কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক এবং আল্লাহর পরীক্ষা

ভূমিকা
মানব জীবন কখনোই একরৈখিক সুখের নয়। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সুস্থতা-অসুস্থতা, প্রাচুর্য-দারিদ্র্য—এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ইসলামের দৃষ্টিতে এই দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক কোনো অর্থহীন ঘটনা নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই আল্লাহ বান্দার ঈমান যাচাই করেন, গুনাহ মোচন করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও প্রাণের ক্ষতি ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
— সূরা বাকারা : ১৫৫

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, মুমিনের জীবনে বিপদ-আপদ আসবেই। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই বিপদকে কিভাবে দেখব এবং কিভাবে মোকাবিলা করব।

১. পরীক্ষা কেন? আল্লাহ কেন বান্দাকে কষ্ট দেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ দয়ালু হলে কেন কষ্ট দেন? কোরআন ও হাদীসে এর ৫টি প্রধান হিকমত বা কারণ উল্লেখ আছে:

ক) ঈমানের পরীক্ষা: কে সত্যিকারের মুমিন আর কে মুখে মুখে মুমিন, তা যাচাই করার জন্য।

“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?”
— সূরা আনকাবুত : ২

খ) গুনাহ মোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধি: প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ বান্দার গুনাহ ঝরিয়ে দেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “মুমিনের যে কোনো কষ্ট, দুঃখ, রোগ, উদ্বেগ, এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও, এর দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।”
— সহীহ বুখারী : ৫৬৪১, সহীহ মুসলিম : ২৫৭৩

অন্য হাদীসে আছে, “বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে একটি মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যেখানে সে নিজের আমল দিয়ে পৌঁছাতে পারে না। তখন আল্লাহ তাকে শারীরিক বা সম্পদের বা সন্তানের বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন এবং তাকে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দেন, যাতে সে সেই মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে।”
— সুনানে আবু দাউদ : ৩০৯০, সহীহ

গ) আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা: সুখের সময় মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায়। দুঃখ মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।

“আর যখন মানুষকে কোনো বিপদ স্পর্শ করে, তখন সে শুয়ে, বসে ও দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকতে থাকে।”
— সূরা ইউনুস : ১২

ঘ) দুনিয়ার প্রতি মোহ কমানো: দুনিয়া মুমিনের জন্য চিরস্থায়ী নয়। কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দেন দুনিয়া তুচ্ছ।

ঙ) পরকালের পুরস্কারের জন্য প্রস্তুত করা: দুনিয়ার সামান্য কষ্টের বিনিময়ে আখেরাতে বিশাল প্রতিদান।

২. কোরআনের আলোকে দুঃখ-কষ্ট ও রোগ-শোক
ক) রোগ-শোক আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে এবং তিনিই আরোগ্য দেন:
হযরত ইবরাহীম (আ.) এর দোয়া কোরআনে এভাবে এসেছে—

“যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”
— সূরা শুআরা : ৮০

অর্থাৎ রোগ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই আল্লাহর হাতে। তাই রোগীর প্রথম কাজ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে আল্লাহর কাছে আরোগ্য চাওয়া।

খ) ধৈর্যশীলদের জন্য মহাপুরস্কার:
কোরআনে ধৈর্যের আলোচনা প্রায় ৯০ জায়গায় এসেছে।

“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়া।”
— সূরা যুমার : ১০

“যারা বিপদে পড়ে বলে— ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব)। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে রহমত ও অনুগ্রহ বর্ষিত হয়।”
— সূরা বাকারা : ১৫৬-১৫৭

এই আয়াতটি বিপদের সময় পড়া সুন্নত। এর অর্থ অনেক গভীর। আমরা আল্লাহর, আমাদের শরীর, সম্পদ, সন্তান সবই আল্লাহর আমানত। তিনি নিয়ে গেলে আমাদের অভিযোগ করার অধিকার নেই।

গ) নবীদের জীবন ছিল সবচেয়ে বেশি পরীক্ষায় ভরা:

আইয়্যুব (আ.) এর পরীক্ষা: ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেছেন, সম্পদ, সন্তান সব হারিয়েছেন। কিন্তু কখনো আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করেননি। তিনি বলেছিলেন—
“আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে এবং তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।”
— সূরা আম্বিয়া : ৮৩

আল্লাহ তার ধৈর্যের কারণে তাকে দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ইয়াকুব (আ.) এর শোক: পুত্র ইউসুফ (আ.) কে হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এটি পিতার শোকের বৈধতা প্রমাণ করে।
৩. সহীহ হাদীসের আলোকে দুঃখ-কষ্ট ও রোগের ফজিলত
১. জ্বর ও সামান্য রোগও গুনাহ মোচন করে:
রাসূল (সা.) বলেছেন, “জ্বরকে গালি দিও না। কেননা জ্বর বনী আদমের গুনাহসমূহকে দূর করে দেয়, যেমনভাবে কামারের হাপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়।”
— সহীহ মুসলিম : ২৫৭৫

২. সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হন নবীগণ, তারপর নেককারগণ:
এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপদগ্রস্ত কে? তিনি বললেন, “নবীগণ, তারপর যারা তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী, তারপর যারা তাদের নিকটবর্তী। মানুষকে তার দ্বীন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি সে দ্বীনে শক্ত হয়, তবে তার পরীক্ষা কঠিন হয়।”
— সুনানে তিরমিযী : ২৩৯৮, সহীহ

তাই যদি আপনার জীবনে বিপদ বেশি আসে, বুঝবেন আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন এবং আপনার ঈমান শক্তিশালী।

৩. রোগীর দোয়া ফেরেশতার দোয়ার মতো:
রাসূল (সা.) বলেছেন, “যখন তুমি কোনো রোগীকে দেখতে যাও, তখন তার কাছে নিজের জন্য দোয়া চাও। কেননা রোগীর দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতো।”
— সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৪১

৪. রোগে মৃত্যু শাহাদাত:
কিছু রোগে মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, “পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ, প্লেগ রোগে মৃত ব্যক্তি শহীদ…”
— সহীহ বুখারী : ৬৫৩, মুসলিম : ১৯১৪

৫. মানসিক কষ্টের জন্যও সওয়াব:
দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, ডিপ্রেশন—এগুলোকেও হাদীসে গুনাহ মোচনের কারণ বলা হয়েছে। আজকের যুগে মানসিক রোগ অনেক বেশি। এর জন্যও ধৈর্য ধরলে সওয়াব।

৪. দুঃখ-কষ্টে মুমিনের করণীয় : কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ৭টি আমল
১. ধৈর্য (সবর) ধারণ করা: ধৈর্য মানে হা-হুতাশ না করা, আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা। কান্না করা বৈধ, কিন্তু বিলাপ করে, জামা ছিঁড়ে, আল্লাহকে দোষারোপ করা হারাম।

২. সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া:

“হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।”
— সূরা বাকারা : ১৫৩

বিপদে পড়লেই রাসূল (সা.) সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। — আবু দাউদ : ১৩১৯

বিপদের দোয়া: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মা আজুরনী ফি মুসিবাতী ওয়া আখলিফ লী খাইরাম মিনহা” (হে আল্লাহ, আমাকে এই বিপদে সওয়াব দাও এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে এর প্রতিদান দাও) — মুসলিম : ৯১৮

৩. তাওবা ও ইস্তিগফার বাড়িয়ে দেওয়া: অনেক সময় আমাদের গুনাহের কারণে বিপদ আসে। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করা।

“যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন।”
— আবু দাউদ : ১৫১৮

৪. চিকিৎসা গ্রহণ করা: ইসলাম তাওয়াক্কুলের সাথে সাথে চিকিৎসাকেও উৎসাহিত করে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার নিরাময় সৃষ্টি করেননি।”
— তিরমিযী : ২০৩৮, সহীহ

৫. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া:

“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”
— সূরা যুমার : ৫৩

আত্মহত্যা ইসলামে মহাপাপ। কারণ এটি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার চূড়ান্ত রূপ। কষ্ট যত বড়ই হোক, আল্লাহর দয়া তার চেয়ে অনেক বড়।

৬. সদকা করা: সদকা বিপদ দূর করে। রাসূল (সা.) বলেন, “সদকা অবশ্যই বালা-মুসিবত দূর করে দেয়।” — তিরমিযী

৭. ভালো ধারণা রাখা: আল্লাহ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে যে, এই কষ্টের পেছনে অবশ্যই কল্যাণ আছে। হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “আমি বান্দার ধারণা অনুযায়ী থাকি।”

৫. কষ্টের পরেই আছে স্বস্তি
কোরআনের সবচেয়ে আশাবাদী আয়াতগুলোর একটি—

“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।”
— সূরা ইনশিরাহ : ৫-৬

আল্লাহ একবার কষ্টের কথা বলে দুইবার স্বস্তির কথা বলেছেন। অর্থাৎ একটি কষ্টের সাথে দুটি স্বস্তি আসবে। তাই অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোর তত কাছে আসে।

উপসংহার
দুঃখ, কষ্ট, রোগ, শোক মুমিনের জীবনের অংশ। এগুলো অভিশাপ নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের পাপ মোচন করেন, আমাদেরকে তাঁর আরো কাছে টেনে নেন এবং জান্নাতে আমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

আমাদের কাজ হলো—অভিযোগ না করে ধৈর্য ধরা, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া, হালাল চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। যে বান্দা বিপদে ধৈর্য ধরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বিনা হিসাবে জান্নাত দান করবেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের দুঃখ-কষ্টগুলোকে গুনাহ মাফের ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ বানিয়ে দিন। আমীন।

প্রকাশিত :  ‍শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

You might like