

ফিচার প্রতিবেদক :
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন সম্প্রতি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “জুলাই জাদুঘর অবশেষে ৫ তারিখেই উদ্বোধন হচ্ছে। ইউনুস আর এন সি পি উদ্বোধন করে দিয়ে যেতে পারে নাই শুধু লুটপাট করেছে। জুলাই জাদুঘরের ব্যায় দেখিয়ে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে ইউনুস-আসিফ নজরুল গং! এই টাকা কার পকেটে কত গিয়েছে তার হিসেব চাই।”

এই একটি পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল হয়। কারণ এর মধ্যে তিনটি বিস্ফোরক দাবি আছে – উদ্বোধনের তারিখ নিয়ে নাটক, ১৩০ কোটি টাকা লুটপাট, এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও আসিফ নজরুলের সরাসরি জড়িত থাকা। চলুন ফ্যাক্ট, ডকুমেন্ট এবং অফিসিয়াল বক্তব্য থেকে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করা যাক।
১. ৫ তারিখে উদ্বোধন – দাবিটি আংশিক সত্য
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে ৫ আগস্ট তারিখটি প্রথম থেকেই আলোচনায় ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার দীর্ঘদিনের বাসভবন গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গণভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ৫ আগস্ট উদ্বোধন হবে। তিনি তখনই পরিষ্কার করেন, জাদুঘরের বেশ কিছু কাজ এখনো বাকি, তাই ৫ আগস্ট জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে না।
অর্থাৎ ৫ আগস্ট উদ্বোধনের পরিকল্পনা অন্তর্বর্তী সরকারেরই ছিল। এটি নতুন কিছু নয়।
তবে বাস্তবে সেই উদ্বোধন সময়মতো হয়নি। ২০২৬ সালে এসে বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, জাদুঘরটি ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা যায়নি, জনবল নিয়োগ ও অন্যান্য প্রস্তুতি বাকি থাকায়। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ আগস্ট জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে প্রস্তুতি চলছে।
তাই ইলিয়াস হোসাইনের প্রথম লাইন – “অবশেষে ৫ তারিখেই উদ্বোধন হচ্ছে” – এটি বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মিলে যায়, কিন্তু “ইউনূস আর এনসিপি উদ্বোধন করে দিয়ে যেতে পারে নাই” – এই অংশটি সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটকে ইঙ্গিত করে, যা প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার একটি অংশ।
২. ১৩০ কোটি টাকার অংকটি কোথা থেকে এলো?
এটাই সবচেয়ে আলোচিত অংশ। ১৩০ কোটি টাকা কি লুটপাট হয়েছে, নাকি এটাই প্রকল্পের বৈধ খরচ?
সরকারি তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজেই একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের দুর্নীতির প্রতিবেদনকে ‘ডিসইনফরমেশন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, প্রকল্পে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নয়ছয়ের দাবি সঠিক নয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে ৯৬ কোটি টাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে অবকাঠামোগত কাজে ব্যয় করা হয়েছে।
অর্থাৎ ১৩০ কোটি টাকা “তুলে নেওয়া” হয়নি, এটি সরকারি হিসাবে দেখানো মোট ব্যয়।
আরেকটি অফিসিয়াল হিসাব দিয়েছেন জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। তার ভাষ্যমতে, পূর্ত ও জাতীয় জাদুঘরের জন্য মোট ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও খরচ হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং দুটি হিসাব থেকেই দেখা যাচ্ছে, ১১০-১৩০ কোটি টাকার মধ্যেই পুরো খরচ সীমাবদ্ধ এবং একটি অংশ ফেরতও গেছে। “১৩০ কোটি তুলে নেওয়া”র দাবির সাথে সরকারি ব্যয় বিবরণী মেলে না।
৩. তাহলে দুর্নীতির অভিযোগ কি একেবারেই ভিত্তিহীন?
না, প্রশ্ন তোলার জায়গা আছে, কিন্তু সেটা ভিন্ন জায়গায়।
মূল বিতর্কটা টাকা চুরির চেয়ে “কীভাবে খরচ করা হলো” তা নিয়ে।
গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরে ১১১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (DPM), কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই। এই কাজ পায় মেসার্স শুভ্রা ট্রেডার্স ও দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
এই পদ্ধতি নিয়েই আপত্তি তোলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবি বলছে, এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক এবং পূর্ত খাতের প্রায় ১১১ কোটি টাকার কাজ দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, নিয়মিত এই ক্রয়ের জন্য কেন সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে?
সরকারের যুক্তি ছিল, ৫ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে বলে দ্রুততার জন্য DPM করা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু টিআইবি বলছে, জুলাই জাদুঘর কোনো বিশেষায়িত ক্রয় নয়, তাই এখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়ানো স্বচ্ছতার লঙ্ঘন।
এছাড়া ডকুমেন্টারি নির্মাণে ২৭ লাখ টাকা প্রতি ডকুমেন্টারি, ভাস্কর্যে অতিরিক্ত ব্যয়, ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানা নিয়ে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয়েছে। ফারুকী সেগুলোও অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন প্রতিটি ডকুমেন্টারিতে ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ের দাবি সত্য নয়।
৪. ইউনূস-আসিফ নজরুল গং টাকা পকেটে নিয়েছে – প্রমাণ আছে কি?
এটিই ইলিয়াস হোসাইনের পোস্টের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই দাবির পক্ষে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অডিট রিপোর্ট, দুদকের মামলা বা নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি।
যা আছে তা হলো:
১. সরকারি বরাদ্দের একটি বড় অংশ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে খরচ হয়েছে, যার নিজস্ব অডিট ব্যবস্থা আছে।
২. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় জাদুঘরের মাধ্যমে বাকি অর্থ ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়েছে এবং অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার রেকর্ড আছে।
৩. টিআইবির উদ্বেগ সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ নয়, বরং প্রক্রিয়াগত ঝুঁকির সতর্কবার্তা।
অন্যদিকে, গণভবনের ১৭.৬৮ একর জায়গায় প্রায় আড়াই হাজার ডামি কবর, প্রতীকী আয়নাঘর, রিকশাচালক সুজন খানের ভাস্কর্য, গুম-নির্যাতনের গ্যালারি, ১৯টি বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনায় ৬২টি তথ্যচিত্র নির্মাণ – এগুলো বাস্তবে নির্মিত হয়েছে, যা দর্শনার্থীরা দেখতে পাচ্ছেন। অর্থাৎ টাকা কাগজে-কলমে নয়, ভৌত অবকাঠামোতেও রূপান্তরিত হয়েছে।
তাই “কার পকেটে কত গিয়েছে” – এই প্রশ্নটি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও আইনগতভাবে প্রমাণ করতে হলে প্রয়োজন ফরেনসিক অডিট, যা এখনো হয়নি।
আবেগ বনাম হিসাব
জুলাই জাদুঘর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলোর একটি। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি নিয়ে কোনো বিতর্ক মানুষকে আহত করে।
ফ্যাক্ট চেকের সারসংক্ষেপ হলো:
৫ আগস্ট উদ্বোধনের তারিখটি অন্তর্বর্তী সরকারেরই ঘোষিত ছিল, নতুন সরকার এসে সেটি বাস্তবায়ন করছে – এটি সত্য।
১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের অংকটি সরকারি হিসাবেই স্বীকৃত, কিন্তু এটি “তুলে নেওয়া” বা লুটপাটের প্রমাণ নয়, এটি ঘোষিত ব্যয়।
১১১ কোটি টাকার কাজ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দেওয়া নিয়ে টিআইবির বৈধ উদ্বেগ আছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কিন্তু সরাসরি পকেটে যাওয়ার প্রমাণ দেয় না।
ড. ইউনূস ও আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগতভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ এখনো অভিযোগ পর্যায়েই আছে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত নয়।
একজন সাংবাদিক হিসেবে ইলিয়াস হোসাইনের প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে, এবং “হিসাব চাই” বলাটা গণতান্ত্রিক সমাজে জরুরি। কিন্তু হিসাব চাওয়ার সাথে “লুটপাট করেছে” বলে রায় দিয়ে দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। জুলাই জাদুঘরের প্রকৃত হিসাবের জন্য এখন প্রয়োজন একটি স্বাধীন অডিট রিপোর্ট প্রকাশ, যেখানে ৯৬ কোটি টাকার পূর্ত কাজ, ডকুমেন্টারির প্রকৃত বাজারদর এবং DPM-এ নির্বাচিত দুটি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান – সবকিছুই জনসমক্ষে আসবে। তখনই বোঝা যাবে, ১৩০ কোটি টাকা স্মৃতি সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে, নাকি সত্যিই কারো পকেটে গেছে।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬















