
সম্পাদকীয় …
দিনের পর পর সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এতে প্রাণ হারাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, মা হারাচ্ছে সন্তানকে, বোন হারাচ্ছে ভাইকে অথবা একটি পরিবারের সর্বশেষ উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সেই পরিবারের করুণদশায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো না কোনো তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনার ফলে থমকে যাচ্ছে বহু পরিবারের এগিয়ে যাওয়া।
মূলত বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। তাছাড়া আমরা মনে করি, গাড়ি চালকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে তারা গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়া বা ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে গাড়ি চালানোর কারণেও গাড়ির দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাছাড়া অনেক চালক দিনরাত চব্বিশটি ঘণ্টা গাড়ি চালানোর কারণে খুব ক্লান্ত হয়ে যান এবং দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের খুবই কষ্ট দেয়। যদি অন্তত দশ ঘন্টা চালকদের ডিউটি করা যায় তাহলে হয়তো এই নিয়মের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে যেতে পারে। তাছাড়া কিছু চালক নেশা করেও রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হয়। অন্যদিকে আঁকা বাঁকা রাস্তায় ইচ্ছেমতো ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
প্রিয় সময়ে ‘পঞ্চগড়ে সড়ক দূর্ঘটনায় ঠাকুরগাঁও সদর থানার এএসআই এর মৃত্যু’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি মর্মান্তিক ঘটনার কথা। পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় দুলাল রায় (৪০) নামে পুলিশের এক এএসআই এর করুণ মৃত্যু হয়েছে। তিনি তার কর্মস্থল ঠাকুরগাঁও থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। বোদা থেকে দেবীগঞ্জ আসার সময় লক্ষীরহাট চৌরাস্তা মোড়ে পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা বালু ভর্তি একটি ট্রাক পিছন থেকে দুলালের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুলাল রায় মারা যান। এ ঘটনা এলাকার মানুষকে ব্যথিত করেছে। একটি পরিবার তার সন্তানকে হারালো, পরিবারের অবলম্বন, আশা ভরাসাকে হারালো।
একটু অসতর্কতা আমাদের সর্বশান্ত করে দিতে পারে! আমাদের অস্বীকার করার উপায় নেই যে অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালানো, যখন তখন ওভারটেক করা, প্রশিক্ষণ না থাকা, আইন কানুন না মানা-এসমস্ত কারণেই দুঃখজনক ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে। রাস্তায় নিয়ম জেনে কেউ গাড়ি চালালেও হতে পারে অন্যজন সেই নিয়ম জানেই না। সুতরাং একজনের দোষেও আরেকজনেরও দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এসব দিক চিন্তা করে আমরা বলতেই পারি যে, যে কোনো যানবাহন রাস্তায় নামানোর আগে চালকদের গাড়ি চালানোর নিয়মকানুনের বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা উচিত। তাহলেও অন্তত সড়ক দুর্ঘটনার হার কমে যেতে পারে।
কিন্তু মনে হচ্ছে, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় যে কেবল শিক্ষার্থী মারা যাচ্ছে তা নয়, তাদের ভাইবোন, বাবা-মা, শিক্ষক এবং অনেক সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, ট্রাক্টরের মতো ভারী গাড়িগুলো মারাত্মক দুর্ঘটনার জন্য অধিকতর দায়ী। বুয়েটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওইসব গাড়ির মধ্যে মিনিবাসই বেশি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে।
তাছাড়া রাস্তায় ট্রাফিক আইনও মানতে নারাজ। কে কার আগে যাবে-এমন প্রতিযোগিতা চালকদের মধ্যে রয়েছে। অপরদিকে আমাদের বাস, মিনিবাস, ট্রাক যাই বলি না কেন, অনেক ক্ষেত্রে জরাজীর্ণ এবং যাত্রী বহনের অযোগ্য। অপরদিকে গাড়িগুলোর বডির দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাসের সামনে-পেছনে-গাড়ির গায়ে অসংখ্য দুর্ঘটনার চিহ্ন হয়তো রয়েছে। এতেই বোঝা যায়, এসব ড্রাইভার যেমন বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান, মালিকরাও তেমনি গাড়ির মেরামত/রক্ষণাবেক্ষণে নিষ্ঠুরভাবে উদাসীন! তো-এমনই যদি অবস্থা হয়, তাহলে তো দুর্ঘটনা ঘটবেই। এছাড়াও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা, জেব্রাক্রসিংয়ের সময় সর্বাত্মক সতর্ক অবলম্বন না করার কারণেও পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হন।
শুধু গাড়ি চালকদেরই দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী করা ঠিক হবে না। পথচারীরাও কম দায়ী নয়। রাস্তায় দেখা যায় কোনো মানুষ একটি বা একাধিক শিশু নিয়ে কোনোদিকে খেয়াল না করেই রাস্তা পার হচ্ছেন, তখন সেই দৃশ্য দেখলে আঁৎকে উঠতে হয়। পথচারীদের জন্যে ফুটওভারব্রিজ থাকলেও সেটি কেউ ব্যবহার করছে না। আগে যাওয়ার জন্যে রাস্তার উপর দিয়েই হাঁটা শুরু করে দেন। এতে করে শিশুদেরও সে ধরনের শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এ কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
বেশ কিছুদিন আগেও ঢাকায় রাস্তা পার হতে গিয়ে স্কুল ছাত্র নিহত হয়েছে। সুতরাং সেদিকটি চিন্তা করে আমরা বলতে চাই যে, স্কুলে শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তা পারাপার হওয়ার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারে। এভাবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে।
আমরা খবরের বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাসী, সঠিক সংবাদ পরিবেশনই আমাদের বৈশিষ্ট্য
আপডেট সময় : ১১:২০ এএম
২৬ নভেম্বর ২০২০ খ্রি. ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি, বৃহস্পতিবার




