শিক্ষক যখন শিকারি

সম্পাদকীয়

প্রিয় সময়ে ‘পঞ্চগড়ে ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টা মামলায় স্কুল শিক্ষকের কারাদণ্ড প্রদান’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে লজ্জাজনক ঘটনা আমরা জানতে পেরেছি। যেহেতু অতীতেও এমন ঘটনা আমরা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি; সেহেতু এমন ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। এসব ঘটনা আমাদের নিরাপত্তাহীনতার কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, পঞ্চগড়ে নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড প্রদানের রায়টি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এ ধরনের রায় সমাজে এক নতুন বার্তা পৌঁছে দেয়- যে অপরাধীর পরিচয়, পেশা বা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, আইনের চোখে সবাই সমান।

আমাদের সমাজে শিক্ষক একটি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং পবিত্র সম্পর্ক। শিক্ষকদের আমরা দেখি জ্ঞান, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ধারক ও বাহক হিসেবে। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ককে একটি অভিভাবকসুলভ স্নেহ ও বিশ্বাসের সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা নির্ভয়ে নিজেদের বিকাশের সুযোগ পায়। কিন্তু যখন কোনো শিক্ষক এ পবিত্র সম্পর্ককে কলুষিত করে, তখন তা’ কেবল একটি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়। পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তার পরবর্তী সাজা সেই কলঙ্কিত অধ্যায়েরই প্রতিচ্ছবি।

এ ঘটনাটি কেবল একটি ধর্ষণ চেষ্টার মামলা নয়; বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের গভীর ক্ষতকে উন্মোচন করে। একজন শিক্ষক, যিনি ছাত্রীর কাছে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, তিনিই যখন সেই নিরাপত্তার দেয়াল ভেঙে শিকারির ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হন, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং নৈতিকতা নিয়ে। এ ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, শুধু পাঠ্যপুস্তক পড়ানোই শিক্ষকের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং তাদের নৈতিক শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত আচরণের ওপরও সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত।

মামলার দ্রæত নিষ্পত্তি এবং অভিযুক্তের সাজা প্রমাণ করে যে, সমাজে ন্যায়বিচার এখনো জীবিত। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এ রায় প্রদান করা হয়েছে। এটি বিচার বিভাগের দক্ষতার প্রমাণ, যা’ সাধারণত দীর্ঘসূত্রিতায় ভোগে। বাদীপক্ষ, বিশেষত ভুক্তভোগী ছাত্রী ও তার পরিবারের জন্যে এ রায় অবশ্যই একটি স্বস্তি ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। এটি অন্যান্য ভুক্তভোগীদেরও সাহস জোগাবে; যাতে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে।

তবে, এ রায়ে সন্তুষ্ট হলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এ ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং তাদের নৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এখন সময় এসেছে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের, যেখানে শিক্ষকের পরিচয়ে কোনো বিকৃত মানসিকতার মানুষ যেন প্রবেশ করতে না পারে। শুধু কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নৈতিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। আমাদের এমন এক সমাজ গড়তে হবে, যেখানে শিক্ষক নামের কোনো ‘শিকারি’ যেন আর তৈরি না হয় এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন আর ধর্ষণের শিকার না হয়। এ রায়ের মাধ্যমে যে বার্তাটি এসেছে, তা’ হলো- অপরাধীর কোনো ক্ষমা নেই। শিক্ষক নামের মুখোশও তাকে বাঁচাতে পারে না।

বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ডট কম

You might like

About the Author: priyoshomoy