

সম্পাদকীয়:
সম্প্রতি কুকুর ছানা পানিতে ডুবিয়ে মারার অভিযোগে এক মহিলার জামিন নামঞ্জুর করে জেলে পাঠানোর ঘটনাটি সমাজের বহুবিধ জটিলতাকে সামনে এনেছে। একদিকে যেমন এ কাজটি নিঃসন্দেহে একটি অমানবিক ও নৃশংস কাজ, অন্যদিকে তেমন একটি প্রশ্ন উঠছে – যে দেশে বৃহত্তর অপরাধীরা অনেকাংশে বিচারের বাইরে থাকে, সেখানে কুকুর ছানা হত্যার মতো ঘটনায় একজন নারীর জামিন নামঞ্জুর হওয়া কী আইনের চোখে সমানাধিকার ও ভারসাম্যের প্রতীক? এ ঘটনার আইনি বৈধতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু সমাজের সাধারণ চোখে এটি একটি গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ঐ মহিলা তাঁর কৃতকর্মের জন্যে শাস্তি পাচ্ছেনÑতাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্নটি হলো, এ শাস্তি কী সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘদিনের ‘বেওয়ারিশ কুকুর নিধন অভিযান’ (যেখানে কুকুরদের ইনজেকশন দিয়ে বা গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারা হতো) এর চেয়েও গুরুতর অপরাধ? সিটি কর্পোরেশনের এ নিধন প্রক্রিয়াও সমান নৃশংস ছিলো তা প্রাতিষ্ঠানিক এবং জনস্বাস্থ্যের নামে পরিচালিত। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নৃশংসতা নিয়ে কখনো কোনো বিচার হতে শোনা যায়নি, বরং তা ছিলো একরকম স্বীকৃত পদ্ধতি। অথচ, বর্তমান মামলায় এক ব্যক্তিগত অপরাধীকে গণমাধ্যম এমনভাবে তুলে ধরেছে যে, তাঁর সামাজিক অবস্থান কার্যত ধ্বংস হয়ে গেলো।
এখানে কুকুরের প্রতি মানবিকতার প্রশ্নটি যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, ততোটাই উপেক্ষা করার মতো নয় জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি। সাম্প্রতিককালে ফজরের নামাজে যেতে থাকা এক ছেলেকে কুকুরদের দ্বারা ছিন্নভিন্ন হওয়ার ঘটনা এবং পথেঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ানো ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তাকে এতোটাই জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিটি অলিগলিতে কুকুরের সংখ্যা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে এদের নিয়ে ‘কুকুর গ্যাং’ তৈরি হওয়া এবং মানুষের ওপর আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা অমূলক নয়। বিশেষত মোহাম্মাদপুরের বস্তির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ সমস্যা আরো তীব্র হতে পারে।
গ্রেপ্তার হওয়া মহিলা তাঁর শিশু সন্তানের নিরাপত্তার অজুহাত দিয়েছিলেনÑযার সত্যতা যাচাই করা কঠিন। তবে, তাঁর এ কাজের তীব্র নিন্দা সত্তে¡ও, বৃহত্তর জননিরাপত্তা ও বেওয়ারিশ কুকুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের উদাসীনতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবো না। এ মুহূর্তে দেশে কুকুরের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে বা এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো সরকারি পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
সামনে কনকনে শীত আসছে, যখন বেওয়ারিশ কুকুরগুলো আরো অসহায় হয়ে পড়বে। এ অবস্থায়, তাদের প্রতি মানবিক দায়িত্ব দেখিয়ে যতœ নেয়া এবং পাশাপাশি এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে নিউটারিং (বন্ধ্যাকরণ) বা অন্য কোনো বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া এখন সময়ের দাবি। শুধু মাত্র একজন ব্যক্তিগত অপরাধীর জামিন নামঞ্জুর করে শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের সুদূরপ্রসারী, মানবিক ও টেকসই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আপাতত, দেশে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এ বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি মনোযোগের দাবি রাখে।
০৬ ডিসেম্বর ২০২৫











