শিক্ষকতা পেশার অমর্যাদা

সম্পাদকীয়:

দি ডেইলি ক্যাম্পাস পত্রিকায় ‘অফিস কক্ষে প্রাথমিকের দুই শিক্ষকের হাতাহাতি’ শিরোনামে সংবাদটি আমাদের বিস্মিত করেছে। শিক্ষক সমাজেও লজ্জার বিষয় হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমে আমরা জেনেছি, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে দু’ শিক্ষকের হাতাহাতি; যে ঘটনা শিক্ষকতা পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

শিক্ষক মানেই জাতি গড়ার কারিগর, নীতিনৈতিকতা ও আদর্শের প্রতিমূর্তি। বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষ জ্ঞান ও শৃঙ্খলা চর্চার কেন্দ্র, যেখানে শিশুরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনে। কিন্তু সম্প্রতি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চান্দপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে যে অপ্রীতিকর ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছেÑদু’ সহকারী শিক্ষকের মধ্যে ধস্তাধস্তি, হাতাহাতি এবং ধারালো অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অভিযোগÑতা’ কেবল ঐ বিদ্যালয়ের পরিবেশকেই কলুষিত করেনি; বরং পুরো শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তিকে আঘাত করেছে। আমরা জেনেছি যে, ভাইরাল হওয়া ৩৩ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সংবাদ থেকে জানা যায়, সহকারী শিক্ষক মাহমুদুল হাসান জুনায়েদ ও মো. মহিউদ্দিনের মধ্যে দীর্ঘদিনের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিবাদের জের ধরে এ হাতাহাতির সূত্রপাত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বচসা ও ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে একজন শিক্ষক আরো একজনকে গলা চেপে ধরেছেন এবং ধারালো অস্ত্র (বঁটি/দা) দিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সৌভাগ্যবশত, অন্য একজন নারী শিক্ষকের সাহসী ভ‚মিকায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। এ ঘটনার ৩৩ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিশুদের কাছে আদর্শ স্থানীয়। শিক্ষকরা যখন নিজেদের মধ্যে সামান্য বিষয়ে এমন উত্তপ্ত ও সহিংস আচরণ করেন, তখন তা’ শিশুদের মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে? শিশুরা তাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে শিষ্টাচার, ধৈর্য ও সহনশীলতা শিখবেÑকিন্তু তারা যদি শিক্ষকদের এভাবে মারামারি করতে দেখে, তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষণীয় পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এটি একটি গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ, যা’ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শিক্ষকরা যদি ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ পেশাদারিত্বের গÐির বাইরে নিয়ে আসেন এবং হিংস্রতার আশ্রয় নেন, তখন তাদের শিক্ষাদানের নৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। ঘটনাটি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস পর্যন্ত গড়িয়েছে। আমরা আশা করি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রæত ও কঠোর ব্যবস্থা করবে।

এ ঘটনাকে কেবল দু’জন মানুষের ব্যক্তিগত ঝগড়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিক্ষক নিয়োগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষেত্রে দ্ব›দ্ব নিরসনের প্রশিক্ষণের অভাবকেও ইঙ্গিত করে। কর্তৃপক্ষের উচিত হবেÑদ্রæত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে: অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। শিক্ষকদের জন্যে: কর্মক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ, মানসিক চাপ সামলানো এবং অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব নিরসনের জন্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা। শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাগত সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার জন্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা।

শিক্ষকতা পেশার মান ও মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে হলে শিক্ষকদের অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত আচরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংযম, সহনশীলতা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। কারণ, তাঁরা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিয়োজিত। বিদ্যালয় হলো শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিদ্বেষের স্থান থাকতে পারে না। আমরা মনে করি, শিক্ষক সমাজে এসব বিষয়ে আন্দোলন হওয়া উচিত। যেন শিক্ষকরা নিজেদের সম্মান রক্ষা করে জীবিকায়ন করে।

মঙ্গলবার, ১৬  ডিসেম্বর ২০২৫

You might like