মনপুরায় বিলুপ্তির পথে শিমুল গাছ

রাকিবুল হাসান, মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি
দক্ষিণা বাতাসে আমের মুকুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে মুগ্ধ চারিদিক। কোকিলের সুমিষ্ট কুহুতালে ফাগুনের উত্তাল বাসন্তী হাওয়া দিচ্ছে দোলা। গাছে গাছে জেগে উঠতে শুরু করেছে সবুজ পাতা।আমের মুকুল আর শিমুল ফুল দেখে বোঝা যায় শীত বিদায় নিয়ে এসেছে ফাগুন।ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে আবহমান গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তুলেন শিমুল ফুল গাছ(তুলা গাছ)।

কিন্তু কালের বিবর্তনে আগুন ঝরা ফাগুনে চোখ ধাঁধানো গাঢ় লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল গাছ মনপুরায় এখন বিলুপ্তপ্রায়। এক সময় মনপুরার গ্রামীণ জনপদে  প্রচুর শিমুল গাছ দেখা যেতো। প্রতিটি গাছে গাছে  শিমুল ফুলই স্মরণ করিয়ে দিতো বসন্ত দ্বারে।

শিমুল গাছের শাখাগুলো বসন্তের আগমনে লাল শাড়ির ঘোমটা পরা গ্রাম্য নববধূর সাজে সজ্জিত হতে দেখা যায়, যা দর্শনে হতাশ প্রেমিকের মনেও জাগিয়ে তোলে আশা। অন্যান্য গাছের তুলনায় শিমুল গাছ অনেক উঁচু হওয়ায় বহু দূর থেকে এ মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। কেবল সৌন্দর্যই বিলায় না, শিমুল গাছের রয়েছে নানা উপকারিতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব।

প্রাকৃতিক ভাবে তুলা আহরণের অন্যতম অবলম্বন শিমুল(তুলা) গাছ। এ গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজগুণ। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এখনো নানা রোগের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে। এটি বোমবাকাসিয়াক পরিবারের উদ্ভিদ। বীজ ও কান্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। রোপণের ৬-৭ বছরের মধ্যে শিমুল গাছে ফুল ফোটে। ৮০ থেকে ৯০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। সেই তুলনায় বেশ মোটাও হয় । নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে শিমুল গাছ ৬০-৭০ বেঁচে থাকে। শীতের শেষে পাতা ঝরে পড়ে।বসন্তের শুরুতেই গাছে ফুল ফোটে। আর এ ফুল থেকেই হয় ফল। চৈত্র মাসের শেষের দিকে ফল পুষ্ট হয়। বৈশাখ মাসের দিকে ফলগুলো পেকে শুকিয়ে গিয়ে বাতাসে আপনা আপনিই ফল ফেটে প্রাকৃতিকভাবে তুলার সাথে উড়ে উড়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া বীজ থেকেই এই গাছের জন্ম হয়। অন্যান্য গাছের মত এ গাছ কেউ শখ করে লাগায় না। নেওয়া হয়না কোন যত্ন। অযত্ন আর অবহেলা প্রাকৃতিকভাবেই গাছ বেড়ে ওঠে। এ গাছের প্রায় সব অংশই কাজে লাগে। এর ছাল, পাতা ও ফুল গবাদিপশুর খুব প্রিয় খাদ্য। বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে শিমুল তুলার জুড়ি নেই।

হাকিম মো.রফিক  বলেন, এই শিমুল ঔষধি গাছ হিসেবেও পরিচিত। গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিষফোঁড়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য যৌন রোগ নিরাময়ে এ গাছের মূল ব্যবহার করে। আগে মনপুরার গ্রামে প্রচুর শিমুল গাছ ছিলো। এ গাছের সব অংশেরই রয়েছে ভেষজ গুণ।

অথচ বর্তমানে এ গাছকে তুচ্ছ মনে করে কারণে অকারণে কেটে ফেলছে মনপুরার অনেকে।সাম্প্রতিক উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে থেকে গাছ কেটে ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে কাঠ ব্যবসায়ীরা। ফলে এটি আজ বিলুপ্তির পথে।

লেপ তোশক ব্যবসায়ী হোসেন জানায়, বর্তমানে শিমুল তুলা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি বিক্রয় হচ্ছে। বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে শিমুল তুলার জুড়ি নেই।তবে এখন আর সেই শিমুল তুলা সচারাচর পাওয়া যায় না।

নাম প্রকাশের অচ্ছুক এক কাঠ ব্যবসায়ী জানান,মনপুরার মানুষ বাড়ীতে থাকা শিমুল (তুলা) গাছ ও তেঁতুল গাছ বেশি বিক্রয় করছেন।তবে এখন আর তেমন পাওয়া যায় না সেই শিমুল (তুলা) গাছ।

মনপুরা সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান উপজেলার প্রবীন ব্যক্তি আলহাজ্ব নজির আহাম্ম্দে মিয়া জানান,আগে প্রতিটি এলাকায় প্রচুর শিমুল গাছ ছিলো ।একটি বড় ধরনের গাছ থেকে মৌসুমে প্রায় ১০/১২ হাজার টাকা তুলা বিক্রয় করা যেতে পারে ।আর বর্তমানে শিমুল তুলার চাহিদাও অনেক বেশি ।অবজ্ঞা আর অযত্ন অবহেলার কারণে এ গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এ গাছটি এখনি সংরক্ষণ করা জরুরি ।তা না হলে আগামী দিনগুলোতে এই গাছের অস্থিত্ব খোজেঁ পাওয়া যাবেনা ,একে বারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে ।

সাকুচিয়া আবদুল আল ইসলাম জ্যাকব কলেজ এর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন,আগুন ঝরা ফাগুনে চোখ ধাঁধানো গাঢ় লাল রঙের অপরূপ সাজে সজ্জিত শিমুল (তুলা) গাছ মনপুরার একটি ঐতিয্য।কিন্তু তা এখন আমাদের গ্রাম থেকে উজাড় হচ্ছে।শিমুল গাছ উজাড় হওয়ার ফলে পরিবেশের উপরে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।

এ গাছ সকল গাছ থেকে অনেক উঁচু হওয়ায় কাক, কোকিল, চিল, বকসহ বিভিন্ন ধরনের পাখি বাসা বেঁধে বসবাস করে। এ গাছ উজাড় হওয়ার ফলে এসব পাখিরা আবাসস্থল হারিয়ে পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে। গাছ না থাকায় আবাসস্থলের অভাবে ধীরে ধীরে এসব পাখিরাও মনপুরা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

মনপুরা রেঞ্জ কর্মকর্তা মঈনুল ইসলাম ইসলাম বলেন,গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাওয়া শিমুল (তুলা)গাছ এর বাগান করার ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে ।এবং সেই সাথে স্টিপ ফরেস্ট এর মাধ্যমে সামাজিক বনায়ন করে এই গাছের বংশবিস্তার করা হবে ।শিমুল চাষকে আধুনিকায়ন ও গতিশীল করার জন্য কৃষকদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা প্রয়োজন। হারিয়ে যাওয়া এই অতি মহামূল্যবান শিমুল তুলা চাষের বিস্তীত ঘটাতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এমনটিই প্রত্যাশা মনপুরার সচেতনমহলে।

You might like