

সম্পাদকীয়:
প্রিয় সময়ে ‘কুমিল্লায় বিএনপি-এলডিপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে আহত ৫০’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি পাঠে আমরা শিহরিত ও ব্যথিত। কুমিল্লার চান্দিনায় একটা সাধারণ চুরির ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রূপ নিলো রাজনৈতিক সংঘর্ষে। মসজিদের দানের টাকা ও দোকানের নগদ চুরি, অভিযুক্ত এক কিশোরকে আটক করে মাথা ন্যাড়া করে দেয়া, তারপর প্রতিশোধমূলক হামলা, কোপানো, দোকান ভাঙচুর, মোটরসাইকেলে আগুন দেয়-এতে অন্তত ৫০ জন আহত। পুলিশ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনীকে নামতে হলো। এটা একটা অতি পরিচিত, অথচ এতোটাই উদ্বেগজনক চিত্র!

ঘটনার মূলে আছে দু’টি দল-বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র গণতান্ত্রিক যুবদল। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ভরা এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, গ্রাম-বাজারের রাজনীতি এখনো যতোটা পেশিশক্তি ও প্রতিহিংসার ওপর নির্ভর করে। একটা চুরি যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের লড়াইয়ে রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়-দোকান ভাঙা, বাড়িঘরে হামলা, আহত-নিহতের ভয়। এখানে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একজন ১৫ বছরের কিশোরকে আইনের হাতে না তুলে দিয়ে ‘জনগণের বিচার’ করা হলো। মাথা ন্যাড়া করে দেয়া, মারধর-এগুলো কোনো সভ্য সমাজের আচরণ নয়। এরপর প্রতিশোধের নামে যে তাÐব চালানো হলো, তা’ প্রমাণ করে যে, উভয়পক্ষই আইনের ওপরে নিজেদের মনে করে।
পুলিশ বলছে, এখনো কোনো পক্ষ অভিযোগ করেনি। এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির করুণ চিত্র। যারা রাজপথে একে অপরের ওপর হামলা করে, তারাই থানায় গিয়ে মামলা করতে চায় না-কারণ তাদের ‘নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা’ আছে। এ চক্র যতোদিন থাকবে, ততোদিন সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। ১. চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী মামলা হওয়া উচিত ছিলো। ২. যারা তাকে ‘জনগণের আদালতে’ তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হওয়া দরকার। ৩. প্রতিশোধমূলক হামলা, ভাঙচুর ও কোপানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে-দল যেই হোক।
যতোদিন আমরা ছোট ছোট অপরাধকে রাজনৈতিক রং দিয়ে বড় সংঘর্ষে রূপ দেবো, ততোদিন গ্রাম-বাজারেও শান্তি থাকবে না। চান্দিনার এই ঘটনা যেন আরেকবার সতর্ক করে: আইনের শাসন না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না, থাকে শুধু গুÐাতন্ত্র। একটা সাধারণ চুরি। মসজিদের দানের বাক্স আর একটা মুদি দোকানের কয়েক হাজার টাকা। এতোটুকু ঘটনা যদি থানায় একটা জিডি হতো, পুলিশ তদন্ত করতো, কিশোর আসামিকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো কোনো রক্তই পড়তো না। কিন্তু আমরা তা’ করলাম না। আমরা বেছে নিলাম ‘দলীয় পরিচয়’। একপক্ষ বললো, “ওরা এলডিপির লোক, আমরা বিএনপির, তাই আমরাই বিচার করবো।” অপরপক্ষ বললো, “তোমরা আমাদের ছেলেকে মাথা ন্যাড়া করেছো, এখন আমরা তোমাদের নেতাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করবো।” ফলে একটা চুরি হয়ে গেলো দু’দলের মধ্যে প্রতিহিংসার যুদ্ধ। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা – ছোট অপরাধকেও আমরা ‘দলের সম্মানের লড়াই’ বানিয়ে ফেলি। ফলাফল? সাধারণ দোকানদারের দোকান ভাঙা, বাড়িঘরে হামলা, মোটরসাইকেল পোড়ানো, পঞ্চাশ জনেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে। শান্তির বাজারটা যেন এক মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো। এটা কেবল চান্দিনার ঘটনা নয়, এটা আমাদের গোটা দেশের রোগ। গ্রামে-গঞ্জে, শহরের মহল্লায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে – যেখানেই দু’টি রাজনৈতিক দলের ছোটখাটো কর্মী আছে, সেখানেই একটা সামান্য ঝগড়া, একটা চুরি, একটা মারামারি মুহূর্তে দলীয় সংঘর্ষে রূপ নেয়। কারণ আমরা আইনের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা মনে করি, “পুলিশ তো আমার দলের না, তাই আমি নিজেই বিচার করবো।” আর এই “নিজে বিচার করা”ই গুÐাতন্ত্রের জন্ম দেয়। গুÐাতন্ত্র মানে লাঠি-রামদা-ককটেলের রাজত্ব, মানে নিরীহ মানুষের কান্না, মানে শান্তির মৃত্যু।
যতোদিন এ মানসিকতা থাকবে, ততোদিন আমাদের গ্রামের হাটবাজারও নিরাপদ থাকবে না। স্কুলের সামনে দিয়ে বাড়ি ফেরা শিশুরাও নিরাপদ থাকবে না। একটা ছোট চুরি থেকে শুরু করে পুরো এলাকা জ্বলে উঠবে, কারণ আমরা শিখিনি যে, অপরাধীর পরিচয় তার দল নয়, তার অপরাধ। আর বিচার করার অধিকার কারো ব্যক্তিগত নয়, সেটা কেবল রাষ্ট্রের। যতোদিন আমরা এ সহজ সত্যটা না মানবো, ততোদিন চান্দিনা, নোয়াখালী, পিরোজপুর, রংপুর – সর্বত্রই একই ছবি দেখবো: রক্ত, আগুন আর ভাঙা দোকানের ধ্বংসস্তূপ। তাই চান্দিনার এ ঘটনা কেবল একটা স্থানীয় সংবাদ নয়, এটা আমাদের সবার জন্য আয়না। এ আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে যদি আমরা লজ্জা না পাই, যদি এখনো না বুঝি যে আইনের শাসন ছাড়া গণতন্ত্র শুধু কাগজের বাঘ, তাহলে আমরা আসলে গণতন্ত্র চাই না – আমরা চাই কেবল নিজের দলের গুÐাতন্ত্র। আর সেই গুÐাতন্ত্রের আগুনে একদিন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে আমাদের শান্তি, আমাদের উন্নয়ন, আমাদের ভবিষ্যৎ। এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কী হতে পারে?
০১ ডিসেম্বর ২০২৫
















