পাটের ন্যায্য দাম দিয়ে সোনালী আঁশকে রক্ষা করুন

সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পাটের সম্পর্ক চিরকালের। একসময় যে পাটকে দেশের ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে অভিহিত করে জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি গণ্য করা হতো, বর্তমানে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, সঠিক মূল্যহীনতা এবং সীমান্তপথে পাচারের কারণে তা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরে পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাট পাচার বন্ধের দাবিতে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন সেই সংকটের বাস্তব চিত্রটি আবারও উন্মোচন করেছে।

কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের হাটে আয়োজিত মানববন্ধনে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাষিদের মূল অভিযোগ ছিলÑউৎপাদন খরচ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও স্থানীয় হাটে পাটের সঠিক দাম মিলছে না। যাত্রাপুর হাটে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায়, অথচ সীমান্ত এলাকার ফড়িয়াদের হাত ঘুরে একই পাট সীমান্ত ঘেঁষে বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে অতিরিক্ত লাভের আশায় বা বাধ্য হয়ে চাষিরা স্থানীয় হাটের বদলে সীমান্ত এলাকার ফড়িয়াদের কাছে পাট বিক্রি করছেন। আর সেই পাটই চোরাই পথে পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতের ধুবরি ও পাটামারিহাটসহ সীমান্তবর্তী বাজারগুলোতে।

এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন স্থানীয় বৈধ পাট ব্যবসায়ীদের মারাত্মক আর্থিক লোকসানের মুখে ফেলছে, অন্যদিকে স্থানীয় হাটের ঐতিহ্য ও সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিচ্ছে। যাত্রাপুর হাটের মতো এক সময়ের ব্যস্ত পাটবাজার, যেখানে সপ্তাহে প্রায় ১০ হাজার মণ পাট বেচাকেনা হতো, তা আজ কৃষক ও পাটের অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে।

পাটের সীমান্ত পাচার বন্ধ করতে না পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ পাটকলগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়বে, যা প্রকারান্তরে জাতীয় অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে কৃষকরা যদি উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত দাম স্থানীয় পর্যায়ে না পান, তবে তারা এই ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

সোনালী আঁশের এই গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং স্থানীয় অর্থনীতি রক্ষায় সরকারকে অনতিবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:

সীমান্ত পাহারা ও নজরদারি জোরদার: সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পাট পাচার প্রতিরোধে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ফড়িয়া ও পাচারকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।

ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ: স্থানীয় বাজারে পাটের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি সরাসরি ক্রয়কেন্দ্র চালু করতে হবে, যেন মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য হ্রাস পায়।

কৃষকদের সহায়তা ও প্রণোদনা: উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাটের সর্বনিম্ন বাজারদর নির্ধারণ এবং চাষিদের সরাসরি বাজারজাতকরণে সহায়তা দিতে হবে।

পাটের সুদিন ফেরাতে শুধু সরকারি ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে এর সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরের মানববন্ধনের এই আর্তনাদ যেন কেবল একটি আঞ্চলিক খবর হয়ে না থাকে; নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সোনালী আঁশকে পাচার ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।

প্রকাশিত :  ‍রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy