ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ৩য় পর্ব

পর্ব : তিন.

লেখক : মিজানুর রহমান রানা

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) চিরকুটে লেখা: “七个”| ইমতিয়াজ গুগল করলো — মানে ‘সাত’|

রাশমিকা ফিসফিস করে বলে, ‘স্যার, গত সাত দিনে সাতটা খুন… এটা ৭ নম্বার ছিল| তার মানে আরও হবে?’

ইরফান জানালা দিয়ে তাকালো| রাস্তায় কালো কোটওয়ালা লোকটা আঙুল দিয়ে আকাশে কিছু আঁকছে| “八” — আট|

ইরফান তার দিকে তাকিয়েই আছে| সে বুঝতে পারছে না আসলে লোকটা কী আসলেই কিলার নাকি সে তাদেরকে তথ্য দিচ্ছে?

অফিসের বোর্ডে তিনটা ভিকটিমের ছবি| লাল সুতা দিয়ে কানেকশন টানার চেষ্টা করছে অনন্যা| তারপর ভালোভাবে দেখেশুনে ইরফানকে বললো, ‘স্যার, এরা কেউ কাউকে চেনে না| স্কুল আলাদা, বাসা আলাদা|’

ইরফান বললো, ‘মিলটা চোখে পড়ার মতো না| খুনি চায় আমরা মিল খুঁজে না পাই| তোমরা অমিল খোঁজো|’

অনন্যা ইনভেস্টিগেশন মেথড, জিও-প্রোফাইলিং শুরু করলো| তিনটা ক্রাইম সিন ম্যাপে ফেলে খুনির কমফোর্ট জোন বের করার চেষ্টা করতে শুরু করে|

রাতে ক্লান্ত শরীরে ইরফান বাসায় আসে| তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে| ভাবতে থাকে এই পৃথিবীতে মানুষ কত ধরনের হতে পারে| কেউ অপরাধ করে আর কেউ কেউ সেই অপরাধগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্যে দিন-রাত পরিশ্রম করে|

এ সময় গৃহকর্মী সায়লা এসে বললো, ‘স্যার, ডিনার রেডি, এখন খাবেন?’

ইরফান উঠলো, হাতমুখ ধুয়ে ডিনারে বসলো, পাশে সুন্দরী সায়লা দাঁড়িয়ে আছে|

হঠাৎ করেই কলিংবেলের আওয়াজ হলো, সায়লা গিয়ে দরজা খুলতেই অ্যাডভোকেট শাওন বাসায় প্রবেশ করলো| তারপর ডায়নিংয়ে আসতেই তাকে দেখে ইরফান উঠে দাঁড়ালো| প্রশ্ন করলো, ‘শাওন রাতের খাবার খাবে?’

‘না|’ গম্ভীর ভাবে শাওন বললো, ‘ভাইয়া তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই|’

‘বলো, আমি উত্তর দিবো|’

‘আচ্ছা, তুমি এতো স্বার্থপর কেন?’ প্রশ্ন করলো ছোট ভাই অ্যাডভোকেট শাওন|

কথাটা শুনে ইরফান চমকে উঠলো, ‘তারপর প্রশ্ন করলো, আমি কীভাবে  স্বার্থপর হলাম?’
‘তুমি সামনের জায়গাটা বড় আপনার কাছে বিক্রি করে দিয়েছো? তুমি সামনের জায়গাটা কেন নিবে? এটা তোমার স্বার্থপরতা নয়|’

‘কি বলছো এসব তুমি? আমার বাড়ি ˆতরি প্রয়োজনে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে কেনা জায়গাটা বড় বোনের কাছে বিক্রয় করেছি, এটা তো সামনের জায়গা বলা চলে না, এটা তো মাঝের জায়গা| সামনের দামী জায়গাটা তো তুমিই ভাগ করে আমাকে পেছনের কমদামী জায়গাটা দিলে, তারপরও আমাকে স্বার্থপর বলছো? তোমাকে যে ছোটকাল থেকে আমি হাজারো সহযোগিতা করেছি, দেশের বাইরে থাকতে মাকে প্রতি মাসে মাসে টাকা পাঠিয়েছি, তোমাকে তৎকালীন সময় চাকুরির জন্য ত্রিশ হাজার টাকা দিয়েছি, বাবার বিল্ডিংটার অংশ রাখতে বড় দু’ভাইকে সেই সময় দশ হাজার টাকা দিয়ে ঘরটা মেরামত করে দিয়েছি, বাথরুম ˆতরি করে দিয়েছি, তোমার বিপদের সময় সহযোগিতা করেছি এগুলো কি স্বার্থপরতা?’

শাওন বলতে লাগলো, ‘হ্যাঁ, এগুলো সবই স্বার্থপরতা, আমিও তো তোমার জন্য অনেক করেছি|’

‘হ্যাঁ, করেছো, সেটা আমি অ¯^ীকার করছি না, কিন্তু তুমি কোটিপতি হয়ে আমাকে সাহায্য করেছি, আর আমি সামান্য কিছুটাকা ইনকাম করেই তোমার দুঃসময়ে তোমাকে সহযোগিতা করেছি, বাবার কাছ থেকে তোমার নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি, আজ তুমি কোর্টের ওকালতি করতে আমার কাছে এসেছো? এখানে কোর্ট বসিয়েছো আমাকে স্বার্থপর হিসেবে প্রমাণিত করতে?’

শাওন অনেক কথা বললো, কিন্তু ইরফান ভাবতে লাগলো, ‘তার এই ছোট ভাইটিকে সে ছোটকাল থেকেই আগলিয়ে রেখেছে, বাবা বলেছিলেন তাকে দেখে রাখতে সেও তাই করেছে সামর্থ অনুসারে কিন্তু আজ তার মুখে যা শুনতে পেলো, তাতে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো|

ইরফান ভাবে মানুষ নিজেই স্বার্থপর পংকিলতায় ডুবে থাকে, আর অন্যকে দোষ দেয়, আসলে অন্যের উপকার করলে এমনই হয়| তারপরও নিঃস্বার্থ  উপকার করে যায় কিছু কিছু মানুষ|

ইরফানের বুকটা ফেটে যাচ্ছে, চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ঠিক এই সময়ই অনন্যার কল এলো| রিসিভ করতেই সে বললো, ‘আজ কয়েকদিন যাবত সিরিয়াল কিলারের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমারও মন ভালো যাচ্ছে না, আমার মনে হয় আমরা একটু সাগর পাড়ে ঘুরে আসতে পারি রাতের বেলা, চাঁদের আলোর জোছনায় আমরা মনটাকে পৃথিবীর সকল দুঃখ থেকে অবসর দিতে পারি?’

চোখ মুছলো ইরফান তারপর উত্তর দিলো, ‘সেটাই ভালো| আমি একজন স্বার্থপর মানুষ, আমাকে তাই করতে হবে| কোলাহল থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজকে সান্ত্বনার সাগরে ডুবিয়ে দিতে হবে| তুমি রেডি থাকো, আমি আসছি|’

রাত প্রায় ১২টা বাজে| ইরফান ও অনন্যা সী-বীচে একটা হেলান দেওয়া সীটে পাশাপাশি বসে আছে| সাগরের উন্মাতাল ঢেউ কাছাকাছি এসে আছড়ে পড়ছে|

অনন্যা বললো, ‘আজ সাগর খুব অশান্ত, ঢেউগুলো দূর থেকে আমাদের কাছাকাছি চলে আসছে|’

‘হ্যাঁ, আমার মনটাও আজ অশান্ত, প্রিয়জনদের কটু কথাগুলো আমার অন্তর ভেদ করে রক্তের সাথে মিশে গিয়েছে| এই অশান্ত ঢেউ আমার মনেরই প্রতিফলন|’

‘জীবনের পথে মাঝে মাঝে এমন হবেই, এগুলো আল্লাহর পরীক্ষা, আল্লাহ মানুষকে সুখ-দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন, তারপর পরীক্ষায় পাস হলেই জীবনের সার্থকতা|’

ইরফান কথাটা শুনে অনন্যার মুখোমুখি হলো, অনন্যার দু’চোখ ভেজা, অশ্রু টলমল করছে|

ইরফান প্রশ্ন করলো, ‘কী হয়েছে তোমার? কাঁদছো কেন?’

এবার অনন্যা হেসে উঠলো, তারপর বললো, ‘তোমার দুঃখে কাঁদছিলাম, কিন্তু দেখলাম কান্নাই জীবনের শেষ কথা নয়| সুখের পরই সুখ আছে, সেজন্য হেসে দিলাম|’

ঠিক সেই সময়েই কালো কোট পরা লোকটি অন্ধকারের মাঝ থেকে উদয় হলো| সে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে, সমুদ্রের ঢেউগুলো তার পায়ে আছড়ে পড়ছে|

অনন্যা বললো, ‘আসলে এই লোকটিকে প্রায়ই রাস্তাঘাটে দেখি, অদ্ভুত একটা লোক| আমার মনে তাকে নিয়ে সন্দেহ আছে, সিরিয়াল কিলার কি এই লোকটাই হতে পারে?’

‘আমরা তাকে পর্যবেক্ষণে রাখবো, শুনেছি লোকটা স্কুল কলেজের পাশে গিয়ে মেয়েদের সাথে কথা বলে| সজল একথা আমাকে জানিয়েছে| তাই সজলকে লোকটিকে সব সময় অনুসরণ করতে বলেছি, তবে এ পর্যন্ত তাকে কাউকে অপহরণ করতে দেখেনি, তাই আমরা তাকে ধরতেও পারছি না|’ (চলবে)

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ১ম পর্ব

আরও পড়ুন :  ক্রাইম থ্রিলার- অদৃশ্য আততায়ী : ২য় পর্ব

 

প্রকাশিত : সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy