

ক্ষুদীরাম দাস
আমি একদিন গুমোট শহর ছেড়ে,
পা বাড়িয়েছিলাম নির্জন উপত্যকায়।
যেখানে মেঘেরা এসে ঝাপিয়ে পড়ে পাহাড়ের গায়ে,
আর ঝরনার জল বয়ে চলে অবিরাম ধারায়।
সেখানে দাঁড়িয়ে আমি নিস্তব্ধতা শুষে নিয়েছিলাম,
আর একা একা পাহাড়ের সাথে কথা বলেছিলাম।

বলেছিলাম—ওহে প্রাচীন ও অটল গিরিরাজ,
তোমার এই বিশালতার রহস্য কী আজও?
তুমি কীভাবে সহ্য করো ঝড়ের এত আঘাত?
কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকো মৌন ও অবিচল হয়ে?
পাহাড় তখন তার পাথুরে গলার স্বর তুলল,
বাতাসের শাঁসিয়ে ওঠা সুরে সে আমায় শোনাল—
“শোনো মানব, আমার এই অটলতার গোপন কথা,
তা কোনো জাদু নয়, নয় কোনো অলৌকিক ক্ষমতা।
আমার শক্তি লুকিয়ে আছে মৌন সত্যের মাঝে,
ˆনতিকতার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়া আমার এই সাজে।
আমি লোভের মোহে কখনো দিক বদলাই না,
অহংকারের চোরাবালিতে আমি কখনো পা দিই না।
অন্যায় আর অনৈতিকতার ঝড় যত জোরেই আসুক,
আমি আমার মাথা উঁচু করে সোজা হয়েই থাকি।”
আমি অবাক হয়ে পাহাড়ের কথাগুলো শুনছিলাম,
আমার ভেতরকার চঞ্চল মনটা শান্ত হচ্ছিল।
পাহাড় আবার গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল—
“তোমরা মানুষরা প্রতিনিয়ত নিজেদের পতন ডেকে আনো,
ছোট স্বার্থের টানে নীতি বিসর্জন দিয়ে বসে থাকো।
অসততার পথে হেঁটে তোমরা পাহাড়সম সাফল্য চাও,
কিন্তু ভুলে যাও যে ভিত কাঁচা হলে সবই ভেঙে যায়।
ˆনতিকতা হলো মানুষের জীবনের আসল মেরুদণ্ড,
যা ছাড়া প্রতিটি মানুষই আসলে এক পঙ্গু চণ্ডাল।”
আমি মাথা নিচু করে তার কথাগুলো শুনলাম,
নিজের ভেতরের অপরাধবোধগুলোকে খুঁজে পেলাম
পাহাড় আমাকে শিখাল সততার আসল পাঠ,
যা কোনো স্কুল-কলেজের বইয়ে মেলে না সরাসরি
সে বলল—”ˆধর্য ধরো, ন্যায়ের পথে অবিচল থেকো,
লোভের বশে কখনো অন্যের অধিকারে থাবা দিও না
তোমার কর্ম যেন হয় আলোকের মতো পরিষ্কার,
তোমার মন যেন হয় স্বচ্ছ ঝরনার জলের মতো অপার
অসততার শর্টকাট রাস্তা সাময়িক সুখ দেয় ঠিকই,
কিন্তু পরিণামে তা জীবনকে করে তোলে নরকসমান”
আমি পাহাড়ের সেই বিশাল বুকে হাত রাখলাম,
তার শীতল পাথরে যেন এক প্রাণের স্পন্দন পেলাম
সে আমাকে আরও শেখাল সহনশীলতার মন্ত্র,
কীভাবে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে হয় সর্বাগ্রে
পাহাড় বলল—”আমি তো একা দাঁড়িয়ে থাকি না শুধু,
আমার গায়ে জন্ম নেয় কতশত লতা-পাতা ও ঔষধি গাছ
তারা আমার আশ্রয়ে বেঁচে থাকে, ছায়া পায় ডালপালায়,
আমি তাদের রক্ষা করি ঝড়ের সমস্ত নিষ্ঠুর তাণ্ডবে
তেমনি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ধর্ম,
স্বার্থপরতা ত্যাগ করে ˆনতিকতাই মানুষের শ্রেষ্ঠ কর্ম”
আমি পাহাড়ের সাথে কথা বলে অনেক কিছু বুঝলাম,
আমার সংকীর্ণ অহংকারগুলো সেদিন ধুয়ে মুছে ফেললাম
বুঝলাম, মানুষের আসল সৌন্দর্য তার বাহ্যিক রূপে নয়,
তার নৈতিক চরিত্র আর সততার মাঝে লুকিয়ে রয়|
পাহাড় মৌন থেকেও কত কথা শিখিয়ে দেয় নিঃশব্দে,
যা কোটি কোটি পুঁথিগত বিদ্যাও পারে না দিতে সহজে
আজও যখন শহরের কোলাহলে হাঁপিয়ে উঠি আমি,
তখন ওই দূর পাহাড়ের মূর্ত প্রতীকটাকে মনে টানি
তার সেই অটল নীতি আর সততার কথা মনে পড়ে,
আমার বিপথগামী মনটা আবার সঠিক পথে ফিরে আসে
পাহাড়ের সাথে সেই কথপোকথন আজও আমার সম্বল,
যা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে বাঁচতে হয় সৎ ও সবল
নৈতিকতার আলোয় জীবনকে রাঙিয়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে,
আমি আজও বেঁচে আছি পাহাড়ের সেই শিক্ষা হৃদয়ে নিয়ে।
প্রকাশিত : সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬















