বিশ্বাসের ছদ্মবেশে সর্বনাশ: টেলিগ্রাম–হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া ডিজিটাল প্রতারকচক্র

পত্রিকায় পড়লাম ‘সহজ আয়ের লোভে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেক মানুষ’ শিরোনামে লেখাটা পড়ে হতবাক হলাম। মানুষ কতোভাবে যে মানুষকে ঠকানোর জন্যে ফাঁদ পাতে। আর সেই ফাঁদে পড়ে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। অবশ্য এভাবেই মানুষ মানুষকে অবিশ্বাস করা শুরু করে। মানুষকে এতো সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। এসে সমাজের সৌন্দয্য নষ্ট হয়ে যায় দ্রæত গতিতে। আমরা হারাতে শুরু করি সম্ভব্য সমাজ। আবার মানুষ অবিশ্বাস করেও বাঁচতে পারে না; মানুষকে বিশ্বাস করেই তো মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। কিন্তু সেই স্বাভাবিক জীবন একসময় থাকে না। মানুষ নষ্ট হয়ে যায় দুষ্টচক্রের ঠকবাজির কারণে।

যেমন-তেমন নয় ডিজিটাল প্রতারক চক্রের উৎপত্তি হয়েছে চারিদিকে; যাদেরকে আমরা বিশ্বাসে বেঁচে থাকি। ওরা খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে। আমরা জানি যে, ডিজিটালাইজেশনের এ যুগে, যেখানে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাব এবং বেকারত্বের হার বিপুল, সে সুযোগকে পুঁজি করে একদল অপরাধী ‘সহজে আয়’-এর লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে। তারা বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ফাঁদ পেতেছে, যার শিকার হচ্ছেন হাজারো তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষ। সময় এসেছে এ প্রতারণার স্বরূপ উন্মোচন করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার এবং এর থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার। তারা প্রথমে মানুষের বিশ্বাস অর্জন। প্রতারকচক্রের কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত ধূর্ত এবং পরিকল্পিত। এরা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের প্রতারণার মূল ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়।

অনেক সময় বিভিন্ন গ্রæপে পোস্ট দিয়ে বা সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পাঠিয়ে (পার্সোনালি নক করে) এরা সম্ভাব্য ভিকটিমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। যোগাযোগের শুরুতেই তারা নিজেদের কোনো এক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। এজন্য তারা অনলাইন থেকে বা বিভিন্নভাবে সংগৃহীত ভিজিটিং কার্ড থেকে পাওয়া নাম ও পদবি ব্যবহার করে, ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের পরিচয় যাচাই করা প্রায় কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর তারা একটি লোভনীয় ‘পার্ট-টাইম’ চাকরির প্রস্তাব দেয়, যা ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে খুব সহজে করা যাবে বলে আশ্বস্ত করে এবং প্রলোভন হিসেবে মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বা তারও বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখানো হয়। আর সাধারণ মানুষ খুব সহজে তা’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। প্রথমে আপনাকে খুব সাধারণ একটি কাজ দেওয়া হবে, যেমন কোনো ইউটিউব ভিডিও দেখা, গুগল ম্যাপে পজিটিভ রিভিউ দেওয়া বা কোনো ফেসবুক পোস্টে লাইক-কমেন্ট করা।

কাজটি সম্পন্ন করে স্ক্রিনশট জমা দেওয়ার পর আপনাকে তাদের তৈরি একটি ভুয়া পোর্টালে ব্যালেন্স দেখানো হয় এবং অবিশ্বাস্য দ্রæততায় আপনার বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মতো সামান্য কিছু অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই সামান্য প্রাপ্তিই একজন ভুক্তভোগীর মনে বিশ্বাস তৈরি করে দেয় যে, প্ল্যাটফর্মটি আসল এবং এখান থেকে সত্যিই আয় করা সম্ভব। এটি তাদের ‘বিনিয়োগ’ বলা যেতে পারে। এরপর বড় টোপ ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একবার বিশ্বাস অর্জিত হলে শুরু হয় আসল খেলা। ভুক্তভোগীকে আরও বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে নতুন নতুন কাজ দেওয়া হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তার ভুয়া পোর্টালে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি ব্যালেন্স জমতে দেখা যায়। কিন্তু এই টাকা তুলতে গেলেই শুরু হয় আসল প্রতারণা। তখন বলা হয়, ‘অ্যাকাউন্ট অ্যাকটিভ’ করতে বা ‘ক্রেডিট লোড’ করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দিতে হবে। সে অর্থের পরিমাণ হতে পারে ৫ হাজার, ১০ হাজার বা এমনকি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আমাদের কাছে এমন অভিযোগও এসেছে, যেখানে ভুক্তভোগী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খুইয়েছেন।

প্রতারকরা তাদের টেলিগ্রাম গ্রæপে অন্য সদস্যদের ভুয়া পেমেন্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে একটি কৃত্রিম আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। নতুন ভুক্তভোগী যখন দেখে যে ‘অন্যরা’ টাকা পাচ্ছে, তখন সে নিজেও লোভে পড়ে বা নিজের অর্জিত ব্যালেন্স তোলার আশায় তাদের দেওয়া অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেয়। টাকা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই নম্বর থেকে তাকে বøক করে দেওয়া হয় এবং ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এ প্রতারণার নেপথ্যে রয়েছে এমন একদল ধুরন্ধর অপরাধী, যাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে। আমার মতে, এই চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কাজ করে। তারা প্রান্তিক অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (ঘওউ) ব্যবহার করে সিম কার্ড কেনে এবং সেই সিম দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট তৈরি করে।

শুধু তাই নয়, অন্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে মেসেঞ্জারের মাধ্যমেও তারা যোগাযোগ স্থাপন করে, যা তাদের পরিচয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণ তৈরি করে। এই চক্র আরও এক ধাপ এগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট তৈরি করে, যাদের ঠিকানা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় এরা ভিডিও কলের মাধ্যমেও যোগাযোগ করে, যেখানে সেই এজেন্টরাও এক ধরনের প্রতারণার শিকার তাদের অর্থের লোভ দেখিয়ে এই অপরাধমূলক কর্মকাÐে যুক্ত করা হয়। এভাবেই মূল চক্রটি নিজেদের আড়ালে রেখে একটি জটিল ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত সতর্কতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ- উভয়ই জরুরি। অন্যথায় বড় দুঘটনা ঘটে সম্ভাবনা থাকে। ব্যক্তিগত সতকতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদ্যোগ প্রচারণাও জরুরী।

তাছাড়া যেসব বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠানো হচ্ছে, সে নম্বরগুলো ধরে এই চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে আরও কঠোর ও দ্রæত পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে এবং সে খবর গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করতে হবে, যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। তবে কেবল কেবল আইনপ্রয়োগ করে এ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্যে প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে যে, শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার কোনো বৈধ পথ নেই। আমাদের সম্মিলিত সতর্কতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কঠোর পদক্ষেপই পারে এই ডিজিটাল অপরাধীদের দৌরাত্ম্য রুখে দিতে এবং হাজারো মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ রক্ষা করতে। নাহলে প্রযুক্তির আশীর্বাদই আমাদের জন্য এক ভয়ংকর অভিশাপও হয়ে দাঁড়াবে।

মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫

অনলাইনে সংবাদ জনপ্রিয় করবেন যেভাবে

ইউটিউব থেকে আয় করার উপায়

সোরিয়াসিস হলে কী করবেন?

স্ক্যাবিস বা চুলকানি থেকে রক্ষা পেতে কী করবেন?

ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

চর্মরোগ দাউদ একজিমা বিখাউজের কারণ ও প্রতিকার জেনে নিন

শেয়ার করুন

You might like

About the Author: priyoshomoy