ছোটগল্প: ভালোবাসার আলো

ক্ষুদীরাম দাস

গ্রামের নাম ছিলো আনন্দপুর। বর্ষার পরে ধানখেতগুলো যখন সবুজ কার্পেটের মতো ঢেউ খেলায়, তখন দূর থেকে দেখলে মনে হতো যেন স্বর্গের কোনো অংশ পৃথিবীতে নেমে এসেছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট পুকুর, যার জলে সাদা শাপলা আর লাল লিলি ফুটতো। পুকুরের পাড়ে বাঁশঝাড়, আর তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতো সাদা বকের ঝাঁক। গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো একটা লাল ইটের গীর্জা। তার সাদা ক্রুশটা সূর্যের আলোয় ঝকঝক করতো। প্রতি রোববার সকাল আটটায় ঘণ্টা বাজতোÑঢং… ঢং… ঢং…। সেই ধ্বনি যেন গ্রামের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মনে প্রভু যীশুর শান্তি আর ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দিতো। শিশুরা গীর্জার দিকে ছুটতো, বুড়ো-বুড়িরা লাঠি ঠকঠক করে হাঁটতো, মায়েরা শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিতো। কিন্তু মায়ার ঘরে সেই শান্তি কখনো পৌঁছায়নি। তার কুঁড়েঘরটা ছিলো গ্রামের সবচেয়ে দূরের কোণে, যেখানে রাস্তাও শেষ হয়ে যায়, যেখানে গীর্জার ঘণ্টার আওয়াজ এলেও খুব ¤øান হয়ে আসে।

মায়া থাকতো একটা ভাঙা কুঁড়েঘরে। ছাউনিতে ছিলো ফুটো, বর্ষায় জল পড়তো টপটপ করে। দেওয়ালে শুধু কাদা আর বাঁশের খুঁটি। এক কোণে একটা ভাঙা খাটিয়া, তার ওপরে ছেঁড়া কম্বল। আরেক কোণে একটা মাটির উনুন। মেঝেতে কখনো শুকনো, কখনো কাদা। দরজা বলতে একটা বাঁশের চাটাই, যেটা রাতে নামিয়ে দিতো। জানালা ছিলো একটা ছোট্ট ফুটো, যেখান দিয়ে সূর্যের আলো আসতো খুব কম। সেই ঘরেই মায়া বড় হয়েছিলো।

তার বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন যখন তার বয়স মাত্র সাত। বাবা ছিলেন গ্রামের স্কুলের মাস্টার, মা গির্জার গানের দলে গাইতেন। একটা ঝড়ের রাতে নৌকা ডুবে দু’জনেই চলে গিয়েছিলেন। সেই রাতের কথা মায়া এখনো মনে করতে পারে। বৃষ্টি পড়ছিলো ঝমঝম করে, বজ্রপাত হচ্ছিলো, আর সে তার ছোট্ট কুঁড়েঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিলো। কেউ তাকে জড়িয়ে ধরেনি। পরদিন গ্রামের লোকেরা লাশ দু’টো এনে কবর দিয়েছিলো গির্জার পিছনে। তারপর পাস্টর জন থমাস এসেছিলেন। তিনি ছিলেন লম্বা, সাদা দাড়িওয়ালা, চোখে মোটা চশমা। তাঁর গলায় সবসময় একটা ক্রুশ ঝোলানো থাকতো। তিনি মায়ার হাত ধরে বলেছিলেন, “ভয় পাস না মা, প্রভু যীশু তোকে একা ফেলবেন না। চল, তোকে তোর মামার কাছে নিয়ে যাই।”

পাস্টর জন মায়াকে নিয়ে গিয়েছিলেন মামা ডেভিডের বাড়ি। বাড়িটা ছিলো পাকা, দোতলা, সামনে বড় উঠোন। ডেভিড মামা ছিলেন গ্রামের বড় চাষি, অনেক জমি ছিলো। মামি মেরির পরনে সবসময় সুন্দর শাড়ি, গলায় সোনার চেন। তাদের দু’টো ছেলেমেয়েÑরিনা আর ছোট ছেলে পল। পাস্টর যখন মায়াকে নিয়ে গেলেন, তখন ডেভিড মামা ভ্রæ কুঁচকে তাকিয়েছিলেন। মামি মেরি মুখ ভোঁতা করে বলেছিলেন, “আরেকটা মুখ বাড়লো।” তবুও পাস্টরের কথায় তারা রাজি হয়েছিলেন। পাস্টর বলেছিলেন, “ডেভিড, এ মেয়েটি তোমার বোনের মেয়ে। প্রভু যীশু বাইবেলে বলেছেন, ‘যতোক্ষণ তোমরা আমার এই ক্ষুদ্র ভাইদের একজনের প্রতি এটা করোনি, ততোক্ষণ আমার প্রতিও করোনি।’ তাকে আপন করে নাও। প্রভু তোমাদের আশীর্বাদ করবেন।” ডেভিড মামা মাথা নেড়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চোখে কোনো উষ্ণতা ছিলো না।

কিন্তু ডেভিড মামা আর মামি মেরি তাকে কখনো আপন করে নেননি। তারা ছিলো খ্রীষ্টান, প্রতি রবিবার গীর্জায় যেতো, সামনের সারিতে বসতো, প্রার্থনা করতো জোর গলায়, দানের থালায় সবচেয়ে বড় নোট দিতো। কিন্তু তাদের হৃদয়ে প্রভু যীশুর ভালোবাসা ছিলো না। মায়াকে তারা গৃহকর্মী বানিয়ে রেখেছিলো। সকাল পাঁচটায় ঘুম ভাঙতো। প্রথম কাজ ছিলো উঠোন ঝাঁট দেয়া। তারপর গোরু বাঁধতে যেতে হতো। গোরুর গোয়ালে অন্ধকার, গন্ধ, কিন্তু কেউ যেতো নাÑসব মায়াকে করতে হতো। তারপর রান্নাঘরে আগুন জ্বালাতে হতো। মামি বলতো, “আজ দেরি করলে খাবি না।” মায়া চুপ করে কাজ করতো। জমিতেও যেতে হতো। ধান রোপণের সময় কোমর পর্যন্ত কাদায় ডুবে থাকতে হতো। সূর্যের তাপে পিঠ পুড়ে যেতো। দুপুরে যখন সবাই বিশ্রাম নিতো, তখনো মায়াকে বাসন মাজতে হতো, কাপড় কাচতে হতো। সন্ধ্যায় গোরু দুইতে হতো। রাতে যখন সবাই খেয়ে শুয়ে পড়তো, তখন মায়া তার কুঁড়েঘরে গিয়ে একটু ভাত আর ডাল মেখে খেতো। কখনো কিছু বেঁচে থাকলে তবেই, নইলে উপোস।

কথায় কথায় শুনতে হতো, “তোর বাবা-মা না থাকলে তুই এখানে থাকতিস কী করে? আমরা তোকে খেতে দিই, পরতে দিই। আর কী চাস?” মামি মেরি বলতো, “তোর মা গান গাইতো বলে গর্ব করতো, কিন্তু দেখ তো শেষে কী হলো।” রিনা আর পল হাসতো। মায়া চুপ করে থাকতো। তার চোখে জল আসতো, কিন্তু সে কখনো কাঁদতো না। কাঁদলে আরো বকা পেতো, আরো কাজ বাড়তো। সে শুধু রাতে তার ছোট্ট খাটিয়ায় শুয়ে চুপচাপ কাঁদতো। তার কোনো বন্ধু ছিলো না। গ্রামের বাচ্চারা তাকে “এতিম” বলে ডাকতো। সে একা, পুরোপুরি একা। গির্জার ঘণ্টা বাজলেও তার কানে যেন শুধু দূরের শব্দ আসতো। প্রভু যীশুর শান্তি তার কুঁড়েঘরের দরজা পর্যন্ত আসতো, কিন্তু ভিতরে ঢুকতে পারতো না। কারণ সেখানে শুধু অন্ধকার আর কষ্ট ছিলো।

প্রতি রবিবার সকালে গির্জার ঘণ্টা বাজার আগেই মায়া উঠে পড়তো। অন্যদের জন্যে সে সকালের চা বানাতো, রুটি সেঁকতো, বাড়ির সবাইকে ডেকে দিতো। তারপর নিজে একটা পুরোনো নীল ফ্রক পরে নিতোÑযেটা তার মা একসময় পরতেন, এখনো তার গায়ে লাগেÑআর চুপচাপ গীর্জার দিকে হাঁটতো। রাস্তায় অন্য বাচ্চারা গল্প করতে করতে যেতো, কেউ কেউ হইচই করতো, কিন্তু কেউ মায়ার সঙ্গে কথা বলতো না। সে একা হাঁটতো। গির্জার দরজায় পৌঁছে সে সবার পিছনের বেঞ্চে বসতো। কারো চোখে চোখে পড়তো না সে।

পাস্টর জন থমাস যখন মিম্বরে উঠতেন, তখন গির্জা নিস্তব্ধ হয়ে যেতো। তাঁর গলা ছিলো গম্ভীর, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা। প্রতি রবিবার তিনি একটা করে আয়াত বলতেন। কখনো যোহন ৩:১৬Ñ“কারণ ঈশ্বর জগৎকে এতোটা ভালোবেসেছেন যে, তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে দান করেছেন…” কখনো যোহন ১৫:১২Ñ“আমার আদেশ এই যে, আমি তোমাদের যেমন ভালোবেসেছি, তোমরাও পরস্পরকে তেমনি ভালোবাসো।” তিনি বলতেন, “প্রভু যীশু ক্রুশে আমাদের জন্যে মারা গেছেন, কারণ তিনি আমাদের ভালোবাসেন। তিনি আমাদের প্রত্যেককে নাম ধরে ডাকেন। তিনি কখনো আমাদের ছেড়ে যান না।” গীর্জার লোকেরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতো, কেউ কেউ চোখ বুজে প্রার্থনা করতে থাকতো।

কিন্তু মায়ার মনে শুধু প্রশ্ন জাগতো। সে ভাবতো, “প্রভু যদি আমাকে ভালোবাসেন, তাহলে কেন আমি এতো একা? কেন মামা-মামি আমাকে বোঝা মনে করেন? কেন কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না? কেন আমার জন্যে কেউ একটুও হাসে না?” সে চুপ করে বসে থাকতো। গানের সময় সবাই যখন দাঁড়িয়ে গাইতো, “আমার প্রভু যীশু, তুমি মহান…”, মায়া ঠোঁট নেড়ে গাইতো, কিন্তু তার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোতো না। গির্জা থেকে ফেরার সময় সবাই গল্প করতে করতে যেতো, কেউ মায়াকে জিজ্ঞেস করতো না, “কেমন লাগলো সার্ভিস?” সে একা হেঁটে ফিরতো। মনে হতো, গির্জার আলোটা তার ওপর পড়েই আবার ফিরে যায়।

প্রার্থনার সময় পাস্টর বলতেন, “এবার নিজেদের জন্যে প্রার্থনা করো।” মায়া চোখ বুজতো। সে বলতো, “প্রভু, আমাকে একটু ভালোবাসা দাও। আমাকে দেখো। আমি তোমার মেয়ে না কী?” কিন্তু প্রার্থনা শেষ হলে তার মনে শান্তি আসতো না। মনে হতো তার কথাগুলো গির্জার ছাদে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। আকাশে পৌঁছাচ্ছে না। কখনো কখনো সে গীর্জার পিছনে গিয়ে একা বসতো। সেখানে কবরস্থান ছিলো। তার বাবা-মায়ের কবর দু’টো পাশাপাশি। সে কবরের ওপর হাত রেখে বলতো, “মা, বাবা, আমি খুব কষ্টে আছি। প্রভু কি আমাকে ভুলে গেছেন?” কিন্তু কবর নিস্তব্ধ থাকতো। কোনো উত্তর আসতো না।

এইভাবে বছরের পর বছর কেটে গেলো। মায়ার বয়স বাড়লো, কিন্তু তার মনের কষ্ট কমলো না। সে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো যে কখনো কখনো ভাবতো, হয়তো প্রভুও তাকে ভালোবাসেন না। হয়তো সে কোনো পাপ করেছে, তাই শাস্তি পাচ্ছে। সে আরো বেশি কাজ করতো, যাতে অন্তত মামা-মামি খুশি হয়। কিন্তু তারা কখনো খুশি হতো না।

তারপর এলো সেই বর্ষা। আকাশ থেকে জল পড়ছিলো ঝমঝম করে, ধানখেত ডুবে গিয়েছিলো, রাস্তা কাদা। গ্রামের লোকেরা ঘরে বসে ছিলো। হঠাৎ একদিন বৃষ্টি থামলো, আকাশে রংধনু উঠলো। আর তখনই গ্রামে এলো রাহুল। সে এসেছিলো একটা পুরোনো সাইকেলে। পিঠে ঝোলানো গিটার, মাথায় ছেঁড়া টুপি, পরনে কাপড় ভিজে চুপচুপে। গায়ের রং গমের মতো, চোখে হাসি। সে গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে গান ধরলো। তার গলায় ছিলো এমন মিষ্টতা যেন মধু ঝরছে। গ্রামের লোকেরা ধীরে ধীরে জড়ো হলো। বাচ্চারা ছুটে এলো। এমনকি বুড়ো-বুড়িরাও লাঠি ঠকঠক করে এলো।

রাহুল গাইতো বাংলা আর ইংরেজি মিশিয়ে। কখনো পুরো বাইবেলের আয়াত, কখনো নিজের লেখা। এক সন্ধ্যায় সে গাইলো:
“যীশু বলেছেন, আমি তোমাদের জন্যে দু’হাত পেতে আছি
কষ্টের রাতে, দুঃখের পথে, আমি তোমায় ধরবো হাত ধরে
যখন তুমি একা, যখন তুমি ভাঙা, আমি তোমায় জড়িয়ে নেবো বুকে
যে হৃদয়ে কষ্টের ছায়া, তাকে ভালোবাসা দাও মায়া।
ঈড়সব ঃড় সব, ধষষ ুড়ঁ যিড় ধৎব বিধৎু ধহফ নঁৎফবহবফ,
ধহফ ও রিষষ মরাব ুড়ঁ ৎবংঃ…”

গানের প্রতিটি কথা যেন মায়ার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধলো। সে দূরে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিলো। তার চোখ ভিজে গেলো। অনেকদিন পর তার বুকের ভিতরে কিছু একটা নড়ে উঠলো। যেন কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। যেন কেউ বলছে, “তুই একা নোস। আমি তোকে দেখছি।” সে আর চুপ করে থাকতে পারলো না। গান শেষ হলে সবাই চলে গেলে, সে ধীরে ধীরে রাহুলের কাছে গেলো। তার পা কাঁপছিলো। গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সে গেলো। কারণ অনেকদিন পর কেউ যেন তার হৃদয়ের দরজায় টোকা দিয়েছে।

মায়া দূরে একটা পুরোনো আমগাছের নিচে দাঁড়িয়েছিলো। সন্ধ্যার আলো মিশে গেছে বর্ষার পরের মেঘের সঙ্গে। তার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিলো, কিন্তু সে মুছছিলো না। গানটা শেষ হতেই চারদিকে হাততালি পড়লো। লোকেরা রাহুলকে ঘিরে ধরলো, কেউ হাত মিলালো, কেউ আশীর্বাদ চাইলো। মায়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তার পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। কিন্তু গানের শেষ লাইনটাÑ“যে হৃদয়ে কষ্টের ছায়া, তাকে ভালোবাসা দাও মায়া”Ñতার নাম ধরে ডেকেছে যেন। অনেকদিন পর কেউ তার নাম এমনভাবে উচ্চারণ করেছে।
লোকেরা যখন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিলো, তখন মায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। তার হাত কাঁপছিলো, গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। রাহুল গিটারটা কাঁধে তুলে নিচ্ছিলো, হঠাৎ মায়াকে দেখে থমকে দাঁড়ালো। তার মুখে একটা উষ্ণ হাসি ফুটলো।

“কী নাম তোমার?”

“মায়া।


“চোখে এতো জল কেন, মায়া?”
সেই প্রশ্নটা যেন তার বুকের ভিতরে জমে থাকা সব বাঁধ ভেঙে দিলো। মায়া আর চুপ করে থাকতে পারলো না। সে কাঁদতে কাঁদতে সব বলে দিলো। বাবা-মায়ের মৃত্যুর কথা, মামার বাড়ির কষ্ট, কাজের চাপ, তিরস্কার, রাতে একা কান্না, গির্জায় গিয়েও শান্তি না পাওয়া, প্রার্থনা আকাশে না পৌঁছানোর ভয়Ñসব। কথা বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে এলো। রাহুল চুপ করে শুনছিলো। তার চোখে কোনো বিস্ময় ছিলো না, ছিলো শুধু গভীর মমতা।
সব শুনে রাহুল একটা গভীর নিশ্বাস ফেললো। তারপর খুব শান্ত গলায় বললো, “মায়া, প্রভু যীশু তোমাকে ভালোবাসেন। তিনি তোমার প্রতিটি অশ্রæ গুনে রেখেছেন। কিন্তু তুমি নিজেকে ভালোবাসো কী? তুমি কি নিজেকে ক্ষমা করেছো? তুমি কি নিজেকে প্রভুর চোখে দেখেছো? তিনি তোমাকে তাঁর প্রিয় মেয়ে বলে ডাকেন। তুমি যদি নিজেকে সেই ভালোবাসা না দাও, তাহলে অন্য কেউ দিলেও তা পৌঁছাবে না। প্রথমে তুমি নিজের হৃদয়কে ভালোবাসা দাও। নিজেকে বলোÑ‘আমি প্রভুর সন্তান। আমি মূল্যবান।’ তারপর দেখবে, পৃথিবীটা বদলে যাবে।”

মায়া বাড়ি ফিরলো। রাত তখন গভীর। মামার বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সে তার কুঁড়েঘরে গিয়ে মোমবাতি জ্বালালো। প্রথমবারের মতো সে নিজের জন্যে প্রার্থনা করলো। হাঁটু গেড়ে বসে বললো, “প্রভু, আমি নিজেকে ভালোবাসতে শিখতে চাই। আমি তোমার মেয়ে। আমাকে শেখাও। আমার কষ্টগুলো তুমি নিয়ে নাও। আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাও।” কথা বলতে বলতে তার গলা ভিজে গেলো, কিন্তু এবারের কান্নাটা আগের মতো নয়। এবারের কান্নায় ছিলো একটা অদ্ভুত শান্তি।

পরদিন থেকে মায়া ছোট ছোট কাজ শুরু করলো। সকালে সে আরো আগে উঠতো। মামার বাড়ির কাজ সেরে নিয়ে চুপিচুপি নদীর ধারে চলে যেতো। সেখানে একটা পুরোনো বাইবেল ছিলো তার মায়ের, যেটা সে লুকিয়ে রেখেছিলো। পাতা ছেঁড়া, কিন্তু তার জন্যে সবচেয়ে দামি। সে বসে বাইবেল পড়তো। গীতসংহিতা ২৩Ñ“প্রভু আমার মেষপালক, আমার কোনো অভাব হবে না…” পড়তে পড়তে কাঁদতো, তারপর হাসতো। কখনো নিজের মনে গান গাইতো। নদীর ধার থেকে ফুল তুলে নিজের চুলে গুঁজতো। “আমিও সুন্দর। প্রভু আমাকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন।” এই কথাটা সে নিজেকে বলতো। বাড়ি ফিরে নিজের কুঁড়েঘরটা ঝাঁট দিতো, কাদা লেপে দিতো, একটা ছোট কাঠের ক্রুশ দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিলো। সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতো। ধীরে ধীরে তার মন হালকা হতে লাগলো। চোখে একটা নতুন আলো এলো।

এক রবিবার গির্জায় গিয়ে পাস্টর জন মায়াকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। আগে মায়া পিছনের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসতো। এখন সে সামনের দিকে বসেছে, চোখে শান্তি, মুখে হালকা হাসি। সার্ভিসের পর পাস্টর তাকে ডেকে বললেন, “মায়া, তোমার মধ্যে যীশুর আলো জ্বলছে। কী হয়েছে?” মায়া লজ্জায় হাসলো। “পাস্টর, আমি নিজেকে ভালোবাসতে শিখেছি। প্রভু আমাকে শিখিয়েছেন।”

কয়েকদিন পর মায়া দেখলো, তার মামাতো বোন রিনা গির্জার সিঁড়িতে বসে কাঁদছে। রিনা আস্তে কথা বলে, তাই সবাই তাকে ‘মন্থর’ বলে ডাকে। গানের দল থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মায়া তার কাছে গিয়ে বসলো। রিনা অবাক হয়ে তাকালোÑকেউ কখনো তার কাছে এভাবে বসেনি।
“রিনা, কাঁদছিস কেন?


“দিদি… আমি গান গাইতে চেয়েছিলাম… কিন্তু তারা বললো, আমি আস্তে গাই… তাই হবে না।”
মায়া রিনার হাত ধরলো। “চল, আমার সঙ্গে গান গা।”

দু’জনে গির্জার পিছনে গেলো। সেখানে কেউ ছিলো না। মায়া গাইলো, “যীশু আমায় ভালোবাসেন…” রিনাও গাইতে শুরু করলো। তার গলায় ছিলো অপূর্ব মিষ্টতা। মায়া চোখ বুজে শুনলো। তারপর বললো, “রিনা, তুই যেন ফেরেশতা। প্রভু তোকে এ গলা দিয়েছেন। কেউ না শুনলে কী হয়েছে? আমি শুনবো। প্রভু শুনছেন।” সেই থেকে দু’জনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় গান গাইতো। রিনার মুখে হাসি ফিরলো।

একদিন গ্রামের বৃদ্ধা মার্থা মা জ্বরে শয্যাশায়ী। কেউ তাঁর খোঁজ নিতো না। মায়া প্রতিদিন তাঁর জন্যে খাবার নিয়ে যেতোÑকখনো ডাল-ভাত, কখনো দুধ। পা টিপে দিতো। বাইবেল পড়ে শোনাতো। মার্থা মা দুর্বল গলায় বলতেন, “মায়া, তুই যেন প্রভুর দূত। তোর জন্যে আমি বাঁচবো।”
আবার একদিন ছোট জনি গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙে ফেললো। তার বাবা-মা দিনমজুর, হাসপাতালের টাকা নেই। মায়া গির্জায় ছুটে গেলো। পাস্টরকে বললো। দু’জনে মিলে গ্রামে চাঁদা তুললো। জনির পায়ে প্লাস্টার হলো। জনি এখনো খোঁড়ায়, কিন্তু মায়াকে দেখলেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলে, “মায়া দিদি, তুমি আমার ফেরেশতা।”

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ মায়ার কাছে আসতে লাগলো। কেউ স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া মিটাতে, কেউ ছেলের নেশা ছাড়াতে, কেউ শুধু একটু কথা বলতে। মায়া সবাইকে সময় দিতো। কারো হাত ধরে প্রার্থনা করতো, কারো কাঁধে হাত রেখে বলতো, “প্রভু তোমায় দেখছেন।” তার হৃদয় এতোটা ভালোবাসায় ভরে গেলো যে নিজের কষ্টের জায়গা আর রইলো না।

এক বছর পরে রাহুল আবার এলো। গির্জার সামনে সে গান গাইছিলো। গান শেষে সে মায়াকে দেখলো। মায়ার পরনে সাদা শাড়ি, চুলে ফুল, চোখে শান্তি, মুখে হাসি। চারদিকে ছোট ছোট বাচ্চারা তাকে ঘিরে আছে, রিনা তার পাশে দাঁড়িয়ে। রাহুল এগিয়ে এসে বললো, “মায়া, তুমি বদলে গেছো।”
মায়া হাসলো। “না দাদা, আমি শুধু নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। প্রভু আমাকে নিজের মেয়ে বলে ডেকেছেন। আমি এখন তাঁর ভালোবাসা অন্যদের দিই। যতো দিই, ততোই পাই।”

পাস্টর জন এসে দু’জনের কাঁধে হাত রাখলেন। “মায়া, তুমি আজ থেকে গির্জার গানের দলের নেত্রী। আর রিনা তোমার সঙ্গে গাইবে।” সেদিন গির্জায় যখন মায়া আর রিনা গাইলো, “যীশুর ভালোবাসা কতো মধুর, কতো গভীর…”, তখন পুরো গীর্জা কেঁদে ফেললো। এমনকি মামা-মামিও চোখ মুছলেন।
এখন আনন্দপুর গ্রামে সবাই বলে, মায়া যেন প্রভুর দেওয়া একটা জ্বলন্ত প্রদীপ। তার আলোয় কতো কষ্টের ঘর আলোকিত হয়েছে। আর মায়া জানে, সেই আলোর উৎস তার নিজের হৃদয়ে। যেদিন সে নিজেকে ভালোবাসতে শিখলো, সেদিন থেকে তার জীবন বদলে গেলো। সে শিখলো, প্রভু যীশুর ভালোবাসা কখনো হিসেব করে দেয়া যায় না। যতো দাও, ততোই পাও। আর যতো পাও, ততোই দিতে ইচ্ছে করে। এটাই ভালোবাসার চিরন্তন নিয়ম।
-সমাপ্ত-

শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫

You might like