বর্ষার আগমনে ঐতিহ্যবাহী তিশিখালী মাঝার ভক্ত আসেকানে মুখরিত

সিরাজগঞ্জ তাড়াশ থেকে জিল্লুর রহমান

দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যবাহী চলনবিল বর্ষার আগমনে রূপের ডালি সাজিয়ে বসেছে। বিলের বুকে নতুন পানি প্রবেশ করতে না করতেই দেশ-বিদেশের পর্যটক, দর্শনার্থী এবং ভক্ত-আশেকানদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চলনবিলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ—ঐতিহাসিক তিশীখালী পীর ঘাসী দেওয়ান (রহ.)-এর মাজার যা অবস্থিত তাড়াশ গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলা নিয়ে বিশাল এই মাজার শরিফ চলনবিলের সৌন্দর্য

গত শুক্রবার (৩ জুলাই) বেলা ১১টায় সরেজমিনে মাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। মাজারের ঘাটে সারি সারি বাঁধা রয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় নৌকা ও ট্রলার। মাজার চত্বরে দর্শনার্থীদের তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লোকসমাগম বাড়ায় প্রাণ ফিরে এসেছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। খাবার, খেলনা ও প্রসাধন সামগ্রীর দোকানগুলোতে চলছে জমজমাট বেচাকেনা।

মাজার প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত স্থানে ভক্তদের ছোট-বড় দলে বিভক্ত হয়ে চুলা জ্বালিয়ে রান্না করতে দেখা গেছে। মানত পূরণ করতে আসা এসব মানুষের কেউ এনেছেন খাসি, কেউবা মোরগ-মুরগি।

রাজশাহীর পবা উপজেলা থেকে আসা স্কুল শিক্ষক বাবুল হাসান জানান,

“তিন মেয়ের পর ছেলে সন্তান হওয়ায় আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া ও বাবার দরবারে দোয়ার উদ্দেশ্যে মানত করেছিলাম। আজ প্রায় ৫০-৫২ জন মিলে পাবলিক বাস রিজার্ভ করে প্রথমে সিংড়ার সাতপুকুরিয়ায় আসি, তারপর সেখান থেকে ভাড়ার নৌকায় এই মাজারে এসেছি এক জোড়া খাসি নিয়ে।”

একইভাবে বগুড়ার নন্দীগ্রামের ভাটগ্রাম থেকে আসা চামেলি বেগম (৪২) নামের এক নারী ভক্ত জানান, মেয়ের একটি মানত থাকায় তিনি দুটি মোরগ নিয়ে এসেছেন। মাজারেই রান্না (শিন্নি) করে উপস্থিত সবার মাঝে বিতরণ করবেন।

এদিকে বিলের পানি বাড়ার সাথে সাথে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে মুখে হাসি ফুটেছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তিশীখালী মাজারের চানাচুর বিক্রেতা ঝড়ু মিয়া বলেন,

“গত দুই সপ্তাহ ধরেই লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় ভিড় একটু বেশি এবং বেচাকেনাও আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো।”

চায়ের দোকানি চঞ্চল জানান, বিগত চার মাস কোনো বেচাকেনাই ছিল না। এখন প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। বিলের পানি পুরোপুরি বাড়লে বিক্রি আরও জমবে বলে আশা তার।

যাত্রী পারাপারে ব্যস্ত শ্যালো নৌকার মাঝি সুজন আলী জানান, তারা বর্তমানে সাতপুকুরিয়া থেকে তিশীখালী মাজারে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করছেন। অনেকেই আবার সপরিবারে ঘোরার জন্য পুরো নৌকা রিজার্ভ নিচ্ছেন।

সাতপুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম খাঁন এই ঐতিহ্য সম্পর্কে বলেন,

“তিশীখালীর মাজার চলনবিলের একটি ঐতিহাসিক ও অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এখানে সারা বছরই মানুষ জিয়ারতের জন্য আসেন। তবে বর্ষায় বিলের পানি বাড়লে এই সমাগম ও উৎসবের আমেজ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। এবার বিলে পানি কিছুটা ধীর গতিতে বাড়ছে। পুরো বর্ষা শুরু হলে তিশীখালী মাজারের পাশাপাশি সিংড়া পেট্রো বাংলা পয়েন্টের নৌকা ঘাটটিও দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠবে।”

প্রকাশিত : শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ খ্রি
.

You might like

About the Author: priyoshomoy