

ক্ষুদীরাম দাস:
চাঁদপুরের মেঘনা নদীর ঘাটে সূর্যাস্তের সময় একটা বিশেষ আলো পড়ে। সেই আলোয় ইলিশের চামড়ার মতো রূপালি ঝিলিক দেখা যায় জলে। মণিকা সেই ঘাটে বসলো একদিন। তার হাতে ছিলো একটা ইলিশ, সবে ধরা। গন্ধটা এতো মধুর যে বাতাসও যেন থমকে গেলো। মণিকা ছিলো চাঁদপুরের হিন্দু পরিবারের মেয়ে। তার বাবা রামচন্দ্র দাস ছিলেন গ্রামের পুরোহিত। মা সীতা দেবী ইলিশ রাঁধতে পারতেন এমনভাবে যে গোটা গ্রাম এসে খেতো।

মণিকার চোখ দু’টি নদীর মতো গভীর। চুলগুলো বাতাসে উড়তো ইলিশের পাখনার মতো নরম করে।
সে ইলিশের সুবাসে বড় হয়েছে। প্রতিদিন সকালে নদীতে যেতো মাছ ধরতে। “ইলিশের গন্ধই তো আমার জীবনের সুর,” বলতো সে নিজের মনে। চাঁদপুরকে বলা হয় ইলিশের রাজধানী। সেখানকার মাটিতে ইলিশের গন্ধ মিশে আছে। মণিকা তার পরিবারের একমাত্র মেয়ে। ভাই নেই, তাই সবাই তাকেই ভালোবাসতো বিশেষ করে।
একদিন সেই ঘাটে এলো সঞ্জয়। সঞ্জয় ছিলো ঢাকার ছেলে। তার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী, হিন্দু পরিবারের। সঞ্জয়ের ছোটবেলা থেকে ইলিশের প্রতি এক অদ্ভুত মোহ। শহরে ইলিশ পেলে সে কিনতো, কিন্তু চাঁদপুরের ইলিশের স্বাদ ছাড়া সবই ফিকে।
এক বন্ধু বললো, “চাঁদপুরে যা’, সেখানকার ইলিশ খাবি। আর সেখানে এক মেয়ে আছে, তার নাম মণিকা। সে যেন ইলিশের সতীর্থ।” সঞ্জয়ের হৃদয় কেঁপে উঠলো। সে ছুটে এলো চাঁদপুরে।
ঘাটে দাঁড়িয়ে সে দেখলো মণিকাকে। মণিকা ইলিশটা হাতে নিয়ে দেখছিলো। সঞ্জয়ের চোখ আটকে গেলো। “কী সুন্দর!” বললো সে নিজের মনে।
মণিকা তাকালো তার দিকে। তাদের চোখাচোখি হলো। সঞ্জয় এগিয়ে এলো। “এ ইলিশটা তোমার?” জিজ্ঞাসা করলো সে।
মণিকা হাসলো। “হ্যাঁ, সবে ধরলাম। তুমি কোথা থেকে?”
সঞ্জয় বললো, “ঢাকা থেকে। ইলিশ খেতে এসেছি। তোমার নাম কী?”
মণিকা বললো, “মণিকা। আর তুমি?”
“সঞ্জয়।”
দু’জনে কথা বলতে লাগলো। ইলিশের গন্ধ তাদের মাঝখানে বইতে থাকলো।
পরদিন সঞ্জয় গেলো ইলিশের বাজারে। চাঁদপুরের বাজারটা বিখ্যাত। সকালে মাঝিরা ইলিশ নিয়ে আসে। গন্ধটা এতোটাই প্রবল যে দূর থেকেই টের পাওয়া যায়। সঞ্জয় ঘুরছিলো। হঠাৎ দেখলো মণিকা একটা দোকানে দাঁড়িয়ে। সে ইলিশ কিনছিলো। সঞ্জয় এগিয়ে গেলো।
“আবার দেখা!” বললো সে হেসে। মণিকা ফিরে তাকালো।
“হ্যাঁ, তুমি এখানে? ইলিশ কিনবে?”
সঞ্জয় বললো, “হ্যাঁ, কিন্তু তোমার সাথে কিনবো। কোনটা ভালো?”
মণিকা দেখালো একটা বড় ইলিশ। “এটা। এর গন্ধ সবচেয়ে মিষ্টি।”
দু’জনে কথা বলতে বলতে বাজার ঘুরলো। সঞ্জয় বললো, “আমি ইলিশ খুব ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকে। মা রাঁধতো, আমি খেয়ে স্বর্গে চলে যেতাম।” মণিকা হাসলো।
“এখানে ইলিশ আমাদের জীবন। আমার বাবা বলেন, ইলিশ ছাড়া চাঁদপুর অসম্পূর্ণ। আমরা হিন্দু পরিবার, দুর্গাপুজোয় ইলিশ নৈবেদ্য দেই।”
সঞ্জয় বললো, “আমাদেরও তাই। আমার বাবা বলতেন, ইলিশ খেলে মন শান্ত হয়।”
বাজার থেকে বেরিয়ে তারা নদীর ধারে বসলো। মণিকা বললো, “তুমি কেন এসেছো আসলে?”
সঞ্জয় সত্যি বললো, “ইলিশের জন্য। আর এখন তোমার জন্য।”
মণিকার গাল লাল হয়ে গেলো। সে বললো, “এ কী বলছো?”
সঞ্জয় বললো, “সত্যি। তোমাকে দেখে মনে হলো, তুমি ইলিশের মতোÑসুন্দর, সুবাসময়।”
দু’জনে হাসলো। সেই দিন থেকে তারা প্রতিদিন দেখা করতে লাগলো। চাঁদপুরের নদী, ইলিশের গন্ধ, সবই তাদের প্রেমের সাক্ষী হয়ে উঠলো।
সঞ্জয়ের আসা-যাওয়া চলতে লাগলো। গ্রামের লোকজন লক্ষ করলো। মণিকার বাবা রামচন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হচ্ছে মণিকা?”
মণিকা বললো, “বাবা, এক ছেলে এসেছে। সে ভালো। ইলিশ ভালোবাসে।”
রামচন্দ্র হাসলেন। “আন তাকে। দেখি।”
সঞ্জয় এলো। সে প্রণাম করলো। “আমি সঞ্জয়। মণিকাকে ভালোবাসি।”
রামচন্দ্র বললেন, “ভালো। কিন্তু আমরা হিন্দু। তুমি কী পরিবারের?”
সঞ্জয় বললো, “আমরাও হিন্দু। বাবা ব্যবসায়ী।”
সীতা দেবী ইলিশ রান্না করে দিলেন। সঞ্জয় খেয়ে বললো, “এর চেয়ে ভালো ইলিশ কখনো খাইনি।”
সবাই হাসলো। মণিকার মা বললেন, “ইলিশের সুবাসে তোমাদের বিয়ে হবে।”
সঞ্জয়ের বাবা ঢাকা থেকে এলেন। তারাও রাজি হলেন। “চাঁদপুরের মেয়ে পেলে আমাদের ছেলের ভাগ্য জাগবে। ইলিশের স্বাদ পাবে সারাজীবন।”
বিয়ের তারিখ ঠিক হলো। গ্রামে হইচই পড়ে গেলো। হিন্দু রীতি মেনে গায়ত্রী মন্ত্র পড়া হলো। মণিকা আর সঞ্জয়ের হাত ধরিয়ে দেয়া হলো আগুনের সামনে। ইলিশের একটা প্লেট রাখা হলো সিন্দুরের পাশে। “এটা তোমাদের ভালোবাসার প্রতীক,” বললেন পুরোহিত।
বিয়ে হয়ে গেলো। সঞ্জয় এলো চাঁদপুরে থাকতে। তারা মাটির ঘরে থাকলো। প্রতিদিন সকালে মণিকা ইলিশ ধরতে যেতো। সঞ্জয় সাথে যেতো। “এখন ইলিশের স্বাদ আরো গভীর,” বলতো সঞ্জয়।
মণিকা হাসতো। “কারণ আমি আছি।”
দু’জনে নদীর ধারে বসে গল্প করতো। চাঁদপুরের সন্ধ্যায় ইলিশের গন্ধ ভেসে আসতো। সঞ্জয় বলতো, “তোমাকে বিয়ে করে ইলিশের প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে। যেন শ্বশুরবাড়িতে ইলিশের বাড়িতে এসেছি।”
মণিকা বলতো, “আর আমার জীবন ইলিশের মতো পূর্ণ।”
একদিন মেঘনা নদীতে বন্যা এলো। ইলিশ ভেসে আসলো অনেক। তারা দু’জনে ধরলো। রাতে রান্না করে খেলো। সেই সুবাসে তাদের ভালোবাসা আরো গাঢ় হলো। সন্তান হলো তাদের। ছেলে নাম রাখলো ইলিশচন্দ্র। মেয়ে মণিমা। শিশুরা ইলিশ খেয়ে বড় হলো।
জীবন চলতে থাকলো। সঞ্জয় শহরে যেতো কাজে, কিন্তু চাঁদপুরে ফিরতো। “ইলিশ ছাড়া আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না,” বলতো সে।
মণিকা বলতো, “আমিও তা’।” চাঁদপুরের ইলিশের সুবাস তাদের বন্ধনকে অটুট রাখলো।
বছর গেলো। বুড়ো হলো তারা। নাতি-নাতনিরা এসে ইলিশ খেতো। সেই গন্ধে স্মৃতি জেগে উঠতো। মণিকা বলতো, “দেখো, ইলিশের সুবাসে আমাদের প্রেম শুরু হয়েছিলো। এখনো তা’ আছে।”
সঞ্জয় বলতো, “হ্যাঁ, চাঁদপুরের এই মেয়েকে বিয়ে করে ইলিশের স্বাদ চিরকাল পেলাম।”
মঙ্গলবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫















