ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৪র্থ পর্ব

মিজানুর রহমান রানার ক্রাইম থ্রিলার চতুর্থ পর্ব

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

চার.
চারদিকে বাতাস বইছে, ভীষণ দমকা হাওয়া। গত ক’দিন গরমের পর বজ্রসহ বৃষ্টি হচ্ছে। ইমতিয়াজের মনে হলো তার শরীরের ক্লান্তিটা দূর হচ্ছে। গত ক’দিন সিরিয়াল কিলারের খোঁজে দিন-রাত এক বিন্দু পরিমাণও অবসর ছিলো না| প্রচণ্ড গরমেও পুরো টীমসহ বাইরে কাটাতে হয়েছে তাদেরকে। মাথায় শুধু চিন্তার জটলা কীভাবে ওই সিরিয়াল কিলারকে ধরে থামানো যায়।

বাসায় বসে বসে জানালার গ্লাস দিয়ে ঝড় বৃষ্টি দেখছিলো আর ভাবছিলো সে| ঠিক সেই সময়ই জানালার গ্লাস দিয়ে রেইনকোট পরে রাশমিকাকে আসতে দেখলো সে।

রাশমিকাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালো ইমতিয়াজ। তারপর দরজা খুলে দিলো। রেইনকোট খুলে রাশমিকা রহস্যময় হেসে ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে রইলো।

‘কী ব্যাপার! এই ঝড় বৃষ্টির দিনে হঠাৎ করে আমার বাসায়?’ প্রশ্ন করলো ইমতিয়াজ।

‘আসলে মাথায় কিছু ক্লু ঘুরছিলো, তাই তোমার সাথে শেয়ার করার জন্যে আসলাম।’

‘ভেরি গুড| এবার বলো কী খাবে, চা নাকি কফি?’

‘বানাবে কে, তুমি?’ হাসলো রাশমিকা।

‘আমি ছাড়া তো বাসায় আর কেউ নেই, তাহলে আমিই বানাবো, ঠিক আছে?’

‘আচ্ছা, বানাও, দেখি তোমার হাতের কফিটা কেমন লাগে।’

ইমতিয়াজ কিচেনে গিয়ে রাশমিকার জন্য কফি তৈরি করে নিয়ে এলো, রাশমিকা কফিতে চুমুক দিয়েই বললো, ‘ওয়াও, চমৎকার কফি বানাতে পারো তুমি| বিয়ে করে বৌ নিয়ে এসো, তাহলে তোমার কষ্টটা কমবে।’

‘কে হবে আমার বৌ, দিন-রাত সিআইডি অফিসে পড়ে থাকি, চোর-ডাকাত-কিলারদের পেছনে ঘুুির, স্ত্রীকে সময় দিতে পারবো?’

এবার শব্দ করে হাসলো রাশমিকা।
‘হাসছো কেন? এটাই তো বাস্তব।’

‘তোমার জন্য তোমার পেশার লোকই উপযুক্ত, দু’জন একসাথে কাজ করবে, একসাথে বাসায় ফিরবে, তাহলেই চলবে।’

‘সংসার সামলাবে কে? বাচ্ছা দেখবে কে?’

‘ওমা, বিয়ে না করতেই সংসার, বাচ্ছা নিয়ে ভাবছো, বাহ, বেশ নাটকীয় বিষয় তো?’

‘বিয়ে করলে তো বৌ, বাচ্ছা, সংসার হবেই, এর চেয়ে যতদিন পারি একা থাকি, টেনশন কম থাকবে| আচ্ছা, এবার কাজের কথায় আসি, তুমি বলেছিলে তোমার মাথায় সিরিয়াল কিলারের বিষয়ে ক্লু রয়েছে, বলো আমায় সেটা।’

‘আসলে আমি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে একটা বিষয় জানতে পেরেছি, আমেরিকার শিকাগোতে বসবাস করে মি.

শিশির আলী, বিরাট মাফিয়া গ্যাং, বাংলাদেশের যত মাফিয়া আছে তার কথায় চলে, এমনকি আলী নেওয়াজও।’
‘তো?’

‘আমার মনে হয় বাংলাদেশে যত অঘটন হয়, তার পেছনে শিশির আলীর হাত থাকতে পারে।’

‘তুমি কি শিউর?’

‘আমি একজন প্রফেশনাল, তাই কিছুটা বুঝেশুনেই তোমাকে কথাগুলো বলছি।’

‘আচ্ছা, তাহলে আমরা আমাদের চীফ মি. ইরফানকে বিষয়টা জানাই।’

‘না, এখন না। আগে আমরা সবকিছু খুটিনাটি জেনে নেই, শতভাগ শিউর হয়েই ওনাকে বিষয়টা জানাবো।’

ঠিক সেই সময়েই ইরফান দেখলো দরজা দিয়ে তার মা মরিয়াম বেগম প্রবেশ করলেন। তিনি আসতেই ইমতিয়াজ উঠে মাকে সালাম জানিয়ে পাশে বসালো। মা বললো, ‘বাবা, তোমার কাছে একটা জরুরি বিষয়ে কথা বলতে এসেছি্’
‘বলো, মা।’

‘আসলে আমার জায়গাগুলো আমি বিক্রয় করে দিতে চাই, তুমি কি কিনে রাখবে?’

‘কথাটা শুনে ইমতিয়াজ হতবাক হয়ে গেলো, একি? নিজের মা, যাকে রোজগার করার শুরু থেকেই সে টাকা পয়সা ও খেদমত করে আসছে, আজ সে-ই কিনা তার কাছেই সম্পত্তি বিক্রয় করার জন্য এসেছে। হায় কপাল।

ইমতিয়াজকে চুপ থাকতে দেখে মরিয়াম বেগম প্রশ্ন করলেন, ‘বাবা তোমার কী হয়েছে? কথা বলছো না কেন?’
‘মা, তুমি না খেয়ে আছো? তাহলে জায়গা বিক্রয় করবে কেন?’

মা নিরুত্তর, ইমতিয়াজ বললো, ‘আমি তো তোমাকে আমার সাধ্যমতো টাকা দিচ্ছি, তাহলে জমিজমা বিক্রয় করার কি দরকার?’

রাশমিকা দেখলো ইমতিয়াজ ধীরে ধীরে কঠিন অবস্থায় চলে যাচ্ছে, তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইমতিয়াজকে বললো, ‘আসলে মা হয়তো কোনো বিপদে পড়েছে, তাই জমি বিক্রয় করতে চাইছে।’

‘কিসের বিপদ? আমাকে বললেই তো হয়, আমি সেটা সমাধান করে দিতে পারি, তাই বলে বাবার স্মৃতিময় বাড়ির জায়গাটা বিক্রয় করে দিতে হবে?’

মা কথাটা শুনে আর বসলো না, সে উঠে চলে গেলো। পেছন থেকে ইমতিয়াজ ডাকলো, ‘মা, মা, চলে যেওনা, কথা শোনো|’ কিন্তু মা আর কথা শুনলো না, বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো।

রাশমিকা বললো, ‘তুমি মাকে সান্ত্বনা দিতে পারতে, কৌশল করে কথা বলতে পারতে, তাহলে তো এমন করতো না।’

ইমতিয়াজ উত্তর দিবে, বুঝতে পারছে না, তার শুধু মনে হচ্ছে এর মধ্যে কোনো কূটচাল আছে কারও, তা না হলে মা এই বৃদ্ধ বয়সে জায়গা জমি বিক্রয় করতে চাইবে কেন?

ইমতিয়াজ ভাবছে, এ সময় রাশমিকা উঠে দাঁড়ালো। তারপর বললো, ‘ইমতিয়াজ শোন আপনজনদের এসব টেনশন, যন্ত্রণা মাথায় নিওনা, আমি আছি তোমার পাশে, চলো আমরা বাইরে বেরোই, তারপর একটা ভালো হোটেলে বসে রাতের ডিনার সেরে মুক্ত বাতাসে কিছুটা সময় কাটাই, মনের ভেতরের সমস্ত টেনশন চলে যাবে।’

এই বলে রাশমিকা তার হাতটা ইমতিয়াজের দিকে বাড়িয়ে দিলো, এতোদিন পর ইমতিয়াজের মনে হলো তার কষ্টময় অন্তরের দুঃখের ভাগ বসাতে কেউ তাকে টেনে তুলতে চাইছে। সে ধীরে ধীরে রাশমিকার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরলো, অনুভব করলো ভালোবাসার উষ্ণতা আছে এর মধ্যে।

ঠিক সেই সময়েই বাইরে একটা বজ্রপাত হলো, বিশাল শব্দ। কিন্তু দু’জনের মধ্যে ভয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না, দু’জন দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে রহস্যময় হাসি নিয়ে।

নীরবতা ভেঙ্গে ইমতিয়াজ বললো, ‘হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক, আসলে শত্রুরা আঘাত করে সামনের দিক থেকে, বিপদগামী ঈর্ষান্বিত বন্ধুরা আঘাত করে পেছন থেকে আর আপনজনরা আঘাত করে সামনের দিক থেকে ঠিক হৃদয় বরাবর| যা খুবই কষ্টের, বেদনাদায়ক।’ (চলবে)

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ২য় পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৩য় পর্ব

প্রকাশিত : সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy