পবিত্র প্রেমের আশ্রয় : ক্ষুদীরাম দাস

১ম অধ্যায়:
শীতকালের কুয়াশাচ্ছন্ন একটি রবিবার সকালে গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠছিল। সেন্ট মেরিন চার্চের প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড় জমেছিল। ডেভিড ও গ্যাব্রিয়েলা সেই চার্চের নিয়মিত প্রার্থনায যোগ দিতে এসেছিল। তাদের সঙ্গে ছিল তাদের সাত বছরের ছোট্ট কন্যাসন্তান অ্যাঞ্জেলিনা। ডেভিড পেশায় একজন চিত্রশিল্পী ছিল এবং গ্যাব্রিয়েলা স্থানীয় একটি স্কুলের সংগীত শিক্ষক ছিল। তাদের জীবনটা বাইরে থেকে খুব সুন্দর দেখালেও ভেতরে ভেতরে কিছু ছোটখাটো দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল।

প্রার্থনা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ডেভিড ও গ্যাব্রিয়েলার মধ্যে একটি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। ডেভিড বলছিল রবিবারের দুপুরের খাবারে পাস্তা তৈরি করতে, আর গ্যাব্রিয়েলা বলছিল স্যুপ বানাতে। এই সামান্য মতের অমিল থেকে ধীরে ধীরে তাদের কণ্ঠে রাগ প্রকাশ পেল। গ্যাব্রিয়েলা কিছুটা অভিমান করে বলল, “তুমি কখনোই আমার পছন্দকে গুরুত্ব দাও না। আমার কথা শুনতেই চাও না।”

ডেভিড একটু রেগে গিয়ে বলল, “সব সময় তোমার পছন্দমতো চলতে হবে কেন? আমারও তো একটা মতামত আছে।”

এই ছোটখাটো কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে গ্যাব্রিয়েলা রাগের মাথায় বলে বসল, “যদি আমার কথা তোমার ভালো না লাগে, তবে আমি অ্যাঞ্জেলিনাকে নিয়ে আমার বাপের বাড়ি চলে যাব। সেখানে গিয়েই শান্তিতে থাকতে পারব।”

অ্যাঞ্জেলিনা তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে বলছিল, “মা-বাবা, তোমরা ঝগড়া করো না প্লিজ।”

ছোট্ট শিশুটির এই আকুতি সেদিন দুজনকেই কিছুটা থামিয়ে দিল। কিন্তু গ্যাব্রিয়েলা তার জেদ ধরে রাখল এবং সত্যি সত্যিই দুদিন পর ব্যাগ গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। সে ভেবেছিল এভাবে চলে গেলে ডেভিড তার মূল্য বুঝতে পারবে এবং সে নিজের ভুল স্বীকার করবে। কিন্তু সে জানত না যে এই রাগের আগুন তাদের সাজানো সংসারটাকে কতটা দুর্বল করে দিচ্ছে।

২য় অধ্যায়
গ্যাব্রিয়েলা যখন বাপের বাড়ি চলে গেল, তখন ডেভিডের জীবনে এক নতুন ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত হলো। ডেভিডের এক দূরসম্পর্কের পরিচিত লুইস ও তার স্ত্রী হেলেন ভেতরে ভেতরে ডেভিডের সম্পত্তি এবং তাদের সাজানো গোছানো জীবনটাকে ঈর্ষার চোখে দেখত। লুইস ও হেলেন সুযোগ বুঝে ডেভিডের কাছে আসতে শুরু করল। তারা ডেভিডকে ভুল বোঝাতে লাগল যে গ্যাব্রিয়েলা তার ওপর অত্যাচার করছে এবং তাকে কোনো সম্মান দিচ্ছে না।

লুইস ডেভিডের কাঁধে হাত রেখে মিহি সুরে বলছিল, “ডেভিড ভাই, তোমার বউয়ের স্বভাব ভালো না। সামান্য কারণে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া মানে তোমাকে অসম্মান করা। তুমি কেন তাকে ফিরিয়ে আনতে যাবে? বরং তাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও। নতুন করে জীবন শুরু করো।”

হেলেনও গ্যাব্রিয়েলার নামে নানা ধরনের কুৎসা রটাতে লাগল। সে ডেভিডকে বলছিল, “যে নারী স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যায়, সে কখনো তোমার ভালো চাইবে না। সে শুধু তোমার টাকা এবং সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করতে চায়।”

ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এই মানুষগুলো ডেভিডের মনে বিষ ঢেলে দিচ্ছিল। ডেভিড তখনো বুঝতে পারছিল না যে লুইস ও হেলেন আসলে তার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী নয়, বরং তার ধ্বংসের কারণ হতে চাইছে। রাগের মাথায় ডেভিড লুইসের কথায় প্রভাবিত হতে শুরু করল। সে ভাবল, গ্যাব্রিয়েলা হয়তো সত্যিই তার যোগ্য নয়। এভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেল। ছোট্ট অ্যাঞ্জেলিনাও তার মাকে ছাড়া খুব কষ্ট পাচ্ছিল। সে প্রতিদিন রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদত এবং বলত, “আমার মা কোথায় গেল? বাবা, মাকে ফিরিয়ে আনো।”

৩য় অধ্যায়
বাপের বাড়িতে বসে গ্যাব্রিয়েলাও শান্তিতে ছিল না। সে যখনই আয়নার সামনে দাঁড়াত, তখনই নিজের ভেতর এক শূন্যতা অনুভব করত। সে বুঝতে পারত যে সামান্য রাগের বশে সে কত বড় ভুল করেছে। তার মা তাকে বুঝিয়ে বলতেন, “মা রে, সংসার কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। স্বামীর বাড়িই একজন নারীর মূল ঠিকানা, যদি সেখানে পারস্পরিক সম্মান থাকে। কিন্তু তাই বলে প্রতিবার সামান্য ঝগড়ায় বাপের বাড়ি চলে আসা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এতে বাইরের মানুষ সুযোগ পায়।”

একদিন গ্যাব্রিয়েলা বাইবেল খুলল এবং সেখানে পড়ল, “প্রেম দীর্ঘসহিষ্ণু, প্রেম দয়া করে… প্রেম অহংকার করে না।” এই বাণী তার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করল। সে কেঁদে ফেলল এবং প্রার্থনা করল, হে প্রভু, আমাকে ক্ষমা করো। আমার অহংকার ও রাগের কারণে আজ আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে বসেছে।

গ্যাব্রিয়েলা সিদ্ধান্ত নিল যে সে আর বসে থাকবে না। সে তার জেদ ও রাগ বিসর্জন দিয়ে নিজের স্বামীর ঘরে ফিরে যাবে। সে বুঝতে পেরেছিল যে সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে দুজনকেই ছাড় দিতে হয়। কেউ ছোট বা বড় হয় না।

৪র্থ অধ্যায়
এদিকে লুইস ও ডেভিডের জীবনে এক বিশাল বিপর্যয় নেমে এল। লুইস যে ভেতর ভেতরে ডেভিডের সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য এক জালিয়াতির জাল বুনেছিল, তা একদিন প্রকাশ পেয়ে গেল। লুইস কিছু জাল দলিলপত্র তৈরি করে ডেভিডের স্বাক্ষর জাল করতে চেয়েছিল, যাতে বাড়ি ও স্টুডিওটি লুইসের দখলে চলে যায়। কিন্তু একজন বিশ্বস্ত প্রতিবেশী সব কিছু দেখে ফেলেছিল এবং সে ডেভিডকে সতর্ক করে দিল।

ডেভিড যখন সমস্ত সত্য জানতে পারল, তখন তার চোখ খুলে গেল। সে বুঝতে পারল লুইস ও হেলেন কত বড় শত্রু ছিল। তারা বন্ধুত্বের মুখোশ পরে তার সর্বনাশ করতে চেয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে লুইস ও হেলেনের জীবনে নেমে এল এক করুণ পরিণতি। পুলিশ এসে লুইসকে জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করল। তাদের মিথ্যা অহংকার ও লোভ তাদের জীবনে এমন এক অন্ধকার নিয়ে এল যে সমাজেও তাদের কোনো মুখ রইল না। হেলেনও নিঃস্ব হয়ে গেল এবং কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এল না। ক্ষতি করার মানুষগুলোর জীবন ধ্বংস হয়ে গেল তাদের নিজেদের কুটিলতার কারণে।

৫ম অধ্যায়
লুইসের আসল রূপ দেখার পর ডেভিড গভীরভাবে অনুতপ্ত হলো। সে বুঝতে পারল গ্যাব্রিয়েলা তাকে কতটা ভালোবাসত আর সে নিজে বাইরের মানুষের কথায় কতটা ভুল পথে চালিত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে গ্যাব্রিয়েলা তার ছোট্ট মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনাকে নিয়ে ঘরে ফিরে এল।

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে ডেভিড দরজা খুলে দেখল গ্যাব্রিয়েলা দাঁড়িয়ে আছে। গ্যাব্রিয়েলার চোখে জল ছিল। সে ডেভিডের বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল এবং বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দাও ডেভিড। আমি আমার রাগের কারণে আমাদের এই সুন্দর সংসারটাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিলাম।”

ডেভিড গ্যাব্রিয়েলাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “না গ্যাব্রিয়েলা, আমারও ভুল ছিল। আমি বাইরের মানুষের কথায় কান দিয়ে তোমার অভিমান বুঝতে পারিনি। এসো, আমরা সব ভুলে আবার নতুন করে শুরু করি।”

অ্যাঞ্জেলিনাও দৌড়ে এসে তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরল। সে তখন খুব খুশি হয়েছিল। সে তার মা-বাবাকে একসঙ্গে দেখতে পেয়ে আনন্দে হেসে উঠল।

পরের রবিবার তারা আবার সেন্ট মেরিন চার্চে প্রার্থনা করতে গেল। প্রভুর বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিজ্ঞা করল যে যতই ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেন, তারা কখনো একে অপরের হাত ছাড়বে না। তারা বুঝতে পেরেছিল যে ভালোবাসা মানে কখনো ঝগড়া না হওয়া নয়; ভালোবাসা মানে ঝগড়া হওয়ার পরেও একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা, ভুল শুধরে নেওয়া এবং সম্মান নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে চলা।

অভিমান থাকল, রাগ থাকল, মতের অমিলও থাকল—কিন্তু পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস আর ভালোবাসাটা আর কখনো হারিয়ে গেল না। এভাবেই তাদের সাধারণ একটা সংসার একদিন সত্যি সত্যিই পরম সুখের ঠিকানা হয়ে উঠল।

প্রকাশিত: সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy