে নেই।

মেরি এসেছিলো গ্রামের এক ধনী খ্রীষ্টান পরিবার থেকে। তার বাবা-মা এ বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন। তারা মনে করতেন, জনের মতো একজন গরিব, আত্মীয়হীন ছেলে মেরির জন্যে উপযুক্ত নয়। মেরির ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনও জনকে কখনো গ্রহণ করেনি। মেরিও যেন তাদের কথার প্রতিধ্বনি ছিলো। সে জনের প্রতি অবহেলা করতো, তার কথা শুনতো না, তার জন্যে কোনো মায়া-মমতা দেখাতো না। তবু সে জনকে ছেড়ে যায়নি। কারণ, তার নিজের পরিবারও তাকে ত্যাগ করেছিলো বিয়ের পর। তার ভাই-বোনেরা খোঁজ নিতো না, তার বাবা-মা তাকে আর ডাকেনি। মেরি যেন জনের সঙ্গে বাধ্য হয়ে থেকে গিয়েছিলো, কিন্তু মন দিয়ে নয়।

প্রতি রোববার গীর্জায় গিয়ে জন প্রার্থনা করতো। সে মেরির জন্যে প্রার্থনা করতো, তাদের সম্পর্কের জন্যে প্রার্থনা করতো। মেরি গীর্জায় যেতো, কিন্তু তার মন থাকতো অন্য কোথাও। সে প্রায়ই তার আত্মীয়দের বাড়ি চলে যেতো, কখনো গ্রামের বাইরে তার খালার কাছে। জন জিজ্ঞেস করলে, মেরি বলতো, “তুমি কী বুঝবে? তুমি তো কিছুই জানো না।” জন চুপ করে থাকতো। তার মনে হতো, সে যেন মেরির জীবনে একটা ছায়ামাত্র।

এক বছর গ্রামে ভয়াবহ বন্যা হলো। জনের কাঠের বাড়িটা পানিতে ডুবে গেলো। গ্রামের অনেকে তাদের আত্মীয়দের কাছে চলে গেলো; কিন্তু মেরির জন্যে কেউ এলো না। জন তখন গীর্জার উঁচু জমিতে একটা তাঁবু বানালো। মেরিকে নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিলো। পানিতে ভেসে যাওয়া গীর্জার কাঠের বেঞ্চ দেখে তার মন ভারী হয়ে গেলো, তবু সে মেরির দিকে তাকিয়ে বললো, “ভয় পেয়ো না, ঈশ্বর আমাদের দেখছেন। আমি তোমার পাশে আছি।”

মেরি কিছু বললো না। শুধু মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। কিন্তু সেই রাতে, যখন বৃষ্টির শব্দে জনের ঘুম ভাঙলো, সে দেখলো মেরি তার পাশে বসে আছে। তার চোখে জল। জন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, মেরি?”

মেরি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললো, “আমার কেউ নেই, জন। তুমি না থাকলে আমি কোথায় যেতাম?”

জনের বুকটা ভারী হয়ে গেলো। সে বুঝলো, মেরির এ কথায় ভালোবাসা নেই, আছে শুধু একটা অসহায়ত্ব। তবু সে হাসলো। বললো, “ঈশ্বর আমাদের এক করেছেন। আমি তোমাকে কখনো একা ছাড়বো না।”

বন্যা কেটে গেলো। গ্রাম আবার স্বাভাবিক হলো। মেরি তার পুরোনো রূপে ফিরে গেলোÑজনের প্রতি তার অবহেলা, উদাসীনতা আবার ফিরে এল। কিন্তু জনের মনে একটা শান্তি ছিলো। সে প্রতি রোববার গীর্জায় গিয়ে প্রার্থনা করতো, মেরির জন্যে, তাদের সম্পর্কের জন্যে। সে জানতো, মেরি তার কাছে থাকুক বা না থাকুক, তার একটা দায়িত্ব আছে। তার একাকীত্বের মধ্যেও একটা শক্তি ছিলোÑঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস আর একটা সম্পর্ক ধরে রাখার প্রতিজ্ঞা।

জনের জীবন এভাবেই চলতে থাকলো। একটা সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসা ছিলো না, ছিলো শুধু একটা অদৃশ্য বন্ধনÑঅসহায়ত্ব আর দায়বদ্ধতার। তবু জনের মনে একটা আলো ছিলো। সে বিশ্বাস করতো, এ বন্ধনই তার জীবনের ক্রুশÑযেটা সে বহন করবে, যতোদিন ঈশ্বর তাকে শক্তি দেবেন।

১৯ নভেম্বর ২০২৫

You might like