ধর্মীয় উগ্রতা ও মানবতার সংকট: গোয়ালন্দের ঘটনা এক সতর্কবার্তা

সম্পাদকীয়
প্রিয় সময়ে প্রকাশিত ‘রাজবাড়ীতে কবর থেকে তুলে মরদেহে আগুন’ শিরোনামে সংবাদটির মাধ্যমে আমরা আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হলাম যে, আমরা এখন কোন যুগে বসবাস করছি! পাঠকমাত্রই মানসিকভাবে আহত হয়েছেন, হয়েছেন হতবাক! রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের সমাজ ও সভ্যতার জন্যে এক গভীর সতর্কবার্তা। এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ কবর থেকে তুলে জনসম্মুখে পুড়িয়ে ফেলা এবং সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়া কোনোভাবেই সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে কি?

এ ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজে বেড়ে চলা ধর্মীয় উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাবের এক ভয়ঙ্কর প্রতিফলন। এটি এমন এক সামাজিক অবক্ষয়, যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য এবং মৃত্যুর পরের সম্মানও উপেক্ষা করা হয়েছে।

প্রতিটি ধর্মেই মৃতদেহকে সম্মান জানানোর কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মেও মৃত ব্যক্তির দাফন ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। অথচ, গোয়ালন্দের ঘটনায় সেই বিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এক অমানবিক কাজ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি ধর্মবিরোধী কাজ করে থাকেন, তার বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং প্রচলিত আইনের। সাধারণ মানুষের হাতে আইন তুলে নেয়া, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করা এবং সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

গোয়ালন্দের বিক্ষুব্ধ জনতা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে যে বর্বরতা দেখিয়েছে, তা’ শুধুমাত্র একটি ব্যক্তির অসম্মান নয়, বরং এটি সমগ্র সমাজের নৈতিক পরাজয়। এ ঘটনার পেছনে যে কারণগুলো উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।

নুরাল পাগলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে : যেমন নিজেকে ইমাম মাহদী দাবি করা, কালিমাকে বিকৃত করা এবং কোরআনকে অপমান করা- এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু এ অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা এবং তার বিচার করার জন্যে আদালত রয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জনতাকে উত্তেজিত করে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো কোনোভাবেই এ সমস্যার সমাধান হতে পারে না; বরং এটি আরো বড় সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়।

এ ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন পূর্বঘোষিত বিক্ষোভের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি? কেন বিক্ষুব্ধ জনতা একের পর এক সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারলো? পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, সরকারি কর্মকর্তার গাড়িতে হামলা, এবং সর্বশেষে মৃতদেহ তুলে নিয়ে অগ্নিসংযোগ- এগুলো সবই ইঙ্গিত দেয় যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। যখন কোনো সমাজে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের উগ্রতা ও বর্বরতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরো সক্রিয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিলো, যাতে এ অমানবিক ঘটনাটি ঘটার আগেই তা’ প্রতিহত করা যেতো।

এ ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলেই সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায়। আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা এতোটাই বেড়ে গেছে যে, কোনো ভিন্নমত বা ভিন্ন বিশ্বাসকে আমরা সহ্য করতে পারছি না। মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো অন্য মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো, বিশেষ করে তার মৃত্যুর পর।

এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যদি আমাদের নিজেদের মধ্যে এই অসহিষ্ণুতা এবং উগ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি; তাহলে আমাদের সমাজ এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। আমাদের প্রত্যেককে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ধর্মীয় বিষয়গুলো নিয়ে জনসমক্ষে আবেগপ্রবণ না হয়ে, আইনের মাধ্যমে এর সমাধান খোঁজা উচিত।

ধর্মীয় নেতারা, শিক্ষাবিদ এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উচিত এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। মানুষকে বোঝানো উচিত যে, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং এটি আরও নতুন সমস্যার জন্ম দেয়। আসুন, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলি যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে মতবিরোধ থাকলেও সম্মান থাকবে এবং যেখানে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে- এমনকি মৃত্যুর পরেও।

শনিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়

You might like

About the Author: priyoshomoy