পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশের পথে একটি ছোট কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ

সম্পাদকীয়:

প্রিয় সময়ে ‘শ্যামনগরে পলিথিনের বিকল্প পাটের ব্যাগ বিতরণ’ সংবাদটি সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণের কাছে গুরুত্ব বহন করেছে। কেননা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে গতকাল যা’ ঘটেছে, তাকে শুধু একটি ‘ব্যাগ বিতরণ অনুষ্ঠান’ বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ৩৫ জন ব্যবসায়ীর হাতে ৩,৫০০ পাটের ব্যাগ তুলে দেওয়ার এ ক্ষুদ্র উদ্যোগটি আসলে একটি বড় বার্তা বহন করছে। আমরা এখনো পলিথিনের বিষচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, যদি স্থানীয় পর্যায়ে ইচ্ছা ও উদ্যোগ থাকে।

পলিথিন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে ঠিকই; কিন্তু তার মাশুল আমরা দিচ্ছি প্রতি মুহূর্তে। নর্দমা বন্ধ, জলাশয় দূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস, গবাদি পশুর মৃত্যু, এমনকি মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অনুপ্রবেশ। এসবের জন্যে দায়ী এ একবার-ব্যবহার্য প্লাস্টিক। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল প্রথম দেশ হিসেবে; কিন্তু ২৩ বছর পরেও আমরা সেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে পারিনি। কারণ? আইন আছে, জরিমানা আছে; কিন্তু বিকল্পের ব্যবস্থা আর সচেতনতা তৈরি করতে পারিনি আমরা।

শ্যামনগরের এ উদ্যোগটি সেই শ্যামনগরের এ উদ্যোগটি সেই শূন্যস্থান পূরণের একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। রুপান্তর নামের সংগঠনটি যা’ করেছে তা হলো – ব্যবসায়ীদের হাতে বিনামূল্যে পাটের ব্যাগ তুলে দিয়ে তাদেরকে পলিথিন না দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এটা কোনো জোর খাটানো নয়, এটা সহযোগিতা। ব্যবসায়ী যদি ক্রেতার হাতে পলিথিন না তুলে পাটের ব্যাগ তুলো তুলে দেন-তাহলে ক্রেতাও অভ্যস্ত হয়ে যাবেন কয়েক মাসের মধ্যে। চেইঞ্জটা আসবে নিচ থেকে, রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে।

আমাদের পাট শিল্প একসময় সোনার ফসল ছিল। আজ সেই পাটই হতে পারে প্লাস্টিকের সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্প। পাটের ব্যাগ টেকসই, পচনশীল, পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। শ্যামনগরের এ কার্যক্রম যদি সারা দেশের বাজার কমিটি, উপজেলা প্রশাসন ও এনজিওগুলো গ্রহণ করে, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে আমরা পলিথিনের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারি।

সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট-প্রথমত, পাটের ব্যাগ উৎপাদনকারীদের ভর্তুকি ও কর ছাড় দিতে হবে যাতে দাম পলিথিনের সমান বা তার চেয়ে কম হয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে ‘পলিথিনমুক্ত বাজার’ ঘোষণা করে সেখানে পাটের ব্যাগ বিতরণের এ মডেল চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, যেসব বাজারে পলিথিন বিক্রি হবে সেখানে কঠোর জরিমানা করতে হবে; কিন্তু তার আগে বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। না হলে আইন শুধু কাগজে থেকে যাবে।

শ্যামনগরের নকিপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা আজ থেকে যে পাটের ব্যাগ ক্রেতাদের হাতে তুলে দেবেন, সেটি কেবল একটি ব্যাগ নয়; সেটি একটি প্রতিশ্রæতি। পরিবেশের প্রতি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি। এ ছোট গ্রামীণ বাজার যদি পারে, তাহলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনার বড় বড় বড় মার্কেটগুলো পারবে না কেন?

আসুন আমরাও নিজেদের প্রশ্ন করি, আজ বাজারে গিয়ে কি আমি পলিথিন নিয়েছি, নাকি কাপড় বা পাটের ব্যাগ নিয়ে গিয়েছি? পরিবর্তন শুরু হবে আমাদের পকেট থেকে, আমাদের অভ্যাস থেকে। শ্যামনগর আজ আমাদের সেই পথ দেখিয়ে দিল। এবার আমাদের পথ চলা শুরু করার পালা।

২১ নভেম্বর ২০২৫

 

You might like